‘পরবর্তী ইরান’?: ইসরায়েলের সাথে উত্তেজনার মধ্যেই বিশাল রণতরী বানাচ্ছে তুরস্ক
পুরো বিশ্ব যখন হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখনই তুরস্কের শিপইয়ার্ডগুলো দেশের প্রথম নিজস্ব প্রযুক্তির বিমানবাহী রণতরী 'মুজেম' তৈরিতে দিনরাত এক করে ফেলছে।
গত সপ্তাহে তুরস্কের নৌবাহিনী কমান্ডার অ্যাডমিরাল এরকুমেন্ট তাতলিওগ্লুর এক ঘোষণা রীতিমতো হইচই ফেলে দিয়েছে। তিনি জানান, আগামী বছরের শেষ দিকেই এই রণতরীর কাজ শেষ হবে। অর্থাৎ, নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক বছর আগেই রণতরীর মূল কাঠামো প্রস্তুত হয়ে যাচ্ছে!
৬০ হাজার টন ওজন আর ২৮৫ মিটার লম্বা এই দানবীয় জাহাজটি হতে যাচ্ছে তুরস্কের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ। শুধু তাই নয়, এটি ভূমধ্যসাগরের বর্তমান অধিপতি ফরাসি রণতরী 'চার্লস ডি গল'-কেও ছাপিয়ে যাবে। এতে শর্ট টেক-অফ সুবিধাসহ একসঙ্গে ৬০টি যুদ্ধবিমান বহনের জায়গা থাকছে।
গত আগস্টে খোদ প্রেসিডেন্ট এরদোগান এর নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেছিলেন। এত অল্প সময়ে এই প্রকল্পের এমন উল্কাগতির অগ্রগতি দেখে বিশ্লেষকরা বলছেন—নিজস্ব শক্তি ও প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে তুরস্ক কতটা মনযোগী, এটি তারই বড় প্রমাণ।
সম্প্রতি ইসরায়েলের সঙ্গে তুরস্কের উত্তেজনা একেবারে চরমে পৌঁছেছে। ইসরায়েলের সরকারি ও বিরোধী দলের নেতারা তুরস্ককে প্রকাশ্যেই 'পরবর্তী ইরান' বলে কটাক্ষ করছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনের এক সম্মেলনে ইসরায়েলের বিরোধী নেতা নাফতালি বেনেট তো সরাসরি বলেই বসেছেন, 'তুরস্ক হলো পরবর্তী ইরান।'
পূর্ব ভূমধ্যসাগরে কোণঠাসা হওয়ার শঙ্কা
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের দুই দফা যুদ্ধের পর তুরস্ক একটু নড়েচড়েই বসেছে। তারা নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোন এবং পঞ্চম প্রজন্মের 'কান' ফাইটার জেটের উৎপাদন বাড়িয়ে দিয়েছে।
তুরস্কের নৌ-শক্তি বিশেষজ্ঞ মেসুন ইয়াসারের মতে, মূলত গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে ইসরায়েলের গড়ে ওঠা জোটের কারণেই তুরস্ককে নিজের নৌ-সক্ষমতা বাড়াতে হচ্ছে। রণতরী মূলত গভীর সমুদ্রের জন্য তৈরি হলেও ইয়াসারের ধারণা, মুজেমকে দিয়ে আঙ্কারা ভূমধ্যসাগরে নিজেদের শত্রুদের ভয়ের মধ্যে রাখতে চায়।
তিনি বলেন, 'সাইপ্রাস ও ইসরায়েলের মধ্যকার এই উষ্ণ সম্পর্ক তাদের আরও বেশি আক্রমণাত্মক করে তুলছে। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্ক কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। তাই এই রণতরী তৈরি এখন আর শুধুই সক্ষমতা নয়, বরং তুরস্কের কৌশলগত বাধ্যবাধকতাও বটে।'
তুরস্কের এই রণতরী তৈরির স্বপ্ন শুরু হয়েছিল নব্বইয়ের দশকেই। পরে ২০১৭ সালের এক গবেষণার পর এই পরিকল্পনা চূড়ান্ত রূপ নেয়। শুরুতে আমেরিকার 'এফ-৩৫' যুদ্ধবিমান যুক্ত করার কথা থাকলেও, ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে এই কর্মসূচি থেকে বের করে দেয়।
ফলে বাধ্য হয়েই তারা নিজেদের প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। এখন এই জাহাজে মনুষ্যহীন যুদ্ধবিমান 'কিজিলেলমা', পঞ্চম প্রজন্মের 'কান' ফাইটার জেট এবং এআই চালিত ছোট উড্ডয়ন ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রোন 'বায়রাক্তার টিবি-৩' ব্যবহারের পরিকল্পনা চলছে।
ন্যাটোতে প্রভাব ও দরকষাকষির জোর
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক কার্নেগির ফেলো এবং সাবেক তুর্কি রাষ্ট্রদূত আলপের কসকুন মনে করেন, মুজেম প্রমাণ করে যে ইউরোপীয় নিরাপত্তার দিক দিয়ে তুরস্কের অবস্থা বেশ মজবুত। আমেরিকার বর্তমান ন্যাটো-বিরোধী মনোভাবের মাঝে এমন একটি রণতরী ন্যাটোর ভেতরে তুরস্কের প্রভাব এবং দরকষাকষির জোর বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
তবে কসকুন এও মনে করেন, এই রণতরী অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে নতুন শঙ্কা ও উত্তেজনা ছড়াতে পারে। যেমনটি ২০২০ সালে গ্রিস-ফ্রান্স জোট গঠনের সময় দেখা গিয়েছিল। তার মতে, ইসরায়েলসহ অন্য দেশগুলোর এই হুমকি আঙ্কারাকে খুব সতর্কতার সাথে সামলাতে হবে।
অবশ্য বিশ্লেষকরা এ-ও মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, বিশাল রণতরীগুলো এখন ছোট ড্রোন বা মিসাইলের মুখে বেশ নাজুক। উদাহরণস্বরূপ, সবশেষ যুদ্ধের সময় মার্কিন বিমানবাহী রণতরীগুলোকে ইরানের মিসাইলের পাল্লার বাইরে নিরাপদে রাখতে হয়েছিল। এই দুর্বলতা ঢাকতে তুরস্ক নিজেদের জাহাজে অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বসানোর ঘোষণা দিয়েছে। রণতরীটি ২০৩০ সালের মধ্যেই পুরোপুরি চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সোমালিয়া-সুদানে স্বার্থ রক্ষা
বিশ্লেষকরা বলছেন, লিবিয়া, সোমালিয়া এবং সুদানের মতো অঞ্চলে তুরস্কের প্রভাব এবং বিপুল বিনিয়োগ রক্ষায় মুজেম হবে তাদের মূল অস্ত্র। সোমালিয়ায় তেল-গ্যাস উত্তোলনের পাশাপাশি সেখানে মহাকাশ কেন্দ্র বানানোর পরিকল্পনাও করেছে আঙ্কারা। এমন পরিস্থিতিতে এই বিশাল যুদ্ধজাহাজ তাদের বিনিয়োগ রক্ষা করার জন্য খুবই দরকারি হবে।
তবে তুরস্কের প্রধান বিরোধী দলের (সিএইচপি) উপপ্রধান ও নৌবাহিনীর সাবেক অ্যাডমিরাল ইয়াংকি বাগচিওগ্লু মনে করেন, দেশের এমন অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে এই বিশাল প্রকল্পে হাত দেওয়াটা বোকামি হয়েছে। তিনি জানান, তুরস্কের উত্তর সাইপ্রাসে থাকা একটি বিমানঘাঁটি ভূমধ্যসাগরে এরই মধ্যে এক 'অডুবন্ত বিমানবাহী রণতরী' হিসেবে কাজ করছে।
তার মতে, তুরস্কের বরং আধুনিক যুদ্ধবিমান, শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা এবং ছোট কিন্তু আধুনিক যুদ্ধজাহাজ বানানোর দিকেই এখন বেশি জোর দেওয়া উচিত। রণতরীর নিরাপত্তার জন্য সাবমেরিন বা উদ্ধারকারী বিমানের মতো যে আনুষঙ্গিক সাহায্যকারী জাহাজের বহর লাগে, তুরস্কের কাছে তা এখন নেই বলেও জানান তিনি।
তবে নৌ-বিশেষজ্ঞ ইয়াসার মনে করেন ভিন্ন কথা। তিনি জানান, আঙ্কারা ধীরে ধীরে এই আনুষঙ্গিক সাহায্যকারী যুদ্ধ সরঞ্জামগুলোর ব্যবস্থা ঠিকই করে ফেলবে। ইয়াসার বলেন, 'এই বিমানবাহী রণতরী প্রতিবেশীদের মনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। দীর্ঘমেয়াদে সমুদ্রের বুকে তুরস্কের শক্তি এটা বহুগুণ বাড়িয়ে তুলবে।'
