মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরী পাঠাল যুক্তরাষ্ট্র; ইরানে সরকার পরিবর্তন ‘সবচেয়ে ভালো’ খবর হতে পারে: ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার ইরানে সম্ভাব্য শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, শীঘ্রই মধ্যপ্রাচ্যে 'বিশাল শক্তি' উপস্থিত হবে। একই সময়ে পেন্টাগন ওই অঞ্চলে আরেকটি বিমানবাহী রণতরী পাঠিয়েছে।
ট্রাম্পের এই সামরিক পদক্ষেপ এবং কঠোর হুঁশিয়ারি এমন সময় এল যখন ওয়াশিংটন ও তেহরান পশ্চিমাদের সাথে ইরানের দীর্ঘদিনের পরমাণু বিরোধ নিয়ে কূটনীতি পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে।
এই বিষয়ে অবগত একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার মঙ্গলবার জেনেভায় ইরানের সাথে আলোচনা করবেন, যেখানে ওমানের প্রতিনিধিরা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করবেন।
সূত্রটি আরও জানিয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে মার্কিন প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে উইটকফ এবং কুশনার মঙ্গলবার জেনেভায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের সাথেও সাক্ষাৎ করবেন।
ওয়াশিংটন চায়, ইরানের সঙ্গে পরমাণু আলোচনার মধ্যে দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি তাদের সমর্থন এবং ইরানি জনগণের সাথে আচরণের (মানবাধিকার) বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকুক।
অন্যদিকে, ইরান জানিয়েছে, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিনিময়ে তারা তাদের পরমাণু কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত। তবে তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে এই আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করা হবে না।
ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, যদি কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব না হয় তবে ইরানে সামরিক হামলা চালানো হবে। এর জবাবে তেহরানও পাল্টা প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছে, তাতে একটি বড় ধরণের যুদ্ধের আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল।
পরমাণু স্থাপনাগুলোতে আর কোন লক্ষ্যবস্তু বাকি আছে কি না জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, সেখানে এখন কেবল 'ধুলো' পড়ে আছে। তিনি আরও বলেন, 'আমরা যদি হামলা চালাই, তবে সেটি হবে অভিযানের সবচেয়ে ক্ষুদ্র অংশ; কিন্তু সম্ভবত সেখানে যা কিছু অবশিষ্ট আছে আমরা তা-ও দখল করে নেব।'
দীর্ঘমেয়াদি সামরিক মোতায়েন
মার্কিন কর্মকর্তারা সামরিক সম্পদ স্থানান্তরের জটিল প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করেছেন।
বিমানবাহী রণতরী 'জেরাল্ড আর. ফোর্ড' এখন 'আব্রাহাম লিঙ্কন' রণতরীর সাথে যোগ দেবে। এছাড়া গত কয়েক সপ্তাহে বেশ কিছু গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার (ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী জাহাজ), যুদ্ধবিমান এবং নজরদারি বিমানও মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এবং বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী 'জেরাল্ড আর. ফোর্ড' তার সহযোগী যুদ্ধজাহাজগুলো নিয়ে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে অবস্থান করছিল এবং চলতি বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলায় বিভিন্ন অভিযানে অংশ নিয়েছে।
শুক্রবার কেন দ্বিতীয় একটি বিমানবাহী রণতরী মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, 'যদি আমাদের কোনো চুক্তি না হয়, তবে আমাদের এটার প্রয়োজন পড়বে... যদি প্রয়োজন হয়, তবে এটি আমাদের হাতের কাছেই প্রস্তুত থাকবে।'
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রণতরীটি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগবে।
যুক্তরাষ্ট্র সবশেষ গত বছর এই অঞ্চলে দুটি বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করেছিল, যখন তারা জুন মাসে ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছিল।
মার্কিন সামরিক বাহিনীতে মাত্র ১১টি বিমানবাহী রণতরী রয়েছে, যার ফলে এগুলো একটি সীমিত সম্পদ এবং এদের সময়সূচী সাধারণত অনেক আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে।
একটি বিবৃতিতে মার্কিন সাউদার্ন কমান্ড (যা লাতিন আমেরিকায় মার্কিন সামরিক কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করে) জানিয়েছে, তারা পশ্চিম গোলার্ধে 'অবৈধ কর্মকাণ্ড এবং অশুভ শক্তি' মোকাবিলায় তাদের মনোযোগ অব্যাহত রাখবে।
ফোর্ড রণতরীটি মূলত ২০২৫ সালের জুন মাস থেকে সমুদ্রেই অবস্থান করছে। এটি ইউরোপে যাওয়ার কথা থাকলেও নভেম্বরে আকস্মিকভাবে একে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
সাধারণত বিমানবাহী রণতরীর মোতায়েনকাল প্রায় নয় মাস স্থায়ী হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা বেড়ে গেলে এই সময়সীমা বাড়ানো অস্বাভাবিক নয়।
তবে নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা দীর্ঘকাল ধরে সতর্ক করে আসছেন, সমুদ্রে দীর্ঘ সময় মোতায়েন থাকা জাহাজের নাবিকদের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান করলে জাহাজে কর্মরত সদস্যদের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে একটি পৃথক বিমানবাহী রণতরী বুশ পাঠানোর কথা বিবেচনা করেছিল। তবে সেই রণতরী সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং এটি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে এক মাসেরও বেশি সময় লাগবে, তাই তা অবিলম্বে পাঠানো সম্ভব ছিল না।
জেরাল্ড আর. ফোর্ড জাহাজে একটি পারমাণবিক রিয়্যাক্টর রয়েছে এবং এটি ৭৫টির বেশি সামরিক বিমান বহন করতে সক্ষম। এর মধ্যে রয়েছে এফ-১৮ সুপার হর্নেট-এর মতো যুদ্ধবিমান এবং ই-২ হকআই, যা একটি আগাম সতর্কবার্তা প্রদানকারী ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে।
ফোর্ড রণতরীতে অত্যন্ত পরিশীলিত রাডার ব্যবস্থা রয়েছে, যা বিমান চলাচলের নিয়ন্ত্রণ এবং দিকনির্ণয়ে সহায়তা করতে পারে।
এর সহায়ক জাহাজগুলোর মধ্যে রয়েছে টিকোন্ডেরোগা-ক্লাস গাইডেড মিসাইল ক্রুজার 'নরম্যান্ডি' এবং আর্লে বার্ক-ক্লাস গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার 'টমাস হাডনার', 'রামেজ', 'কার্নি' ও 'রুজভেল্ট'।
এই জাহাজগুলোর সারফেস-টু-এয়ার, সারফেস-টু-সারফেস এবং অ্যান্টি-সাবমেরিন যুদ্ধক্ষমতা রয়েছে।
