স্পেনের গুহায় শকুনের বাসা থেকে মিলল ৬৫০ বছর আগের জুতাসহ অজস্র নিদর্শন
৬৫০ বছরেরও বেশি সময় আগেকার কথা। দক্ষিণ স্পেনের কোনো এক বাসিন্দা হয়তো ঘাস ও ডালপালা দিয়ে বোনা একজোড়া জুতো খুলে রেখেছিলেন বা হারিয়ে ফেলেছিলেন। সাধারণত এমন জিনিস সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে ঘটল ভিন্ন ঘটনা।
এক বিয়ার্ডেড [দাড়িওয়ালা] শকুন সেটি তুলে নিয়ে উড়ে গিয়ে রাখে নিজ বাসায়। পাহাড়ের চূড়ার এক গুহায় শীতল ও শুষ্ক বাতাস জুতাটিকে একেবারে অক্ষত অবস্থায় সংরক্ষণ করে রেখেছিল। এরপর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শকুনরা সেই বাসা ব্যবহার করেছে আর সযত্নে আগলে রেখেছে বাসাটি। সেই থেকে এটি সেখানেই ছিল।
২০০৮ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে স্পেনের কয়েকটি পাহাড়ি গুহায় দড়ি বেয়ে নেমে গবেষকরা বিয়ার্ডেড শকুনের এক ডজন বাসা পরীক্ষা করেন। সেখানেই তারা পান ওই স্যান্ডেলসহ ২০০-র বেশি মানবসৃষ্ট জিনিসপত্র, যেগুলোর কিছু মধ্যযুগীয় সময়কার। সম্প্রতি 'ইকোলজি' সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় এসব আবিষ্কারের বিবরণ জানানো হয়েছে।
বিয়ার্ডেড শকুন একমাত্র শকুন প্রজাতি যারা হাড় খেতে পারদর্শী এবং মৃতদেহের কঙ্কাল চিবিয়ে খায়। এই পাখিদের আরও একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো, এরা লাল-কমলা রঙের কাদায় গোসল করে নিজেদের পালক রাঙিয়ে নেয়। এরা সাধারণত পাহাড়ে বাস করে এবং খাড়া পাহাড়ের গুহার মতো সুরক্ষিত স্থানে বাসা তৈরি করে।
গুহার বিশেষ আবহাওয়া বা মাইক্রোক্লাইমেট শকুনদের বংশবৃদ্ধির সময় ব্যবহৃত জিনিসগুলোকে নষ্ট হওয়ার হাত থেকে বাঁচায়। প্রতিবার ব্যবহারের সময় এরা বাসায় নতুন ডালপালা যুক্ত করে, ডিম উষ্ণ রাখার জন্য ভেড়ার পশম দিয়ে বাসার আস্তরণ তৈরি করে এবং ক্ষুধার্ত ছানাদের জন্য ছাগলের মৃতদেহের অংশ নিয়ে আসে।
এই গবেষণার প্রধান লেখক ও স্পেনের পিরেনিয়ান ইনস্টিটিউট অব ইকোলজির বাস্তুবিদ অ্যান্টনি মারগালিডা বলেন, 'শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই জিনিসগুলো খুব ভালোভাবে সংরক্ষিত থাকে।' তিনি স্পেনের এই গুহাগুলোকে একটি প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘরের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
গবেষকরা পুরনো বাসাগুলো স্তর ধরে খুঁড়ে খুঁজে পেয়েছেন অজস্র জীববৈজ্ঞানিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। ১২টি বাসা থেকে বিজ্ঞানীরা চমকপ্রদ সব বস্তুর সন্ধান পান। এর মধ্যে বেশিরভাগই ছিল শকুনের শিকার করা প্রাণীর দেহাবশেষ—যেমন ৮৬টি খুর এবং ২,১০০টিরও বেশি হাড়। এছাড়া ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পর কয়েক ডজন ডিমের খোসার টুকরোও পাওয়া যায়।
গবেষক দলটি বাসাগুলো থেকে মানুষের তৈরি বিভিন্ন জিনিস, যেমন—কাপড়ের টুকরো ও সরঞ্জামও খুঁজে পায়। এর মধ্যে এসপার্টো নামক এক ধরনের বোনা ঘাস দিয়ে তৈরি একটি গুলতিও ছিল। এমনকি একটি ক্রসবো বা আড়ধনু থেকে ছোড়া তীরও পাওয়া গেছে। গবেষকদের ধারণা, হয়তো বাসা তৈরির জন্য এটিকে ডালপালার মতো ব্যবহার করা হয়েছিল অথবা কোনো প্রাণীর দেহে বিদ্ধ থাকা অবস্থায় এটি বাসায় এসেছিল।
গবেষকরা দুটি বাসা থেকে পাওয়া কিছু জিনিসের বয়স নির্ধারণের জন্য কার্বন-১৪ বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এতে দেখা যায়, ঘাসে বোনা জুতাটির বয়স প্রায় ৬৭৫ বছর। ঝুড়ির একটি অংশের বয়স তুলনামূলকভাবে কম, প্রায় ১৫০ বছর। তবে মারগালিডাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে প্রায় সাড়ে ছয় শতাব্দীর পুরোনো এক টুকরো ভেড়ার চামড়া, যার ওপর লাল গিরিমাটি দিয়ে রেখা আঁকা ছিল।
শুধু নিদর্শন নয়, এসব উপকরণ গবেষকদের কাছে ভবিষ্যৎ সংরক্ষণ পরিকল্পনার দিকনির্দেশও দিতে পারে। যেমন- সংরক্ষিত ডিমের খোসার বিষাক্ততা বিশ্লেষণ করে জানা যাবে, পাখিরা কখন কীটনাশকের সংস্পর্শে এসেছিল। বাসার ভেতরে পাওয়া বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর হাড় থেকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। আবার, গাছের ডালপালা বিশ্লেষণ করে স্থানীয় উদ্ভিদ জগতের পরিবর্তন সম্পর্কেও জানা সম্ভব হবে।
মারগালিডা বলেন, 'ভবিষ্যতে বিশ্লেষণের জন্য আমাদের কাছে বেশ কিছু ধারণা রয়েছে। আমি মনে করি, এই উপাদানগুলো গবেষণার অনেক নতুন দিক খুলে দেবে।'
এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও কনজারভেশন সায়েন্স গ্লোবাল, ইনকর্পোরেটেডের নির্বাহী পরিচালক ও বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞানী ট্রিসিয়া মিলার বলেন, অনেক শিকারি পাখিই তাদের পুরোনো বাসা পুনরায় ব্যবহার করে। পাখিরা এমনকি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একই বাসা ব্যবহার করতে পারে।
তিনি জানান, একটি গোল্ডেন ঈগলের বাসা এতটাই পুরোনো ছিল যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নতুন উপাদান যোগ করার ফলে এটি ২০ ফুট গভীর হয়ে গিয়েছিল। গ্রিনল্যান্ডে কার্বন ডেটিং পরীক্ষায় দেখা গেছে, একটি জিরফ্যালকন পাখির বাসা দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
মিলার বলেন, 'পরিবেশগত এবং প্রত্নতাত্ত্বিক কারণে এসব বাসা থেকে তথ্য সংগ্রহ করার ভাবনাটা সত্যিই দারুণ।'
অনেক সময় ব্যবহারিক কারণেও মানুষের তৈরি জিনিস শকুনের বাসায় পাওয়া যায়। মারগালিডা জানান, তিনি বর্তমান সময়ের একটি শকুনের বাসায় একটি টি-শার্ট খুঁজে পেয়েছেন। সম্ভবত ভেড়ার পশম না পাওয়ায় বাসা গরম রাখার জন্য এটি ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে কিছু কিছু জিনিসের উপস্থিতির কারণ বেশ রহস্যময়।
নিউ জার্সিতে অস্প্রে পাখির বাসা নিয়ে নিজের সমীক্ষার কথা উল্লেখ করে মিলার বলেন, 'আমরা নিয়মিতই বাসাগুলো থেকে নানা ধরনের জিনিসপত্র পাই।' এর মধ্যে দড়ি ও প্লাস্টিকের জিনিসও রয়েছে। মিলার ধারণা করেন, পাখিরা হয়তো প্রকৃতিতে থাকা অদ্ভুত জিনিসগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হয় অথবা এগুলোকে সাজসজ্জার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে।
স্পেনের শকুনের বাসা থেকে পাওয়া মধ্যযুগীয় জুতার মতোই একটি ঘটনার প্রতিধ্বনি করে মিলার বলেন, 'আমার মনে হয়, সবচেয়ে অদ্ভুত যে জিনিসটি আমি খুঁজে পেয়েছিলাম, তা হলো একটি ক্রোকস (এক ধরনের প্লাস্টিকের জুতো)।'
