বিরোধী দলের নেতা নাভালনিকে ডার্ট ব্যাঙের বিষ দিয়ে হত্যা করেছে রাশিয়া, দাবি যুক্তরাজ্যের
রাশিয়ার বিরোধী নেতা আলেক্সি নাভালনিকে ডার্ট ফ্রগ বা বিশেষ প্রজাতির ব্যাঙ থেকে তৈরি বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্য ও তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা। সাইবেরিয়ার কারাগারে নাভালনির মৃত্যুর দুই বছর পর তার দেহ থেকে পাওয়া নমুনা বিশ্লেষণের পর এই দাবি করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য ক্রেমলিনকে দায়ী করেছে তারা।
মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার বলেন, রাশিয়ায় কারাবন্দী থাকা অবস্থায় নাভালনির ওপর এই বিষ প্রয়োগ করার 'সামর্থ্য, উদ্দেশ্য এবং সুযোগ' কেবল রুশ সরকারেরই ছিল।
রুশ সংবাদ সংস্থা তাস-এর তথ্যমতে, মস্কো এই অভিযোগকে 'তথ্য প্রচারণামূলক বা ইনফরমেশন ক্যাম্পেইন' হিসেবে অভিহিত করে প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে কুপার বলেছেন, নাভালনির শরীরে 'এপিব্যাটিডিন' নামক বিষ পাওয়ার অন্য কোনো ব্যাখ্যা নেই।
এই ঘোষণার পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি এবং নেদারল্যান্ডস একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। সম্মেলনে নাভালনির স্ত্রী ইউলিয়া নাভালনায়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ইভেট কুপার বলেন, 'রাশিয়া নাভালনিকে হুমকি হিসেবে দেখেছিল। এই ধরনের বিষ ব্যবহার করে রুশ রাষ্ট্র তার হাতে থাকা জঘন্য হাতিয়ার এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের প্রতি তাদের চরম ভীতির বিষয়টিই প্রমাণ করেছে।'
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, দক্ষিণ আমেরিকার বনাঞ্চলে ডার্ট ফ্রগের দেহে প্রাকৃতিকভাবে এপিব্যাটিডিন পাওয়া যায়। কিন্তু বন্দি থাকা ব্যাঙের দেহে এই বিষ তৈরি হয় না এবং রাশিয়ায় প্রাকৃতিকভাবে এটি পাওয়া যায় না। তাই নাভালনির দেহে এর উপস্থিতির কোনো 'নির্দোষ ব্যাখ্যা' হতে পারে না।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, তারা রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ সংস্থাকে (ওপিসিডব্লিউ) রাশিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগ সম্পর্কে অবহিত করেছে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার নাভালনির 'অসীম সাহসের' প্রশংসা করে বলেন, 'সত্য উন্মোচনে তার দৃঢ়তা এক দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার রেখে গেছে।' তিনি আরও বলেন, 'রাশিয়া ও পুতিনের প্রাণঘাতী অভিপ্রায় থেকে আমাদের জনগণ, মূল্যবোধ এবং জীবনযাত্রাকে রক্ষা করতে আমি যা যা করা দরকার, তা করব।'
ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল ব্যারোট বলেন, 'মুক্ত ও গণতান্ত্রিক রাশিয়ার পক্ষে লড়াই করার জন্য তাকে (নাভালনি) হত্যা করা হয়েছে।'
রাশিয়ার দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের নেতা ও সবচেয়ে সোচ্চার বিরোধী কণ্ঠস্বর নাভালনি ২০২৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ৪৭ বছর বয়সে কারাগারে হঠাৎ মারা যান। এর আগে ২০২০ সালে তাকে নার্ভ এজেন্ট 'নোভিচক' দিয়ে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল। জার্মানিতে চিকিৎসার পর রাশিয়ায় ফিরতেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অত্যন্ত বিরল বিষ 'এপিব্যাটিডিন'
যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় মিত্রদের দাবি অনুযায়ী, নাভালনিকে হত্যায় ব্যবহৃত 'এপিব্যাটিডিন' দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চলের একদল পয়জন ডার্ট ফ্রগ থেকে পাওয়া যায়। এটি ক্লিনিক্যাল ব্যবহারের জন্য অত্যন্ত বিষাক্ত বলে বিবেচিত।
বিবিসি রাশিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিষদক বিশেষজ্ঞ জিল জনসন বলেন, 'এটি মরফিনের চেয়ে ২০০ গুণ বেশি শক্তিশালী।' তিনি জানান, কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের রিসেপ্টরগুলোর ওপর কাজ করে এটি পেশি সংকুচিত করা, পক্ষাঘাত, খিঁচুনি, হৃদস্পন্দন ধীর করা এবং শ্বাসতন্ত্র বিকল করে শেষ পর্যন্ত মৃত্যু ঘটাতে পারে।
গবেষকদের মতে, এই ব্যাঙগুলো তাদের খাবার থেকে বিষটি অর্জন করে। কারণ ভিন্ন ভিন্ন আবাসের প্রাণীদের দেহে বিষের মাত্রায় ভিন্নতা দেখা যায় এবং বন্দিদশায় পালিত ব্যাঙের দেহে এই বিষ থাকে না। জিল জনসন একে 'কাউকে বিষ প্রয়োগের অবিশ্বাস্যভাবে বিরল উপায়' হিসেবে বর্ণনা করেন।
শনিবারের এই ঘোষণার আগে থেকেই নাভালনির স্ত্রী ইউলিয়া নাভালনায়া ধারাবাহিকভাবে দাবি করে আসছিলেন যে, তার স্বামীকে কারাগারে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি জানিয়েছিলেন, দুটি দেশের গবেষণাগারে পাচার করে আনা জৈবিক নমুনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে তার স্বামীকে 'খুন' করা হয়েছে।
নতুন এই ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় ইউলিয়া বলেন, 'আমি প্রথম দিন থেকেই নিশ্চিত ছিলাম যে আমার স্বামীকে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে, কিন্তু এখন তার প্রমাণ মিলল।' তিনি আরও বলেন, 'দুই বছর ধরে সূক্ষ্ম কাজ করে সত্য উদঘাটনের জন্য আমি ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছে কৃতজ্ঞ।'
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসের বরাতে ক্রেমলিনের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেন, 'এসব আলোচনা ও বিবৃতি হলো একটি তথ্য প্রচারণা, যার লক্ষ্য পশ্চিমাদের নিজেদের সমস্যা থেকে নজর ঘোরানো।'
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, যিনি নাভালনি জীবিত থাকতে কখনোই তার নাম মুখে আনতেন না, মৃত্যুর এক মাস পর তিনি সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে বলেছিলেন, 'কারো প্রস্থান (মৃত্যু) সব সময়ই দুঃখজনক ঘটনা।'
মৃত্যুর সময় নাভালনি ভুয়া অভিযোগে তিন বছর ধরে কারাগারে ছিলেন এবং তাকে সাইবেরিয়ার ওই পেনাল কলোনিতে স্থানান্তর করা হয়েছিল। রুশ ভাষ্যমতে, ৪৭ বছর বয়সী নাভালনি কারাগারে অল্প সময় হাঁটাহাঁটি করার পর অসুস্থ বোধ করেন, এরপরই জ্ঞান হারান এবং আর ফিরে পাননি।
