৬০ হাজার বছর আগেই শিকারের হাতিয়ার ছিল বিষাক্ত তীর!
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রস্তর যুগের শিকারিদের ব্যবহৃত তীরের ফলায় উদ্ভিজ্জ বিষের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষকরা বলছেন, বন্য প্রাণী শিকারের জন্য বিষাক্ত তীরের ব্যবহার শুরু হয়েছিল প্রায় ৬০ হাজার বছর আগে।
গত বুধবার 'সায়েন্স অ্যাডভান্সেস' জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে মানুষ যতটা আগে ভেবেছিল, তার চেয়েও হাজার হাজার বছর আগে থেকে অত্যন্ত উন্নত ও কৌশলী শিকার পদ্ধতি প্রচলিত ছিল।
গবেষণাটির প্রধান লেখক এবং স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক বিজ্ঞান ল্যাবরেটরির অধ্যাপক সভেন ইসাকসন বলেন, 'শিকারের ক্ষেত্রে বিষাক্ত তীর সাধারণত কোনো প্রাণীকে তাৎক্ষণিকভাবে মেরে ফেলে না। বরং এই বিষ ব্যবহারের উদ্দেশ্য ছিল আহত প্রাণীকে অনুসরণ করা এবং তাকে ক্লান্ত করে দ্রুত কাবু করা। এতে শিকারির সময় ও শ্রম—উভয়ই বেঁচে যেত।'
তীরের ফলায় লেগে থাকা বিষাক্ত রাসায়নিক অবশিষ্টাংশ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দুই ধরনের জৈব যৌগ বা অ্যালকালয়েড খুঁজে পেয়েছেন। এগুলো মূলত 'গিফবল' বা স্থানীয়ভাবে 'পয়জন বাল্ব' নামে পরিচিত এক প্রকার উদ্ভিদ থেকে পাওয়া। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ওই অঞ্চলের আদিবাসী শিকারিরা আজও শিকারের জন্য এই একই উদ্ভিদের বিষ ব্যবহার করেন।
১৯৮৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার কোয়াজুলু-নাটাল প্রদেশের 'উমহলাতুজানা রক শেল্টার' থেকে কোয়ার্টজ পাথরের তৈরি এই তীরের ফলাগুলো উদ্ধার করা হয়েছিল। লেট প্লাইস্টোসিন যুগের এই নিদর্শনে বিষের উপস্থিতি নির্দেশ করে যে, প্রাগৈতিহাসিক মানুষেরা জানত কোন উদ্ভিদটি বিষাক্ত এবং সেই বিষ কার্যকর হতে কত সময় লাগে।
অধ্যাপক ইসাকসন জানান, 'তীরের মাথায় কোনো বিষ মাখালে তা কয়েক ঘণ্টা পর একটি প্রাণীকে দুর্বল করে দেবে—এটি বুঝতে পারা সাধারণ কোনো বিষয় নয়। এর জন্য প্রয়োজন কার্যকারণ সম্পর্ক বোঝার ক্ষমতা এবং ভবিষ্যতের ফলাফল অনুমান করার দক্ষতা। এই প্রমাণগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, প্রাগৈতিহাসিক মানুষের উন্নত বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা, জটিল সাংস্কৃতিক জ্ঞান এবং সুবিকশিত শিকার পদ্ধতি ছিল।'
বিষাক্ত উদ্ভিদ শনাক্তকরণ
মানুষ দীর্ঘকাল ধরে উদ্ভিদকে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করলেও, তুষারযুগের পূর্বপুরুষরা যে উদ্ভিদের রাসায়নিক গুণাগুণ ব্যবহার করে ওষুধ বা বিষ তৈরি করতে জানত, বিষাক্ত তীর তার অন্যতম উদাহরণ।
গবেষণায় বলা হয়েছে, শিকারিরা গিফবল উদ্ভিদের কন্দ তীরের ফলায় বিঁধিয়ে অথবা কন্দ কেটে পাত্রে বিষ সংগ্রহ করে তা তীরের মাথায় মাখাতেন। কখনো কখনো রোদে শুকিয়ে বা তাপ দিয়ে এই বিষের তীব্রতা বাড়ানো হতো।
বিষ মূলত কয়েকভাবে কাজ করে। এর মধ্যে 'মায়োটক্সিন' পেশিতন্তুকে ধ্বংস করে এবং 'নিউরোটক্সিন' স্নায়ুতন্ত্রকে অকেজো করে দেয়। ইসাকসনের মতে, প্রাচীন শিকারিরা হয়তো পেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন বিষ প্রয়োগ করা পশুর নির্দিষ্ট অংশ এড়িয়ে চলতেন। অন্যদিকে, নিউরোটক্সিন পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ার পর রান্নার সময় তা অনেকটাই হালকা হয়ে যেত।
তিনি আরও জানান, কিছু বিষ কেবল রক্তে মিশলেই বিপজ্জনক হয়, কিন্তু পাকস্থলীতে গেলে ক্ষতি করে না। আবার কিছু বিষ তাপ দিলে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, যা রান্নার মাধ্যমে নিরাপদ করা সম্ভব ছিল।
রাসায়নিক বিশ্লেষণে ১০টি কোয়ার্টজ তীরের ফলার মধ্যে ৫টিতে বুফ্যান্ড্রিন ও এপিবুফানিসিন নামক অ্যালকালয়েডের উপস্থিতি মিলেছে। হাজার হাজার বছর মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকার পরও এই উপাদানগুলো টিকে ছিল, কারণ এগুলো সহজে পানিতে দ্রবীভূত হয় না। গবেষণায় দেখা গেছে, এই উদ্ভিদের সামান্য বিষও ২০-৩০ মিনিটের মধ্যে ইঁদুর জাতীয় প্রাণীকে মেরে ফেলতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রে এটি বমি বমি ভাব, শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসে পানি জমা এবং নাড়ির স্পন্দন কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ তৈরি করে।
তুলনামূলক পর্যালোচনার জন্য বিজ্ঞানীরা দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে সংগৃহীত ২৫০ বছরের পুরনো চারটি তীরের ফলাও পরীক্ষা করেন। তাতেও হুবহু একই বিষাক্ত উপাদানের সন্ধান মিলেছে, যা প্রমাণ করে এই প্রাচীন শিকার পদ্ধতি হাজার বছর ধরে বংশপরম্পরায় চলে আসছে।
প্রাগৈতিহাসিক জীবনযাত্রার এক ঝলক
জোহানেসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যালিও-রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক জাস্টিন ব্র্যাডফিল্ড বলেন, 'প্রত্নতাত্ত্বিকরা আগে থেকেই ধারণা করতেন যে প্রাচীন মানুষের উদ্ভিজ্জ বিষ সম্পর্কে জ্ঞান ছিল, কিন্তু এতদিন তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া কঠিন ছিল।' তিনি বলেন, 'জৈব অণুগুলো সময়ের সাথে সাথে নষ্ট হয়ে যায়। তবে ইসাকসন ও তার দল ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অবশিষ্টাংশ বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করে যা দেখিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।'
উমহলাতুজানার এই আবিষ্কারের আগে মিশরের একটি সমাধিতে ৪ হাজার বছর পুরনো হাড়ের তৈরি তীরের ফলায় বিষের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল। এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রুগার গুহায় প্রায় ৬ হাজার ৭০০ বছর আগের প্রমাণ মিলেছিল। কিন্তু বর্তমান গবেষণাটি সেই সময়রেখাকে এক ধাক্কায় ৬০ হাজার বছর আগে নিয়ে গেল।
ফরাসি ন্যাশনাল সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চের প্রত্নতাত্ত্বিক লুডোভিক স্লিমাক বলেন, 'এই গবেষণা প্রমাণ করে যে ধনুক এবং বিষাক্ত তীরের ব্যবহার কেবল পরবর্তী সময়ের উদ্ভাবন নয়, বরং এটি অন্তত ৮০ হাজার বছর আগের একটি মৌলিক ও জটিল প্রযুক্তি। এটি হোমো সেপিয়েন্সদের অন্যান্য আদিম প্রজাতি (যেমন নিয়ান্ডারথাল) থেকে বুদ্ধিবৃত্তিক পার্থক্যের একটি বড় নিদর্শন।'
অধ্যাপক ইসাকসন এখন দক্ষিণ আফ্রিকার আরও কিছু স্থানে এই গবেষণার পরিধি বাড়াতে চান। তার ভাষায়, 'এই আবিষ্কার আমাদের জানায় যে তখনকার মানুষ কীভাবে চিন্তা করত, পরিকল্পনা সাজাত এবং চারপাশের জগতকে তারা কতটা গভীরভাবে বুঝতে পারত।'
