সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ফল জানা যাবে কখন, যা বলছে নির্বাচন কমিশন
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সঙ্গে 'জুলাই জাতীয় সনদ' বাস্তবায়ন সংক্রান্ত গণভোট। ভোটগ্রহণের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, জনমনে ফলাফল প্রকাশের সময় নিয়ে কৌতূহল ততই বাড়ছে। একদিনের মধ্যেই কি ফল জানা যাবে, নাকি দুই-তিন দিন সময় লেগে যাবে—এমন প্রশ্ন রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও ঘুরপাক খাচ্ছে।
তবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) আশ্বস্ত করছে যে, ফল প্রকাশে অযথা বিলম্বের কোনো আশঙ্কা নেই। সংস্থাটির প্রত্যাশা, ভোটগ্রহণের পরদিন অর্থাৎ ১৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই অধিকাংশ ফলাফল জানা সম্ভব হবে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, 'ফলাফল ঘোষণা ইনশাল্লাহ যথাশীঘ্র সম্ভব নির্বাচনের পরপরই হয়ে যাবে বলে আমরা আশা রাখি। ১৩ তারিখ দিনের প্রথম ভাগেই হয়তো ফলাফল ঘোষণা করা যাবে।'
ইসি জানিয়েছে, এবারই প্রথম সংসদ নির্বাচন, গণভোট এবং পোস্টাল ভোট—এই তিন ধরনের গণনা একসঙ্গে হওয়ায় প্রক্রিয়াটিতে স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি সময় প্রয়োজন হতে পারে।
সকাল ১০টার লক্ষ্যমাত্রা
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, শুক্রবার সকাল ১০টার মধ্যে গণনা শেষ করা সম্ভব হবে বলে তারা আশা করছেন। তিনি বলেন, 'রেজাল্ট দিতে দেরি হওয়ার কোনো কারণ নাই। প্রতিটা ব্যালট গণনা হবে। ভোট সকাল সাড়ে ৭টায় শুরু হবে। পরের দিন অর্থাৎ শুক্রবার সকাল ১০টায় গণনা শেষ হবে।'
তবে কমিশন আগেই স্বীকার করেছে যে, এবারের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। কারণ, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হওয়ায় ভোটারদের দুটি পৃথক ব্যালটে ভোট দিতে হবে। এর সঙ্গে রয়েছে পোস্টাল ব্যালটের গণনা। ফলে গণনায় সাধারণ নির্বাচনের তুলনায় বাড়তি সময় লাগতে পারে।
আখতার আহমেদ আরও বলেন, 'এবার ভোটাররা দুটো ব্যালটে ভোট দেবেন। এর সঙ্গে পোস্টাল ব্যালটের গণনা রয়েছে। এ কারণে গণনায় এবার স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগবে।'
একযোগে গণনা ও ফলাফল ঘোষণা
ভোট গণনার পদ্ধতি সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই প্রতিটি কেন্দ্রে গণনা প্রক্রিয়া শুরু হবে। প্রথমে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ব্যালট আলাদা করা হবে, এরপর দুটি ব্যালটই একই সময়ে গণনা করা হবে।
তিনি বলেন, 'গণনা কার্যক্রম একই সঙ্গে শুরু হবে। তা না হলে দেখা যাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল পাওয়ার পরে এজেন্টরা চলে গেছেন। আবার যদি গণভোটের ফল আগে ঘোষণা করা হয়, অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। আমরা দুটোর কোনোটাই করতে চাই না—একসঙ্গে গণনা হবে।'
ইসি সূত্রে জানা গেছে, দুটি ভোটের ফলাফলও একসঙ্গে ঘোষণা করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট ভোটকেন্দ্রেই প্রাথমিক ফল প্রকাশ করা হবে। সব কেন্দ্রের ফলাফল একীভূত করে ফরম–১৮–তে লিপিবদ্ধ করা হবে এবং প্রার্থী বা তাদের এজেন্টদের উপস্থিতিতে রিটার্নিং কর্মকর্তারা তাতে স্বাক্ষর করবেন। সেই একীভূত ফলাফলের ভিত্তিতেই গেজেট প্রকাশ করা হবে।
নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য এবং ইসি সচিবালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন তুলি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'পূর্ণাঙ্গ ফল পেতে শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।' তার মতে, 'নরমালি পরের দিন সকাল ১০টার দিকে অনেক আসনের ফল চলে আসবে। তবে সব মিলিয়ে দুপুর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। বিশেষ করে দূরবর্তী কেন্দ্র থেকে ফল আসতে দেরি হলে বা পুনর্গণনার প্রয়োজন হলে বিলম্ব হতে পারে।'
প্রযুক্তিগত উপায়ে ফল সংগ্রহ
ইসি জানিয়েছে, ফলাফল সংগ্রহ ও প্রেরণের জন্য এবার ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সফটওয়্যার ব্যবহার করা হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ফল পৃথক মডিউলে এন্ট্রি করা হবে। প্রতিটি সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার অধীনে দুইজন করে ডাটা এন্ট্রি অপারেটর থাকবেন। তারা কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত ফল স্ক্যান ও এন্ট্রি করে সফটওয়্যারে আপলোড করবেন। রিটার্নিং কর্মকর্তারা যাচাই-বাছাই শেষে ক্রমসঞ্চিত ফলাফল প্রস্তুত করবেন।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাধারণ কেন্দ্রের ফল (ফরম-১৬) ও পোস্টাল ব্যালটের ফল (ফরম-১৬ক) একত্র করে একীভূত ফলাফল বিবরণী (ফরম-১৮) প্রস্তুত করা হবে। এরপর নির্বাচনের রিটার্ন (ফরম-১৯) তৈরি হবে। এসব নথির হার্ড কপি ও সফট কপি ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে পাঠাতে হবে। একইভাবে গণভোটের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রভিত্তিক ফল (ফরম-০), একীভূত বিবরণী (ফরম-৬), পোস্টাল ফল (ফরম-৮) এবং চূড়ান্ত বিবরণী (ফরম-৯) প্রস্তুত করে কমিশনে পাঠানো হবে।
সাধারণত ভোটগ্রহণের দিন রাত পেরিয়ে পরদিন ভোরের মধ্যেই অধিকাংশ কেন্দ্রের ফলাফল নির্বাচন কমিশনে পৌঁছে যায়। এরপর কেন্দ্রীয়ভাবে আসনভিত্তিক ফল প্রদর্শন করা হয় এবং ধাপে ধাপে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে।
প্রার্থীর অংশগ্রহণ ও ভোটার সংখ্যা
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ৫০টি দল। স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী ২৯৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দেশের মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এত বড় পরিসরে একযোগে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনে কমিশন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত তদারকির ওপর জোর দিচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা ও নজরদারি
ফলাফল প্রকাশের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও ইসি আত্মবিশ্বাসী। প্রতিটি আসনে ইলেকটোরাল, বিচারিক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পর্যবেক্ষক কমিটি এবং আইনশৃঙ্খলা সেল সক্রিয় থাকবে। প্রতি দুই ঘণ্টা অন্তর তথ্য সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেলে পাঠানো হবে। অটোমেশন সিস্টেমের মাধ্যমে 'রিয়েল-টাইম' তথ্য পাওয়া যাবে। এছাড়া সিসিটিভি ক্যামেরা, বডি-ওর্ন ক্যামেরা এবং ড্রোন ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে কমিশনের।
সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশনের লক্ষ্য হলো—ভোটের পরদিন, ১৩ ফেব্রুয়ারির প্রথম ভাগেই ফলাফল প্রকাশ করা। তবে বাস্তব পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে কিছু ক্ষেত্রে শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, মাঠের বাস্তবতা কমিশনের প্রস্তুতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
