২০৫০ সালের মধ্যে টেকসই ও বাজারমুখী কৃষির লক্ষ্য বাংলাদেশের
২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি খাতকে একটি টেকসই, জলবায়ু সহনশীল, উদ্ভাবনভিত্তিক, বাজারমুখী ও অধিক উৎপাদনশীল খাতে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে সরকার 'ট্রান্সফর্মিং বাংলাদেশ এগ্রিকালচার: আউটলুক ২০৫০' প্রণয়ন করেছে।
গতকাল বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত জাতীয় কর্মশালায় ২৫ বছর মেয়াদি এই পরিকল্পনার খসড়া উপস্থাপন করা হয়। কৃষি মন্ত্রণালয় এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) যৌথভাবে কর্মশালার আয়োজন করে।
কর্মশালায় জানানো হয়, প্রাথমিকভাবে পুষ্টি নিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীলতা, কৃষি মূল্য সংযোজন, কৃষি প্রযুক্তি, কৃষি শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধি, কৃষি বাজার ব্যবস্থাপনাসহ মোট ১৩টি থিমেটিক এরিয়ায় পরিকল্পনাটি ভাগ করে ব্যাকগ্রাউন্ড স্টাডি করা হয়েছে।
এই ব্যাকগ্রাউন্ড স্টাডিগুলোতে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং ইউএনডিপি কারিগরি সহায়তা দিয়েছে। প্রতিটি থিমের জন্য পৃথকভাবে কৌশল ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া প্রতিটি থিমেটিক এরিয়ার ক্ষেত্রে তথ্য বিশ্লেষণ, প্রবণতা মূল্যায়ন এবং ২০৫০ সাল পর্যন্ত চাহিদা ও সরবরাহের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়েছে।
এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেশের সব ১৪টি কৃষি অঞ্চলে আঞ্চলিক পরামর্শ সভা আয়োজন করা হয়। এসব সভায় কৃষি-প্রাকৃতিক অঞ্চল, চাষাবাদ পদ্ধতি ও বাজার বাস্তবতার প্রতিফলন নিশ্চিত করা হয়। কৃষকসহ বিভিন্ন অংশীজনের অংশগ্রহণে আঞ্চলিক অগ্রাধিকার, বাস্তবায়নগত চ্যালেঞ্জ এবং বিনিয়োগ সম্ভাবনা চিহ্নিত করা হয়েছে।
পরিকল্পনার কাঠামো ও পরামর্শ প্রক্রিয়া
পরিকল্পনাটি সাতটি অধ্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। এতে প্রেক্ষাপট ও প্রণয়ন প্রক্রিয়া, কৃষি খাতের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার বিশ্লেষণ, সহায়ক নীতি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো, ১৩টি থিমেটিক এরিয়ার গবেষণার সমন্বিত ফলাফল, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং জাতীয় পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিনিয়োগ কাঠামো তুলে ধরা হয়েছে। অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও অভিযোজন নিশ্চিত করতে মনিটরিং ও মূল্যায়ন ব্যবস্থাও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে কর্মশালায় জানানো হয়।
কর্মশালায় গ্যাপ, এসপিএস কমপ্লায়েন্স, পেস্ট ও সয়েল হেলথ ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গ্লোবালগ্যাপের রেজিস্টার্ড ট্রেইনার আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ।
তিনি জানান, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ২০২৮ সালের মধ্যে তিন লাখ হেক্টর জমিকে গ্যাপ সার্টিফিকেশনের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০৫০ সালের মধ্যে ৭০ শতাংশ জমিতে আইপিএম ও জৈবিক বালাইনাশক ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, "মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মৃত্তিকা জৈব পদার্থ বৃদ্ধি, লবণাক্ততা ও অম্লত্ব সংশোধন এবং ডিজিটাল সয়েল হেলথ কার্ডের মাধ্যমে সুষম সার ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। রপ্তানি বাড়াতে ন্যাশনাল প্ল্যান্ট কোয়ারেন্টাইন অথরিটি গঠন, বাংলাদেশগ্যাপকে গ্লোবালগ্যাপের সঙ্গে সমন্বয় এবং ব্লকচেইনভিত্তিক ট্রেসেবিলিটি চালুর রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, "এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে ২০৫০ সালে উদ্যানজাত ফসলের রপ্তানি আয় এক বিলিয়ন ডলার এবং মোট কৃষিপণ্য রপ্তানি পাঁচ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।"
তিনি জানান, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি খাতকে নিরাপদ, মানসম্মত ও বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করতে গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস (গ্যাপ) এবং স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) কমপ্লায়েন্স বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে এসব বিষয় আগামী দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা
কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষি উপদেষ্টা লে. জে. মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.)।
তিনি বলেন, "এটি আমাদের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। দেশের কৃষি খাতের ভবিষ্যৎ গঠনের লক্ষ্যেই এই পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। আগামী ২৫ বছরে বাংলাদেশের কৃষির রূপান্তর মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং গ্রামীণ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।"
তিনি আরও বলেন, "এই পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন শুধু কৃষি খাতের জন্য নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ হবে।"
পরিকল্পনা প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে মতবিনিময় এবং অংশীদারিত্বমূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে 'আউটলুক ২০৫০' প্রণয়ন করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, নীতিনির্ধারক, গবেষক, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী সংগঠন, ব্যবসায়ী সংগঠন, কৃষি উদ্যোক্তা, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যমকর্মী, কৃষক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়েছে। স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় একাধিক কর্মশালা ও আলোচনা সভার মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক ও জাতীয় চাহিদা এবং চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। জাতীয় এই কর্মশালা থেকে প্রাপ্ত পরামর্শও পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানান তারা।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ানের সভাপতিত্বে কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান, পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-এর প্রতিনিধি ড. জিয়াকুন শি।
