যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি বিমানবাহী রণতরীতে অগ্নিকাণ্ড, ৩ নাবিক আহত
চলতি বছরে দ্বিতীয়বারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত বিশাল বিমানবাহী রণতরীতে (সুপারক্যারিয়ার) অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটল। মঙ্গলবার 'ইউএসএস ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার' (সিভিএন-৬৯) নামের ওই যুদ্ধজাহাজে আগুন লাগে। এতে তিন নাবিক আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
মার্কিন নৌবাহিনী নিশ্চিত করেছে যে, আহত নাবিকদের জাহাজে রেখেই তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তারা এরই মধ্যে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে নিজেদের কাজেও ফিরেছেন।
জাহাজের ঠিক কোথায় আগুন লেগেছিল, তা নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়নি। তবে ঘটনাটি ঘটেছে ভার্জিনিয়ার নরফোক নেভাল স্টেশনে। রণতরীটি তখন তার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল। সাধারণত কোনো যুদ্ধজাহাজকে মেরামত বা আধুনিকায়নের জন্য কিছুদিনের জন্য সাগরের অভিযান থেকে বিরত রেখে ডকইয়ার্ডে রাখা হয়।
সর্বশেষ অভিযান শেষে ঠিক এ কারণেই গত ১৬ মাস ধরে মার্কিন নৌবাহিনীর ওই ডকইয়ার্ডে পড়ে আছে 'ইউএসএস ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার'।
মার্কিন নৌবাহিনীর মুখপত্র ইউএসএনআই নিউজকে দেওয়া এক বিবৃতিতে নৌবাহিনী জানায়, '১৪ এপ্রিল ইউএসএস ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ারে ছোট একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তবে জাহাজের নিজস্ব কর্মী এবং নরফোক নেভি শিপইয়ার্ডের কর্মীরা তাদের প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়ে দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। জাহাজের চিকিৎসকদের মাধ্যমে তিন নাবিককে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এবং তারা সুস্থ হয়ে কাজে যোগ দিয়েছেন।'
উল্লেখ্য, মাত্র এক মাস আগেই মার্কিন নৌবাহিনীর আরেকটি রণতরী 'ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড'-এ (সিভিএন-৭৮) বেশ বড়সড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। সেই আগুন নেভাতে সময় লেগেছিল প্রায় ৩০ ঘণ্টা এবং এর কারণে রণতরীটির স্বাভাবিক কার্যক্রম দুই দিনের জন্য স্থবির হয়ে পড়েছিল। ক্রোয়েশিয়ার স্প্লিট শহরে মেরামত শেষে চলতি সপ্তাহেই এটি আবার পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তার অভিযানে ফিরেছে।
রক্ষণাবেক্ষণের সময় বিপত্তি
'ইউএসএস ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার' হলো মার্কিন নৌবাহিনীর দ্বিতীয় নিমিৎজ-শ্রেণির বিমানবাহী রণতরী। ২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি এটি ভার্জিনিয়ার এই শিপইয়ার্ডে আসে। সে সময় নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, 'ভবিষ্যতের অভিযানগুলোর কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবে রণতরীটিকে এই রক্ষণাবেক্ষণ ধাপের মধ্য দিয়ে নেওয়া হচ্ছে।'
এই রণতরীটির সর্বশেষ অভিযান শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালের অক্টোবরে এবং তা শেষ হয় ২০২৪ সালের জুলাই মাসে।
ওই সময় এটি ইউএস ফিফথ ফ্লিট বা মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের আওতাভুক্ত অঞ্চলে টানা অভিযান পরিচালনা করে। নৌবাহিনীর তথ্যমতে, ২০২৫ সালের এই রক্ষণাবেক্ষণ কাজের মধ্যে রণতরীটির ইঞ্জিন বা চালিকাশক্তি, নাবিকদের থাকার ব্যবস্থা, যুদ্ধ সরঞ্জাম এবং বিমান সহায়তা সক্ষমতার ওপর 'ব্যাপক কাজ' করা হচ্ছে।
তবে এই অগ্নিকাণ্ডের কারণে রণতরীটির রক্ষণাবেক্ষণ কাজের সময়সীমা পেছাবে কি না, তা এখনও পরিষ্কার নয়। নৌবাহিনীও জানায়নি যে, কবে নাগাদ এটিকে আবারও সাগরের অভিযানে পাঠানো হবে।
আইজেনহাওয়ার সম্পর্কে যা জানা যায়
নাবিকদের কাছে আদর করে 'আইক' নামে ডাকা 'ইউএসএস ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার' হলো মার্কিন নৌবাহিনীর সেবায় থাকা ১০টি নিমিৎজ-শ্রেণির সুপারক্যারিয়ারের মধ্যে দ্বিতীয়। যুক্তরাষ্ট্রের ৩৪তম প্রেসিডেন্ট এবং সেনাবাহিনীর সাবেক জেনারেলের নামে নামকরণ করা এই যুদ্ধজাহাজটি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে মার্কিন নৌবাহিনীতে দাপটের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।
১৯৭০ সালে মার্কিন কংগ্রেস এই রণতরী নির্মাণের অনুমোদন দেয়। সাত বছর পর এটি আনুষ্ঠানিকভাবে নৌবাহিনীর বহরে যুক্ত হয়। এরপর প্রায় এক বছরের প্রশিক্ষণ শেষে 'আইক' প্রথমবারের মতো ভূমধ্যসাগরে অভিযানে যায়। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে এটিকে ঢেলে সাজানো হয়। নতুন প্রযুক্তিতে সজ্জিত করে ১৯৮৭ সালে এটিকে আবার সাগরে ফেরানো হয়।
দীর্ঘ এই সেবাকালে 'ইউএসএস ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার' মধ্যপ্রাচ্যে অনেকগুলো বড় সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছে। এর শুরুটা হয়েছিল ১৯৮০ সালে ইরানে মার্কিন জিম্মি উদ্ধারের আলোচিত 'অপারেশন ঈগল ক্ল'-এর মাধ্যমে।
এরপর ১৯৯০ সালে ইরাক কুয়েত আক্রমণ করার পর 'অপারেশন ডেজার্ট শিল্ড' এবং 'অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম'-এ এই রণতরীর অংশগ্রহণ ছিল এর ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সে সময় সুয়েজ খাল পার হওয়া দ্বিতীয় পারমাণবিক শক্তিচালিত রণতরী হিসেবে ইতিহাস গড়েছিল এটি।
২০২৩-২০২৪ সালের অভিযানের সময় নৌবাহিনীর দ্বিতীয় পুরোনো এই রণতরীটি লোহিত সাগরে প্রহরার দায়িত্বে ছিল। গাজা যুদ্ধের জেরে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর আক্রমণ শুরু করলে, এই রণতরীটিই সেই জাহাজগুলোর সুরক্ষায় ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমানে চলমান মার্কিন সামরিক অভিযান 'অপারেশন এপিক ফিউরি' যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে ধারণা করা হচ্ছে, 'ইউএসএস ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার'কে আবারও মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হতে পারে। এর প্রমাণ হিসেবে, নরফোক-ভিত্তিক আরেকটি রণতরী 'ইউএসএস জর্জ এইচ.ডব্লিউ. বুশ' (সিভিএন-৭৭) এরই মধ্যে ওই অঞ্চলের দিকে রওনা হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের বিরুদ্ধে এই সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া 'ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড' ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সাগরে অবস্থান করার নতুন রেকর্ড গড়েছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এটি টানা ২৯৬ দিন ধরে সাগরে রয়েছে। এর মাধ্যমে এটি ২০১৯-২০২০ সালের অভিযানে 'ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন' (সিভিএন-৭২) এর গড়া ২৯৪ দিনের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
