নির্বাচনের আগে টেক্সটাইল মিল বন্ধের হুঁশিয়ারিতে পোশাক রপ্তানি নিয়ে উদ্বেগ
শুল্কমুক্ত সুবিধায় সুতা আমদানিকে কেন্দ্র করে টেক্সটাইল মিল মালিক ও পোশাক রপ্তানিকারকদের মধ্যে তীব্র বিরোধ চলছে। এমন পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) অনির্দিষ্টকালের জন্য মিল বন্ধের ঘোষণা দেওয়ায়, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে আরএমজি খাত থেকে। রপ্তানি ব্যাহত হওয়া ঠেকাতে সরকারও ব্যস্ত হয়ে উঠেছে।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান গতকাল দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, সরকার এই সংকটময় পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করছে এবং সম্ভাব্য বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে ভাবছে। তিনি বলেন, "টেক্সটাইল শিল্প সমস্যার মুখে আছে, এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিছু একটা করতেই হবে। আমরা কী কী বিকল্প সম্ভব, তা নিয়ে চিন্তা করছি।"
বিষয়টিকে জটিল আখ্যা দিয়ে তিনি আরও বলেন, "আমাদের একটি সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করব।"
বাণিজ্য সচিব জানান, সরকার, টেক্সটাইল মিল মালিক এবং পোশাক প্রস্তুতকারকসহ একাধিক অংশীজন এতে জড়িত। সবার স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে বর্তমানে কোন কোন উপায় বিবেচনায় রয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাননি।
নির্বাচনের আগে মিল বন্ধের হুঁশিয়ারি
এদিকে, সরকার দীর্ঘদিন ধরে ২৩ বিলিয়ন ডলারের টেক্সটাইল শিল্পকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কারখানা বন্ধের হুমকি দিয়েছেন টেক্সটাইল মিল মালিকরা। ১২ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে এ ঘোষণা আসায় বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।
তিনি বলেন, "এটা কোনো হুমকি নয়। খাতটি এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। এটি একটি সংকট, একটি জাতীয় সংকট।"
নীতিনির্ধারণের ধীরগতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, "ভারত যেকোনো পরিস্থিতিতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে, অথচ আমাদের সরকার মাসের পর মাসেও তা পারে না।"
তিনি অভিযোগ করেন, সরকার পোশাক খাতে বিভিন্ন প্রণোদনা দিলেও টেক্সটাইল মিল মালিকরা সেগুলোর সুবিধা পান না। বরং এসব সুবিধার বড় অংশ চলে যায় বিদেশি ক্রেতাদের হাতে।
রাসেলের মতে, ওপেন কস্টিং পদ্ধতিতে উৎপাদন ব্যয় বাড়লে শেষ পর্যন্ত তা ক্রেতাদের ওপরই পড়ে। কিন্তু দেশীয় টেক্সটাইল মিলগুলো বন্ধ হয়ে গেলে পোশাক প্রস্তুতকারকদের দীর্ঘমেয়াদে বেশি দামে ভারত থেকে সুতা আমদানি করতে হবে, যা প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
শ্রমিক, ব্যাংক ও রপ্তানিতে ঝুঁকি
শিল্পসংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন, টেক্সটাইল মিল বাস্তবে শাটডাউন করা হলে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে। এ খাতে কর্মরত ১০ লাখের বেশি শ্রমিকের মজুরি ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে, যা শ্রম অস্থিরতা উসকে দিতে পারে।
সুতা উৎপাদন বন্ধ হলে পোশাক শিল্পের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটবে। একই সঙ্গে ব্যাংকঋণ পরিশোধে সমস্যার কারণে খেলাপি ঋণ (এনপিএল) আরও বাড়তে পারে, যা নিয়ে ব্যাংকখাত ইতোমধ্যেই চাপের মধ্যে রয়েছে। বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৫ শতাংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, টেক্সটাইল খাতে বড় আকারের কারখানা বন্ধ হলে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যে থাকা অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি হবে।
এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা সুতা উৎপাদনকারী মিল ও পোশাক রপ্তানিকারকদের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রেখে দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
যেভাবে বিরোধ তীব্র হলো
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) এক চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত ১২ জানুয়ারি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দিয়ে বন্ডেড লাইসেন্সের আওতায় শুল্কমুক্ত সুতা আমদানির সুবিধা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানালে এই বিরোধ আরও তীব্র হয়।
পোশাক রপ্তানিকারকরা এ প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং 'কঠোর পদক্ষেপের' হুমকি দেন। তারা বলেন, এ সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে তা রপ্তানিমুখী পোশাক খাতের জন্য 'আত্মঘাতী' হবে।
এই প্রতিবাদের মুখে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তাদের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসে বলে মনে করা হয়। পরে টেক্সটাইল মিল মালিকরা বুধবার অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অবিলম্বে সুতা আমদানির বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহারের আদেশ জারির দাবি জানান। তবে তারা কোনো স্পষ্ট আশ্বাস পাননি।
এরপর হতাশা থেকে বিটিএমএ গতকাল 'জরুরি সংবাদ সম্মেলন' ডেকে আবারও মিল বন্ধের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে। শওকত আজিজ রাসেল বলেন, "দেশের জিডিপিতে পোশাক খাতের অবদান ১৩ শতাংশ, অথচ নীতিনির্ধারকেরা এই খাতের মানুষের জন্য ১৩ মিনিট সময়ও দেন না। সব মন্ত্রণালয়ের সব ডিপার্টমেন্টের কাছে গিয়েছি। তারা কেবল পিলো পাসিংয়ের মতো দায়িত্ব অন্যদের কাছে দিয়ে দিচ্ছে।"
কারখানা শাটডাউনের হুঁশিয়ারি পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, "আগামী ১ তারিখ থেকেই ফ্যাক্টরি বন্ধ। আমরা বন্ধ তো করবই, ব্যাংকের টাকা ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা নেই। আমাদের পুঁজি অর্ধেক হয়ে গেছে।"
বিটিএমএ নেতারা জানান, মিল মালিকরা বারবার ভারত থেকে সুতা আমদানির বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহার অথবা খাতটিকে টিকিয়ে রাখতে বিশেষ নগদ প্রণোদনার দাবি জানিয়ে আসছেন।
টেক্সটাইল মিল বন্ধের সম্ভাব্য প্রভাব
বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাতে প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। নির্বাচনের ঠিক আগে, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এসব কারখানা বন্ধ হলে শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে, যা ভোটের আগে শ্রম অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনের পর দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বিটিএমএ সভাপতি রাসেল বলেন, "মিল বন্ধ হলে শ্রমিকরা মজুরির দাবিতে কারখানায় ভাঙচুর করতে পারে।"
তিনি বলেন, টেক্সটাইল উদ্যোক্তারা এ খাতের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছেন। "টেক্সটাইলই আমাদের একমাত্র ব্যবসা নয়। এই শিল্পকে ঘিরেই আমরা অন্যান্য ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছি। টেক্সটাইল মিল বন্ধ হলে সবকিছুই ধুঁকবে," বলেন তিনি। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ বাড়বে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, "এই ব্যবসা থেকে এক্সিট নিতে পারলেই হয়তো আমরা টিকে থাকতে পারব।"
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, টেক্সটাইল মিল বন্ধ হলে শুধু শ্রম অস্থিরতাই বাড়বে না, পোশাক রপ্তানির কাঁচামাল সরবরাহ ব্যাহত হবে এবং আমদানিনির্ভরতা বাড়বে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, "বড় ও ক্যাপিটাল–ইনটেন্সিভ (পুঁজিনির্ভর) মিলগুলো বন্ধ হয়ে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে খেলাপি ঋণ আরও বাড়বে।"
বিশেষজ্ঞদের বিকল্প প্রস্তাব
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ও বিটিটিসির সাবেক সদস্য ড. মোস্তফা আবিদ খান বলেন, বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহার করলে পোশাক রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে আমদানি বিকল্প ব্যাকওয়ার্ড-লিংকেজ শিল্প হিসেবে স্পিনিং মিলগুলোকে টিকিয়ে রাখাও জরুরি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, "সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম মেনে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে।" স্পিনিং মিলগুলোকে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে একটি সহায়ক ব্যবস্থাও গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পোশাক রপ্তানিকারকদের বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহার করে টেক্সটাইল মিল রক্ষা করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তিনি বলেন, "এলডিসি নীতিমালার আলোকে টেক্সটাইল মিলগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সীমিত নগদ সহায়তা বা বিশেষ ঋণ সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।"
ভারত যদি অন্যায্য কম দামে বাংলাদেশে সুতা রপ্তানি করে—এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে ভারতের বিরুদ্ধে অ্যান্টি-ডাম্পিং তদন্ত শুরুর পরামর্শও দেন তিনি। সে ক্ষেত্রে শুল্ক আরোপের যৌক্তিকতা তৈরি হতে পারে। বিকল্প হিসেবে আমদানি কোটা নির্ধারণের কথাও বলেন তিনি।
ডব্লিউটিও বিধি লঙ্ঘনের আশঙ্কা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকায় অবস্থানকালে বা উত্তরণের তিন বছরের মধ্যে এমন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোনো দেশ বিরোধ নিষ্পত্তিতে যায়নি, ফলে সেই ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম।
সুতা আমদানির প্রবণতা
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার—অর্থাৎ ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি—সুতা আমদানি করেছে, যার ৮০ শতাংশের বেশি এসেছে ভারত থেকে। গত তিন বছরে ভারত থেকে সুতা আমদানি দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
দেশীয় উদ্যোক্তাদের দাবি, ভারত সরকারের প্রণোদনার কারণে সে দেশের রপ্তানিকারকরা বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতার দামের তুলনায় প্রায় ৩০ সেন্ট কম দামে সুতা বিক্রি করতে পারছেন। ফলে স্থানীয় মিলগুলো প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে। গুদামে পণ্যের স্তূপ জমছে। এমনকি অনেক কারখানা তাদের স্থাপিত সক্ষমতার মাত্র অর্ধেকে চলছে।
তবে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান সুতা আমদানি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে—এমন দাবি নাকচ করেন।
তিনি বলেন, "পোশাক রপ্তানি কমে যাওয়ায়, জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় সুতা আমদানিও কমেছে।"
তার মতে, মূল সমস্যা হলো দেশীয় টেক্সটাইল খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস।
তিনি বলেন, "আমরা সবাই একমত যে টেক্সটাইল খাতের সুরক্ষা দরকার। কিন্তু তা পোশাক রপ্তানিকারকদের ক্ষতি করে করা যায় না। ভারত যদি তার শিল্পকে সহায়তা দেয়, প্রয়োজনে বাংলাদেশও একই ধরনের সহায়তা বিবেচনা করতে পারে।"
গত সপ্তাহে বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমানও একই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আমদানি বন্ধ করলে একচেটিয়া পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, কারণ স্থানীয় মিলগুলো সব ধরনের—বিশেষ করে প্রিমিয়াম—সুতা সরবরাহ করতে পারে না।
তিনি বলেন, সময়মতো সরবরাহ ও প্রতিযোগিতামূলক দাম নিশ্চিত করা গেলে রপ্তানিকারকরা দেশীয় উৎস থেকেই সুতা কিনতে আগ্রহী হবেন। একই সঙ্গে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, প্রণোদনা দেওয়া এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের মাধ্যমে স্পিনিং মিলগুলোকে সহায়তা করার আহ্বান জানান তিনি।
