শূকর জবাইয়ে সাহায্য চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট চীনা তরুণীর; পরদিনই হাজারো মানুষের ঢল
চীনা নববর্ষের ঠিক আগে দাইদাই বুঝতে পারেন, ঐতিহ্যবাহী গ্রাম্য ভোজের জন্য দুটি শূকর জবাই করার মতো শারীরিক শক্তি তার বৃদ্ধ বাবার আর নেই। তবে তিনি চাননি, এতে বাবার মনে কষ্ট তৈরি হোক বা তিনি নিজেকে অসহায় মনে করুন। উপায় না পেয়ে দাইদাই শেষ পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্য নেন।
গত সপ্তাহের শেষের দিকে চীনের টিকটক সংস্করণ 'দোয়িন'-এ তিনি একটি ভিডিও পোস্ট করেন। সেখানে তিনি বলেন, 'কেউ কি আমাকে সাহায্য করতে পারেন? আমার বাবা খুব বৃদ্ধ। আমি চিন্তিত যে তিনি একা এই শূকরগুলো সামলাতে পারবেন না।'
দাইদাই জানান, যারা তাকে সাহায্য করতে তার গ্রাম ছিংফুতে আসবেন, তাদের সবাইকে শূকরের মাংস দিয়ে ভোজ করানো হবে। সিচুয়ান ও ছংছিং অঞ্চলের গ্রামগুলোতে এ ধরনের বড় সামাজিক ভোজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য। এসব ভোজে সাধারণত দুইবার রান্না করা শূকরের মাংস, ভাপানো হাড়ের মাংস, স্যুপ এবং ঘরে তৈরি পানীয় পরিবেশন করা হয়। দাইদাইয়ের আবেদন ছিল, 'গ্রামে যেন আমি মাথা উঁচু করে থাকতে পারি, সেই ব্যবস্থা করুন।'
এই ছোট্ট সাহায্যের আবেদনে ১০ লাখেরও বেশি 'লাইক' পড়ে। এরপর যা ঘটে, তা যেন কোনো সিনেমার দৃশ্য। হাজার হাজার গাড়ি নিয়ে প্রয়োজনের চেয়েও অনেক বেশি মানুষ তাকে সাহায্য করতে গ্রামে ছুটে আসেন।
সাড়া এতটাই বেশি ছিল যে, দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ছংছিং অঞ্চলের গ্রামীণ রাস্তাগুলোতে তীব্র যানজট তৈরি হয়। ড্রোনে তোলা ছবিতে দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে ধানের ক্ষেত আর মাঝখানে গাড়ির দীর্ঘ সারি—সবাই ছিংফুতে ঢোকার অপেক্ষায়। যানজট এড়াতে অনেকে মাইলের পর মাইল হেঁটেই গ্রামে পৌঁছান।
পরিস্থিতি দেখে দাইদাই আবার পোস্ট দিয়ে আগত গাড়িচালকদের সাবধানে গাড়ি চালানোর অনুরোধ জানান। বিশেষ করে যারা শহর থেকে এসেছেন এবং গ্রামের সরু রাস্তায় গাড়ি চালাতে অভ্যস্ত নন, তাদের সতর্ক থাকতে বলেন তিনি।
১০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূর থেকে গাড়ি চালিয়ে আসা এক ব্যক্তি বিবিসিকে বলেন, 'পরিবেশটা ছিল দারুণ। এটা আমাকে ছোটবেলার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে, যখন আমাদের বাড়িতেও শূকর পালন করা হতো। বহু বছর পর এমন অনুভূতি হলো।' তিনি জানান, সেখানে দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা গাড়ির নম্বর প্লেট দেখা গেছে।
শেষ পর্যন্ত শূকর জবাই ও ভোজের আয়োজন শুরু হলে অনলাইনে তা সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। এই লাইভ অনুষ্ঠান ১ লাখেরও বেশি মানুষ দেখেন এবং এতে ২ কোটি 'লাইক' পড়ে। স্থানীয় সরকার ঘটনাটিকে তাৎক্ষণিক পর্যটনের সুযোগ বা 'ফ্ল্যাশ-টুরিজম' হিসেবে বিবেচনা করে। দুটি শূকরে এত মানুষের খাবার হবে না বুঝে পর্যটন কর্মকর্তারা অতিরিক্ত শূকর দান করেন। পাশাপাশি স্থানীয় ছোট রেস্তোরাঁগুলো খোলা জায়গায় বসার ব্যবস্থা করে দর্শনার্থীদের খাবার পরিবেশন শুরু করে।
এই ঘটনা দেখিয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে একটি ছোট উদ্যোগ কীভাবে খুব দ্রুত বড় ঘটনায় পরিণত হতে পারে। দাইদাই চীনা গণমাধ্যমকে বলেন, 'আমি ভেবেছিলাম বড়জোর ১০–১২ জন আসবে। কিন্তু এত মানুষ এসেছে যে গুনে শেষ করা যাবে না।'
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার পেছনে মানুষের সামাজিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের প্রতি গভীর আকর্ষণ কাজ করেছে। পাশাপাশি জীবনের চাপ ও কঠিন সময় থেকে বেরিয়ে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও মানুষকে এখানে টেনে এনেছে।
দাইদাই জানান, গত শুক্রবার তিনি সাহায্যের আবেদন করেছিলেন। শনিবারের মধ্যেই মানুষের সাড়া এত বেড়ে যায় যে, তিনি পুলিশকে খবর দিতে বাধ্য হন। ভিড়ের কারণে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে—এই আশঙ্কায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
ভোজ উৎসবটি দুই দিন ধরে চলে। ১১ জানুয়ারি এতে প্রায় ১ হাজার মানুষ অংশ নেন, আর পরদিন সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজারে। রাতে ক্যাম্পফায়ার জ্বালানো হয়, চলে ব্যান্ডের গান ও আনন্দ-উৎসব।
টানা দুই দিনে মাত্র চার ঘণ্টা ঘুমানোর পর ক্লান্ত দাইদাই শেষ পর্যন্ত ঘোষণা দেন যে উৎসব শেষ হয়েছে। তিনি দর্শনার্থীদের এলাকাটি ঘুরে দেখার অনুরোধ জানান, তবে তার বাড়িতে আর ভিড় না করার আহ্বান জানান।
তবুও দাইদাই ও তার গ্রামের জন্য এটি ছিল এক অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা। যারা তার ডাকে সাড়া দিয়ে এসেছিলেন, সেই সব অপরিচিত মানুষের উদ্দেশে তিনি বলেন, 'আপনাদের উৎসাহ ও আবেগ ছাড়া এমন ভোজ আয়োজন সম্ভব হতো না। যারা এসেছেন, সবাই যেন এক বড় পরিবারের সদস্য ছিলেন। পরিবেশটা ছিল খুব উষ্ণ, শান্ত এবং অর্থবহ।' হঠাৎ এত বড় আয়োজন সামলাতে সহায়তা করার জন্য তিনি স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকেও ধন্যবাদ জানান।
ধারণা করা হচ্ছে, দাইদাইয়ের গ্রাম যে বিখ্যাত 'হেচুয়ান' অঞ্চলে অবস্থিত, সেখানে ভবিষ্যতে এই আয়োজনকে নিয়মিত উৎসবে রূপ দেওয়া হতে পারে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ বাড়ানো এবং স্থানীয় সংস্কৃতিকে তুলে ধরাই এর লক্ষ্য।
'পিপলস ডেইলি' পত্রিকায় গ্রামের এক বাসিন্দার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, 'এখানে প্রতিবেশীরা একে অপরকে সাহায্য করে। আজ আমি তোমার বাড়িতে শূকর জবাই করতে সাহায্য করব, কাল তুমি আমার বাড়িতে এসে আমাকে সাহায্য করবে।'
দাইদাইয়ের বাবা এই ঘটনায় খুবই আনন্দিত। দাইদাই এক সাক্ষাৎকারে বলেন, 'এত মানুষ আসতে দেখে বাবাকে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে টেবিল-চেয়ার ধার করতে হয়েছে। আমাদের জীবনে এমন অভিজ্ঞতা আগে কখনো হয়নি।'
