যে ছবি হয়ে উঠল হংকংয়ের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের প্রতীক
নীল আকাশ আর ফুরফুরে বাতাস। এমন এক শরতের দুপুরেই নাতনিকে স্কুল থেকে আনতে বেরিয়েছিলেন ৭১ বছর বয়সী ওং।
হংকংয়ের তাই পো এলাকার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে স্বামী-স্ত্রী পালা করে নাতনিকে আনতে যান। ওই বুধবার ছিল ওংয়ের পালা। তিনি বেরোনোর কিছুক্ষণ পরেই ঘটে সেই সর্বনাশ। ওয়াং ফুক কোর্ট হাউজিং এস্টেটের একটি টাওয়ারে আগুন লাগে।
নাতনিকে রেখেই তিনি দ্রুত ফিরে আসেন। দেখেন, তাদের টাওয়ারের মাঝখানের তলাগুলো দাউদাউ করে জ্বলছে। আগুনের দিকে আঙুল তুলে চিৎকার করে ওঠেন ওং, "আমার স্ত্রী ভেতরে!"
ঘটনার এক সপ্তাহ পার হলেও ওংয়ের স্ত্রীর কোনো খোঁজ নেই। তিনি সেই ৩০ জন নিখোঁজ মানুষের তালিকায় আছেন। এই ঘটনায় অন্তত ১৫৬ জন মারা গেছেন। ১৯৪৮ সালের পর হংকংয়ে এত বড় অগ্নিকাণ্ড আর ঘটেনি।
আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে ওংয়ের সেই কান্না আর অসহায় দুহাত তোলার দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করেন রয়টার্সের আলোকচিত্রী টাইরোন সিউ। ছবিটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়। এটিই হয়ে ওঠে এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির প্রতীক।
সিউ বলেন, "আমি যখন পৌঁছাই, আগুন লাগার তখন এক ঘণ্টা হয়ে গেছে। রাস্তার পাশে ওং পাগলের মতো হাহাকার করছিলেন। এই একটি ছবিই সব কথা বলে দেয়। আপনি পৃথিবীর যে প্রান্তেরই হোন না কেন, মিস্টার ওংয়ের সেই অসহায়ত্ব আর যন্ত্রণা অনুভব করতে পারবেন।"
পুলিশ যখন ধ্বংসস্তূপ থেকে লাশ বের করছে, তখন রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলেন ওংয়ের ছেলে জে ওং। তিনি জানান, মায়ের কোনো খবর মেলেনি। মনের কষ্ট লাঘব করতেই তিনি পরিবারের এই গল্প বলছেন।
কর্তৃপক্ষ বলছে, সংস্কারকাজে নিম্নমানের প্লাস্টিক মেশ ও ইনসুলেশন ফোম ব্যবহারের কারণেই আগুন এত দ্রুত ছড়িয়েছে। সাতটি উঁচু ভবনে ৪,০০০ মানুষ বাস করত, যার সবই আগুনের গ্রাসে পড়ে।
ওংয়ের ছেলে বলেন, "বাবা আগুনের ভয়াবহতা দেখেই মনে মনে বুঝেছিলেন মা আর নেই।" আগুন লাগার পর তাদের মধ্যে মাত্র এক মিনিটের কথা হয়েছিল। এরপর সব শেষ।
ওং আগে রক্ষণাবেক্ষণের ফোরম্যান হিসেবে কাজ করতেন। তিনি ইলেকট্রিশিয়ান ও প্লাম্বার হিসেবেও দক্ষ। তিনি জানতেন এই সংস্কারকাজ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি নিজের জানালার ফোম সরিয়ে আগুনরোধী প্লাস্টিক লাগিয়েছিলেন। এমনকি বাইরের সবুজ মেশ বা জালে নিয়মিত পানিও ছিটাতেন যাতে আগুন না লাগে। কিন্তু শেষরক্ষা হলো না।
ছবিটি তোলার পর ওং শোকে পাথর হয়ে রাস্তায় বসে পড়েন। রাত নামলে এক পুলিশ অফিসার তাকে বসার জন্য একটি নীল প্লাস্টিকের টুল এনে দেন।
পুড়ে যাওয়া বাড়ির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে স্ত্রীকে তিনি বলছিলেন, "আমি তোমাকে খুঁজে বের করবই।"
ছবি: টাইরন সিউ/রয়টার্স
