পোশাক কারখানায় যেভাবে শ্রমিকরা হারছেন, জিতছে যন্ত্র
গাজীপুরে চলতি বছরের শুরুতে রোকসানা আক্তার যখন চাকরি হারান, তখন তিনি ভেবেছিলেন এটি সাময়িক। কাজের চাহিদা বাড়লে আবার ডাক পড়বে। কিন্তু তাকে আর ডাকা হয়নি। কারণ তার কারখানায় এমন একটি যন্ত্র বসানো হয়েছিল, যেটি একসঙ্গে ছয়জন শ্রমিকের কাজ করতে পারে।
রোকসানার কাহিনি বলে দেয়, কীভাবে আধুনিক যন্ত্র নীরবে বাংলাদেশের কারখানাগুলোকে—বিশেষ করে পোশাক ও বস্ত্রখাত এবং এর ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পগুলোকে—নতুনভাবে গড়ে তুলছে। স্বয়ংক্রিয় কাটিং, নিটিং ও সেলাই লাইন উৎপাদনশীলতা কয়েক গুণ বাড়াচ্ছে, কিন্তু একই সঙ্গে হাজার হাজার স্বল্প-দক্ষ শ্রমিকের চাকরি কেড়ে নিচ্ছে।
স্থানীয় গবেষণা সংস্থা র্যাপিডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশের উৎপাদন খাতে ১৪ লাখ কর্মসংস্থান হারিয়েছে, যদিও এ খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। এ সময় উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান ৯৫ লাখ থেকে কমে ৮১ লাখে নেমেছে—যা স্পষ্টভাবে 'কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি'র ইঙ্গিত দেয়।
এতে করে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে: গত এক দশকে পোশাক রপ্তানি ১২.৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও কর্মসংস্থান কেন কমেছে?
গভীরভাবে দেখলে এর উত্তরটি স্পষ্ট হয়: আরএমজি খাতের ওপর চরম নির্ভরতা এখানে অন্যতম কারণ। ২০২৫ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানির ৮৫ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক থেকে। বছরের পর বছর বাংলাদেশ বিকল্প রপ্তানি ইঞ্জিন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। এখন চীন ও ভিয়েতনামের মতো দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পোশাক ও বস্ত্রখাতে দ্রুত অটোমেশন বাড়ছে, এবং তারই প্রভাব পড়ছে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিদ্যমান শ্রমিকের চাকরি—দু'দিকেই।
"ম্যানেজার বলেছিলেন নতুন মেশিনটি ছয়জন হেলপারের কাজ করতে পারে। তারা শুধু মেশিন অপারেটরদের রেখেছে। আমার সেই দক্ষতা নেই, তাই আমার আর জায়গা হয়নি," বলেন রোকসানা। এখন তিনি নিজের এলাকায় খণ্ডকালীন দর্জির কাজ করছেন, যেখানে আয় আগের বেতনের অর্ধেকেরও কম।
রোকসানার গল্পটি এমন এক বাস্তবতা তুলে ধরে, যা বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারেনি—অর্থনীতি বাড়ছে, কারখানা আধুনিক হচ্ছে, কিন্তু চাকরি কমছে, বলেন বিশ্লেষকেরা।
যন্ত্রে গ্রাস হচ্ছে চাকরি
সোয়েটার শিল্পেই অটোমেশন সবচেয়ে দ্রুত এগোচ্ছে। দক্ষতা বাড়াতে, সময়মতো ডেলিভারি দিতে এবং শ্রমসংক্রান্ত ঝুঁকি এড়াতে টেক্সটাইল মিলাররাও মেশিন স্থাপনে পিছিয়ে নেই।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, একজন শ্রমিক দ্বারা চালিত একটি স্বয়ংক্রিয় সোয়েটার মেশিন দিনে প্রায় ৩০টি পণ্য তৈরি করতে পারে, যেখানে ম্যানুয়াল মেশিনে সর্বোচ্চ পাঁচটি সম্ভব। এই যন্ত্রায়ন— শ্রমিক সংকট, মজুরি বৃদ্ধি, কারখানায় অনুপস্থিতি এবং বেতন পরিশোধ ঘিরে অস্থিরতার ঝুঁকি কমাতেও সহায়তা করে।
বিজিএমইএর সহ-সভাপতি ও সফটেক্স সোয়েটারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজওয়ান সেলিম বলেন, স্বয়ংক্রিয় জ্যাকার্ড মেশিনে প্রাথমিক বিনিয়োগ ম্যানুয়াল মেশিনের তুলনায় অনেক বেশি হলেও— এটা চালাতে শ্রমিকের প্রয়োজন হয় কম। এতে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় দীর্ঘমেয়াদে এগুলো অনেক বেশি প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও দেয়।
তিনি বলেন, আগে একটি ম্যানুয়াল মেশিনে একজন অপারেটর লাগত। এখন একজন শ্রমিক ছয়টি স্বয়ংক্রিয় মেশিন চালাতে পারেন, ফলে উৎপাদনশীলতা চার থেকে পাঁচ গুণ বেড়ে যায়।
"অটোমেশনে বিনিয়োগে আমরা দীর্ঘমেয়াদে স্পষ্ট লাভ দেখছি," বলেন রেজওয়ান।
তিনি আরও বলেন, শ্রম আইনের সাম্প্রতিক সংশোধন (অধ্যাদেশ) ও উৎপাদকদের নতুন করে শ্রমিক নিয়োগে নিরুৎসাহিত করছে।
"মজুরি বেড়েছে, পাশাপাশি চাকরি থেকে ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রেও শ্রমিকদের সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। একইসঙ্গে আট সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, ঈদ বোনাসসহ নানা অতিরিক্ত দায় রয়েছে। কিন্তু মেশিনের ক্ষেত্রে এসব খরচ নেই," তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন।
শাশা ডেনিমসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ বলেন, অতীতে শ্রম সস্তা থাকায় অনেক উদ্যোক্তা আধুনিক যন্ত্রে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ধীরেসুস্থে এগোতেন। "কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। মজুরি অনেক বেড়েছে এবং ভবিষ্যতেও বাড়বে—এটা আমরা জানি। তাই নতুন বিনিয়োগে সবাই দীর্ঘমেয়াদি লাভের কথা ভেবে আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্র কিনছে।"
একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, শাশা ডেনিমসসহ কয়েকটি কারখানা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় পকেট-এটাচিং মেশিন কিনেছে, এই মেশিনগুলো বেশি উৎপাদনশীলতা ও মানসম্মত সেলাই নিশ্চিত করে।
"যে কাজ আগে পাঁচজন করত, এখন একজনই করতে পারে," তিনি বলেন। "এই বিনিয়োগ চার বছরের মধ্যেই উঠে আসবে।"
শামস আরও বলেন, পাঁচ বছর আগে একটি প্রোডাকশন লাইনে তাঁর ৮০–৯০ জন শ্রমিক লাগত। এখন একই পরিমাণ বা তার চেয়েও বেশি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন হয় ৪৫–৫০ জন।
ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বার বলেন, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা ও মান ধরে রাখতে অটোমেশন অপরিহার্য। তবে তিনি কর্মী ধরে রাখতে তারা শ্রমিকদের বহুমুখী দক্ষতা উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
"আগে একটি নিটিং মেশিন একজন চালাত, এখন একজনই তিনটি মেশিন চালাচ্ছে," তিনি বলেন। "পণ্য বৈচিত্র্যের জন্য আমাদের মাল্টি-স্কিলিং ও রি-স্কিলিং দরকার।"
নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে জব্বার বলেন, বাংলাদেশে বিপুল নতুন বিনিয়োগ দরকার, কিন্তু জ্বালানি সংকট, দুর্বল অবকাঠামো—বিশেষ করে অদক্ষ বন্দর ব্যবস্থাপনা—এবং জটিল ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ার কারণে তা হচ্ছে না।
তবে লিটল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিটিএমএর পরিচালক মো. খোরশেদ আলম বলেন, টেক্সটাইল মিলে চাকরি কমার মূল কারণ অটোমেশন নয়; বরং গ্যাস সংকট, আর্থিক ক্ষতি এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার অপব্যবহার।
"চাহিদা কমে যাওয়া ও বন্ডের অপব্যবহারের কারণে টেক্সটাইল মিলাররা সঠিক কস্টিং পাচ্ছেন না। এমনকি জুতার কারখানাও সুতা ও কাপড় আমদানি করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করছে," তিনি বলেন। গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় ৩০ শতাংশ মেশিন অলস পড়ে আছে বলেও জানান তিনি।
সংকীর্ণ উৎপাদনভিত্তিই দায়ী বলছেন অর্থনীতিবিদরা
সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং র্যাপিডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক—এই দুই অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশের নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে না পারার জন্য সংকীর্ণ উৎপাদনভিত্তিকে দায়ী করেছেন। তাঁদের মতে, প্রযুক্তি গ্রহণও এতে বড় ভূমিকা রেখেছে; র্যাপিডের গবেষণায় গত এক দশকে উৎপাদন খাতে ১৪ লাখ চাকরি হারানোর হিসাব উঠে এসেছে।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২০১৫–১৬ অর্থবছর থেকে প্রবৃদ্ধির কর্মসংস্থান স্থিতিস্থাপকতা কমছে, বিশেষ করে উৎপাদন খাতে, যেখানে উৎপাদন বৃদ্ধির বিপরীতে চাকরি সৃষ্টির হার তীব্রভাবে হ্রাস পেয়েছে।
"আমরা যদি অনুভূমিকভাবে সম্প্রসারণ করতে পারতাম, তাহলে আরও কারখানা হতো—আর আরও চাকরি হতো," তিনি বলেন।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, আধুনিক প্রযুক্তিতে একটি কারখানার শ্রমিক ৫০০ থেকে ৪০০ জনে নেমে এলেও, যদি কারখানার সংখ্যাও একইভাবে ১০টি থেকে বেড়ে ১২টি হতো, তাহলে চাকরির হার পুষিয়ে যেত। "আমাদের উৎপাদনভিত্তি অত্যন্ত সংকীর্ণ, আর আমরা পণ্য ও বাজার বৈচিত্র্য আনতে ব্যর্থ হয়েছি," তিনি বলেন। "চীন ও ভারত বাংলাদেশ থেকে পোশাক কিনবে না, কিন্তু তাদের আরও অনেক পণ্যের দরকার—যেগুলো আমরা উৎপাদনই করি না।"
র্যাপিডের চেয়ারম্যান রাজ্জাক বলেন, "উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বাড়াতে পোশাক খাতে প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারই কর্মী ছাঁটাইয়ের বড় কারণ, কারণ মোট উৎপাদনের ৩৪ শতাংশই আসে আরএমজি থেকে।"
তিনি যোগ করেন, আরএমজির বাইরের খাতগুলোতেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, যেখানে শ্রমিকরা ক্রমেই যন্ত্র দ্বারা প্রতিস্থাপিত হচ্ছেন।
এফডিআই গুরুত্বপূর্ণ
জেনিস শুজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির খান বলেন, বাংলাদেশের উৎপাদনভিত্তি বিস্তৃত করা এবং রপ্তানি বাড়াতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
"ভিয়েতনামের গত বছরের ৪০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির ৮০ শতাংশ এসেছে বিদেশি কোম্পানি থেকে, মাত্র ২০ শতাংশ স্থানীয় রপ্তানিকারকদের," তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, দক্ষ বন্দর সেবা ও সহযোগিতাপূর্ণ সরকারি সংস্থার মাধ্যমেই ভিয়েতনাম এটা অর্জন করেছে বলে তিনি জানান।
নাসির বলেন, নিয়ন্ত্রক ও লাইসেন্সিং জটিলতা কমানো, বন্দর ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং মূল্য সংযোজন উৎসাহিত করলে বাংলাদেশও একই ধরনের সুফল পেতে পারে। ফার্নিচার, হালকা প্রকৌশল, প্লাস্টিক ও ফুটওয়্যার খাতের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, "সংস্কার হলে কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশের রপ্তানি ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে।"
ম্যাক্রো পর্যায়ে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানও এই মতের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, অর্থবহ এফডিআই আকর্ষণে ব্যর্থতাই বাংলাদেশের সংকীর্ণ উৎপাদনভিত্তির মূল কারণ।
তিনি জানান, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০১৬–২০২০) এফডিআই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩১ বিলিয়ন ডলার, কিন্তু পাওয়া গেছে মাত্র ১১ বিলিয়ন—লক্ষ্যের এক-তৃতীয়াংশেরও কম।
উচ্চ শুল্কে সংকুচিত দেশীয় বাজার
আবদুর রাজ্জাক বলেন, দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে বাংলাদেশ উচ্চ শুল্ক বজায় রাখে, কিন্তু এতে স্থানীয় বাজারে অনেক পণ্যের দাম বেড়ে যায়। দাম বাড়ায় চাহিদা কমে এবং বাজার সংকুচিত হয়। গত তিন বছরে মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশে থাকার ফলে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে ক্ষয় হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
"কিন্তু ভিয়েতনাম ভিন্ন পথে হেঁটেছে—রপ্তানি বাড়াতে পণ্য বৈচিত্র্যের ওপর জোর দিয়েছে, যা বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে," তিনি বলেন। "অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনো মাত্র একটি পণ্য—তৈরি পোশাকের রপ্তানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল রয়ে গেছে।"
