পহেলা বৈশাখে চালু হচ্ছে ‘কৃষক কার্ড’, ভূমিহীন ও ক্ষুদ্র কৃষকেরা পাবেন বছরে ২,৫০০ টাকা
দেশের কৃষি খাতকে ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনতে 'কৃষক কার্ড' চালু করতে যাচ্ছে সরকার। এ কার্ডের মাধ্যমে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের বছরে ২,৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
একইসঙ্গে ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ, সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণসহ ১০ ধরনের সেবা পাবেন কার্ডধারী কৃষকেরা। তিন ধাপে পর্যায়ক্রমে সারা দেশের সব কৃষককে এই কার্ডের আওতায় আনা হবে।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন বাংলা বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখে (মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল) প্রাক-পাইলটিং পর্যায়ের 'কৃষক কার্ড' বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করা হবে।
প্রথম ধাপে ১০ জেলার ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষককে এই কার্ড দেওয়া হবে। এর মধ্যে ২০ হাজার ৬৭১ জন ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক বছরে ২,৫০০ টাকা করে সরাসরি নগদ সহায়তা পাবেন। টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
কারা পাবেন সহায়তা?
কৃষক কার্ড বিতরণ কার্যক্রম তিন ধাপে বাস্তবায়িত হবে—প্রাক-পাইলটিং, পাইলটিং এবং দেশব্যাপী সম্প্রসারণ। প্রাক-পাইলটিং পর্যায়ে ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি ব্লকে ফসল উৎপাদনকারী কৃষকের পাশাপাশি মৎস্যচাষি বা আহরণকারী, প্রাণিসম্পদ খাতে নিয়োজিত খামারি ও দুগ্ধখামারিসহ ভূমিহীন, প্রান্তিক, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় শ্রেণির কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে লবণচাষীরাও এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।
জমির পরিমাণ অনুযায়ী কৃষকদের পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে—ভূমিহীন (৫ শতকের কম), প্রান্তিক (৫–৪৯ শতক), ক্ষুদ্র (৫০–২৪৯ শতক), মাঝারি (২৫০–৭৪৯ শতক) এবং বড় কৃষক (৭৫০ শতকের বেশি)। এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে শুধুমাত্র ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের প্রণোদনার আওতায় আনা হচ্ছে।
১১ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত মোট ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের সংখ্যা ২০ হাজার ৬৭১ জন, যা মোট কৃষকের প্রায় ৯৩.৭ শতাংশ। এই তিন শ্রেণির কৃষকরাই প্রথম ধাপে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পাবেন।
প্রাক-পাইলটিং কার্যক্রম বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
দেশব্যাপী সম্প্রসারণ পরিকল্পনা
প্রাক-পাইলটিং ধাপ শেষে আগামী আগস্টের মধ্যে ১৫টি উপজেলায় পাইলট কার্যক্রম চালু করা হবে। পাইলটিংয়ের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আগামী চার বছরে ধাপে ধাপে সারাদেশে কৃষক কার্ড বিতরণ এবং একটি সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
কৃষক কার্ড বাস্তবায়িত হচ্ছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের 'প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনিউরশিপ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ' প্রকল্পের মাধ্যমে। প্রি-পাইলটিং শেষে প্রকল্পটির বাকি কার্যক্রম এ প্রকল্পের অর্থায়নে হবে।
প্রকল্পটির প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর আবুল কালাম আজাদ টিবিএসকে বলেন, কৃষক কার্ড চালুর ফলে সার-বীজ সহায়তা, ক্ষতিপূরণ ও ভর্তুকি বিতরণে অব্যবস্থাপনা কমবে এবং প্রকৃত কৃষকদের শনাক্ত করা সহজ হবে।
তিনি আরও বলেন, "কৃষকরা কার্ডের অর্থ দিয়ে নির্দিষ্ট ডিলার থেকে কৃষি উপকরণ কিনতে পারবেন। পর্যায়ক্রমে দেশের সব কৃষককে এই কার্ডের আওতায় আনা হবে।"
কীভাবে কাজ করবে 'কৃষক কার্ড'?
'কৃষক কার্ড' মূলত একটি ব্যাংকিং ডেবিট কার্ড, যা রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে নির্বাচিত কৃষকদের নামে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে।
এই কার্ড ব্যবহার করে কৃষকরা সার, বীজ, মৎস্য ও প্রাণিখাদ্যসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ কিনতে পারবেন। প্রয়োজন অনুযায়ী সহজ শর্তে কৃষিঋণও নিতে পারবেন।
কী কী সুবিধা পাবেন কৃষকরা?
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কার্ডধারী কৃষকেরা মোট ১০ ধরনের সুবিধা পাবেন।
এর মধ্যে রয়েছে ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ ও সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, স্বল্পমূল্যে কৃষিযন্ত্রপাতি, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা, মোবাইলে আবহাওয়া ও বাজার তথ্য, কৃষি প্রশিক্ষণ, রোগবালাই দমনের পরামর্শ, কৃষি বীমা এবং ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রয়ের সুযোগ।
প্রভাব ও প্রতিবন্ধকতা
কৃষি খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই কার্ড চালুর ফলে ভর্তুকি ও প্রণোদনা বিতরণে স্বচ্ছতা বাড়বে, মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ কমবে এবং কৃষকদের সেবা পাওয়া সহজ হবে।
একই সঙ্গে উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও তথ্য ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল সংযোগ বাড়ার মাধ্যমে কৃষি খাত আরও সংগঠিত ও পরিকল্পিত হবে।
তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশেষ করে প্রকৃত কৃষক শনাক্তকরণ, হালনাগাদ তথ্যভান্ডার তৈরি, ব্যাংকিং সুবিধায় অভ্যস্ততা এবং মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা নিশ্চিত করা বড় বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই কর্মসূচির সুফল পুরোপুরি পাওয়া কঠিন হতে পারে। বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সাবেক সভাপতি ও ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজের (ইউজিভি) সাবেক উপাচার্য ড. জাহাঙ্গীর আলম খান টিবিএসকে বলেন, "কৃষক কার্ড একটি ভালো উদ্যোগ, যার মাধ্যমে প্রকৃত কৃষককে শনাক্ত করা সহজ হবে। তবে বাস্তবায়নের চার বছরের সময়সীমা দীর্ঘ; এটি আরও কমিয়ে আনা উচিত।"
তিনি বলেন, "এছাড়া কৃষক বাছাই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয় করে কৃষি বিভাগকে কাজ করতে হবে।"
এ বিষয়ে রোববার সচিবালয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ সাংবাদিকদের বলেন, "কৃষকের আর্থ-সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যেই 'কৃষক কার্ড' চালু করা হচ্ছে। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের একটি সার্বজনীন ডিজিটাল পরিচয় দেওয়া হবে, ফলে তারা সরাসরি ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আসবেন এবং প্রণোদনা ও সেবা গ্রহণ সহজ হবে।"
