‘আমার বাচ্চাটা কাশলেই ভয়ে কুঁকড়ে যাই’: দিল্লির বিষাক্ত বাতাসে ধুঁকছে শিশুরা
দিল্লির আকাশ এখন বিষাক্ত ধোঁয়ায় ঢাকা। এই বিষ কাউকে ছাড়ছে না। তবে সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে শিশুদের। দূষণ যত বাড়ছে, এ শহরের শিশুদের অসুস্থতা বাড়ছে।
এর প্রমাণ মিলবে শিশু বিশেষজ্ঞদের চেম্বারগুলোতে। কিছুদিন আগে নয়ডার এক ক্লিনিকে গিয়ে দেখা গেল উপচে পড়া ভিড়। চিকিৎসকের ঘরের বাইরে লম্বা লাইন। চিন্তিত বাবা-মায়ের কোলে অসুস্থ শিশু। কেউ অনবরত হাঁচি দিচ্ছে, কেউ কাশছে, কারও আবার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
অক্টোবর মাস থেকেই এই চিত্র শুরু হয়েছে। তখন থেকেই দিল্লির বাতাসের মান বিপজ্জনক মাত্রায় নামতে শুরু করে, আর চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতেও আগের চেয়ে বেশি সময় লাগছে।
শীত এলেই দিল্লি ও উত্তর ভারতে এই সমস্যা ফিরে আসে। এর পেছনে কোনো একটি কারণ নেই। বাতাসের গতি কমে যাওয়া, কলকারখানার ধোঁয়া, গাড়ির কালো ধোঁয়া, তাপমাত্রা কমে যাওয়া এবং পাশের রাজ্যগুলোতে ফসলের গোড়া পোড়ানো—সব মিলিয়ে এই অবস্থা।
গত মাস থেকে দিল্লির 'এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স' ৩০০ থেকে ৪০০-এর মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। বাতাসে 'পিএম ২.৫' বা ধূলিকণার পরিমাণ এত বেশি যা ফুসফুস জ্যাম করে দিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ মাত্রার চেয়ে এটি ২০ গুণ বেশি!
এই সূচক ৪০০-এর ওপরে গেলে সুস্থ মানুষেরও সমস্যা হয়। আর যারা আগে থেকেই অসুস্থ, তাদের অবস্থা হয় আরও খারাপ। তবে শিশু ও বয়স্কদের ওপর এর আঘাত সবচেয়ে বেশি।
দিল্লিজুড়ে হাসপাতালগুলোতে এখন অসুস্থ শিশুর ভিড়। সবার সমস্যা একটাই—বিষাক্ত বাতাস।
নয়ডা ক্লিনিকের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. শিশির ভাটনগর বলেন, 'এই ধূলিকণা শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। কারণ ওদের শরীর এখনো তৈরি হচ্ছে, কোষগুলো এখনো শিখছে কীভাবে রোগের সঙ্গে লড়তে হয়।'
তিনি আরও বলেন, 'আগে আমি ২০-৩০ শতাংশ এমন রোগী পেতাম। এখন দূষণের মৌসুমে সেটা বেড়ে ৫০-৭০ শতাংশ হয়ে গেছে।'
প্রতি বছর সরকার নানা জরুরি পদক্ষেপ নেয়। নির্মাণকাজ বন্ধ করা হয়, দূষণ ছড়ানো গাড়ি নিষিদ্ধ করা হয়। এবার তো কৃত্রিম বৃষ্টি নামানোর চেষ্টাও হয়েছিল, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।
দিল্লির ২ কোটি মানুষ এখন আতঙ্কে। বিশেষ করে ছোট শিশুদের বাবা-মায়েরা।
৩১ বছর বয়সী খুশবু ভারতী এখনো শিউরে ওঠেন ১৩ নভেম্বরের কথা মনে করে। সেদিন রাতে তার এক বছর বয়সী মেয়ে সামায়রাকে নিয়ে তাকে হাসপাতালে ছুটতে হয়েছিল।
খুশবু বলেন, 'আমার মনে আছে, ঘুমের মধ্যে ও খুব কাশছিল। কাশতে কাশতে বমি করে দিয়েছিল।'
ঘরোয়া টোটকা কাজ না করায় মাঝরাতে মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে ছোটেন তিনি।
'পথে সামায়রা কোনো কিছুতেই সাড়া দিচ্ছিল না। ও খুব চঞ্চল মেয়ে। অথচ সেদিন মাথাও তুলছিল না। ওটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ মুহূর্ত।'
হাসপাতালে শিশুটিকে কড়া স্টেরয়েড নেবুলাইজেশন দেওয়া হয়। দুই দিন অক্সিজেনে রাখতে হয়েছিল। পরে ধরা পড়ে তার নিউমোনিয়া হয়েছে।
এখন সামায়রা সুস্থ। কিন্তু খুশবু এখনো ভয়ে থাকেন। তিনি বলেন, 'এখন ও দুই-একবার কাশলেই আমি খুব ভয় পেয়ে যাই।'
গোপাল নামের আরেক বাবা গত সপ্তাহে তার দুই বছরের মেয়ে রেণুকে নিয়ে সরকারি হাসপাতালে গিয়েছিলেন। মেয়েটির বুকে কফ জমে গিয়েছিল। গোপালের ভয়, এই বিষাক্ত বাতাস তার মেয়ের শরীরের স্থায়ী ক্ষতি করে দিল কি না।
গোপাল বলেন, 'ডাক্তার বলেছেন ওকে কিছুদিন ইনহেলার নিতে হতে পারে।'
গবেষকরা বলছেন, বায়ুদূষণ শিশুদের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। এর ফলে তাদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং বুদ্ধিমত্তা কমে যেতে পারে।
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু দূষক বা পলিউট্যান্টের কারণে স্মৃতিভ্রম বা অ্যালঝেইমারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
এই ভয়ে খুশবুর মতো অনেক বাবা-মা দিল্লি ছাড়ার কথা ভাবছেন।
খুশবু বলেন, 'এমন শহরে থেকে লাভ কী যেখানে আমার মেয়েটা ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারে না? আমার স্বামীর ব্যবসা এখানে, তাই হুট করে চলে যাওয়া সম্ভব না। কিন্তু সুযোগ পেলেই আমরা চলে যাব।'
আপাতত দিল্লি সরকার শিশুদের বাঁচাতে স্কুল বন্ধ রেখেছে বা অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে। বাইরের খেলাধুলাও বন্ধ।
ধনী পরিবারের শিশুরা এতে কিছুটা সুরক্ষা পেলেও গরিব ও বস্তির শিশুদের অবস্থা করুণ। কেরালার পালমোনোলজিস্ট ডা. এ ফাতাহুদিন বলেন, 'রাস্তার পাশে বা বস্তিতে থাকা শিশুদের ফুসফুসের ওপর মারাত্মক চাপ পড়ছে।'
ছোট ও বদ্ধ ঘরে থাকায় রান্নার ধোঁয়া আর বাইরের দূষণ মিলে তাদের অবস্থা আরও খারাপ করে দিচ্ছে।
ডা. ফাতাহুদিন বলেন, 'এই শিশুরা সারাক্ষণ দূষণের মধ্যে থাকে। ফলে তাদের ফুসফুসের সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যায়। ছোটবেলায় এমন সংক্রমণ হলে ফুসফুসের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। এমনকি বড় হলে তাদের অবস্থা ধূমপায়ীদের মতো হতে পারে।'
তিনি পরামর্শ দেন, যাদের সামর্থ্য আছে তারা যেন শিশুদের ঘরে রাখেন, প্রচুর পানি খাওয়ান এবং বাইরে বের হলে এন৯৫ মাস্ক ব্যবহার করেন।
কিন্তু বাবা-মায়েদের প্রশ্ন, কতদিন শিশুদের এভাবে ঘরে আটকে রাখা সম্ভব?
সীমা নামের এক মা বলেন, 'ওরা বড় হচ্ছে, ওদের খেলার জায়গা দরকার। মাঝে মাঝে একটু প্রকৃতির কাছে যাওয়ার সুযোগ পেত, সেটাও এখন বন্ধ করতে হয়েছে।'
তিনি বলেন, 'ওরা মাঝে মাঝে জেদ করে। কিন্তু আমাদের কী করার আছে? আমরা জানি খেলাধুলা জরুরি, কিন্তু এই বিষাক্ত বাতাস শরীরে ঢোকার বিনিময়ে নয়।'
