দেশজুড়ে শীতজনিত রোগ বাড়ছে, শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতার পরামর্শ চিকিৎসকদের
দেশজুড়ে শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। নিউমোনিয়া, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ (এআরআই), ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন মৌসুমি রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসছেন অনেকে।
চিকিৎসকদের মতে, এসব রোগে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। ফলে তাদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ নভেম্বর থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত গত দুই মাসে সারাদেশে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ৯৫ হাজার ৩৭৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এদের মধ্যে ৬৬ হাজার ৮৫৪ জন ডায়রিয়া এবং ২৮ হাজার ৫২৪ জন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হন। এ সময় শীতজনিত রোগে মোট ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে ৪০ জন এবং ডায়রিয়ায় মারা গেছেন ৪ জন।
তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় শুক্রবার (২ জানুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে শনিবার (৩ জানুয়ারি) সকাল ৮টা পর্যন্ত সারাদেশের সরকারি হাসপাতালে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ২ হাজার ২৪ জন ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে ৬৩০ জন এবং ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ৪১৩ জন রোগী ভর্তি হন।
এদিকে, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে নিউমোনিয়া রোগী ৪২ শতাংশ এবং ডায়রিয়া রোগী ২৮ শতাংশ বেড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট ও চাঁদপুর—এই ছয় জেলায় ঠান্ডাজনিত রোগের প্রকোপ তুলনামূলক বেশি। ডায়রিয়ার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে শিশুরা
শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের মধ্যে ঠান্ডাজনিত রোগের প্রকোপও বাড়ছে। বিশেষ করে এআরআই, নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কিওলাইটিসে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কামরুজ্জামান কামরুল।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে তিনি বলেন, "শীতের প্রবাহের কারণে শিশুদের ঠান্ডাজনিত সমস্যা বাড়ছে। যেসব শিশুর আগে থেকেই শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। হাসপাতালে বর্তমানে এআরআই, নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কিওলাইটিস রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, বিশেষ করে ব্রঙ্কিওলাইটিসে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।"
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ ডিসেম্বর হাসপাতালের আউটডোরে নিউমোনিয়া নিয়ে ৭৭ জন, কমন কোল্ডে ১৯৯ জন, অ্যাজমায় ১৪ জন এবং ডায়রিয়ায় ৬১ জন শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ৪৪ জন, ডায়রিয়ায় ৭ জন এবং ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৭ জন রোগী ভর্তি রয়েছে।
গত ২২ ডিসেম্বর থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯ দিনে শিশু হাসপাতালের আউটডোরে কমন কোল্ড, নিউমোনিয়া ও অ্যাজমায় আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ৯৬৫ জন শিশু এবং ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৩৬১ জন শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। এ সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৯৫ জন শিশু।
শিশুদের সুরক্ষায় যা করতে হবে
ডা. কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, শৈত্যপ্রবাহের কারণে ঢাকার বাইরে থেকে অনেক রোগী হাসপাতালে আসতে না পারলেও, ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ঠান্ডাজনিত শ্বাসতন্ত্রের রোগ বেশি দেখা যাচ্ছে।
শিশুদের সুরক্ষায় অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, "শীতের সময় শিশুদের অপ্রয়োজনে বাইরে নেওয়া উচিত নয়। স্কুলগামী শিশুদের গরম জামাকাপড় পরাতে হবে এবং মাফলার ও কান ঢাকার ব্যবস্থা রাখতে হবে। ঠান্ডা খাবার ও বাইরের খাবার শিশুদের দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।"
তিনি আরও বলেন, "যেসব শিশু বুকের দুধ খায়, তাদের ঘন ঘন বুকের দুধ খাওয়ানো জরুরি। ঠান্ডা বা কাশি হলে নাক পরিষ্কার করে দিতে হবে এবং প্রয়োজনে গরম পানি দিতে হবে।"
নিউমোনিয়ার লক্ষণ সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "শিশুর জ্বর বেশি হলে, শ্বাসকষ্ট বাড়লে, শ্বাস নেওয়ার সময় বুকের নিচের অংশ দেবে গেলে বা শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বেড়ে গেলে দেরি না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতাল বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।"
শীতকালে শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়ার প্রবণতাও বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, "ডায়রিয়া হলে বুকের দুধ খাওয়া শিশুদের ঘন ঘন বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। ছয় মাসের বেশি বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে কাঁচা কলা বা মুরগির মাংস ম্যাশ করে দেওয়া যেতে পারে।"
তবে ঘন ঘন বমি, পাতলা পায়খানা বেশি হওয়া বা শিশুর অবস্থা খারাপ হলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
