সাম্বা আর ফুটবল যেভাবে ব্রাজিলের ঐতিহ্য!
কখনো কি ভেবেছেন ব্রাজিলের জাতীয় দলকে কেন 'দ্য সাম্বা বয়েজ' বলে ডাকা হয়? কেনই বা তারা নেচে নেচে গোল উদযাপন করতে পছন্দ করে? কেনই বা ব্রাজিলের ফুটবল খেলার ধরনকে সাম্বা নাচের সাথে তুলনা করা হয়?
সেলেসাওদের খেলার ধরন দীর্ঘদিন ধরেই 'সাম্বা ফুটবল' নামে পরিচিত। পঞ্চাশ বছর আগের বিশ্বকাপ ম্যাচ যদি দেখা হয়, তখনো ব্রাজিলের ম্যাচে সাম্বা ফুটবল শব্দটা শোনা যাবে নিয়মিত। পেলে থেকে শুরু করে রোনালদিনহো কিংবা নেইমার, সবাই সাম্বা ফুটবলকে রপ্ত করেছে, প্রদর্শন করেছে বিশ্বমঞ্চে। খবর গোলডটকমের।
কিন্তু 'সাম্বা ফুটবল' ঠিক কী জিনিস? কীভাবেই বা এর শুরু হলো?
সাম্বা ফুটবল
সাম্বা ফুটবল এমন এক ধরনের ফুটবল যেটি ব্রাজিলীয় সংস্কৃতি দ্বারা প্রচণ্ডভাবে প্রভাবিত। সাম্বা ফুটবলকে 'জিঞ্জা' নামেও অভিহিত করা হয়, যার অর্থ অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ছন্দবদ্ধভাবে দুলতে থাকা। ব্রাজিলের ফুটবল খেলার ধরনের সাথে এই 'ছন্দবদ্ধভাবে দুলতে থাকা' খাপে খাপে মিলে যায়।
জিঞ্জা কৌশলে খেলার অর্থ তার মধ্যে প্রদর্শন করার অ=মনোভাব থাকতে হবে, উদ্ধত ভাব থাকতে হবে, একই সাথে থাকতে হবে স্টাইল। ব্রাজিলীয় খেলোয়াড়েরা তাদের চমৎকার সব ফুটবলীয় দক্ষতা প্রদর্শন করার জন্য বিখ্যাত, আর এটাই তাদের সাম্বা চরিত্রের সাথে মিলে যায়।
সাম্বা ফুটবলের বৈশিষ্ট্যকে দুটো মূল উপাদানে ভাগ করা যায়। প্রথমটি, কাপোয়েইরা নামে এক ধরনের মার্শাল আর্ট, অ্যাঙ্গোলা থেকে উৎপত্তি হওয়া এই প্রাচীন মারামারির কৌশলের মধ্যে রয়েছে লাথি, মাথা দিয়ে গুতো দেওয়া, প্রতিপক্ষকে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানিয়ে পালিয়ে যাওয়ার মতো বিষয়। দ্বিতীয়টি হলো সাম্বা নাচ, এমন এক নাচ যেখানে পা সোজা রেখে কিন্তু হাঁটু হালকা বাঁকিয়ে নাচা হয়।
যে পদ্ধতিতে ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়েরা ড্রিবল করে, সামনের দিকে হালকা ঝুঁকে, বলের সাথে সামান্য স্পর্শ করে, তার সাথে সাম্বা নাচ মিলে যায়। একইরকমভাবে, যখন প্রতিপক্ষ সামনে এগিয়ে আসে তখন হঠাৎ গতি পরিবর্তন করে কিংবা শরীর বাঁকিয়ে প্রতিপক্ষকে বোকা বানিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাথে কাপোয়েইরার মিল পাওয়া যায়।
ফুটবলে সাম্বা নাচ
ব্রাজিলীয় খেলোয়াড়েরা গোলের পর প্রায়ই তাদের উদযাপন হিসেবে নাচকে বেছে নেয়, সেটি হতে পারে একা, অথবা দলগতভাবেও। তবে যেটিই হোক না কেন, ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের এই আনন্দ উপভোগ করার বিষয় ছড়িয়ে যায় সবার মধ্যে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কাতার বিশ্বকাপের রাউন্ড অফ সিক্সটিনে দক্ষিণ কোরিয়াকে ৪-১ গোলে হারানোর ম্যাচে প্রত্যেকটি গোল নেচে উদযাপন করে ব্রাজিলীয়রা, যার একটিতে ব্রাজিল কোচ তিতেও অংশগ্রহণ করেন।
যদিও, এই নাচের উদযাপন সবাই একভাবে নেয় না। যেমন: ব্রাজিলের এই উদযাপনের পর সাবেক ম্যানচেস্টার ইউনাইতেড অধিনায়ক রয় কিন মনে করেছিলেন এটা প্রতিপক্ষের জন্য অপমানজনক। "এটা ইতোমধ্যেই ৪-০, আর তারা প্রতিবার নেচে উদযাপন করছে। প্রথমবার করা হলে আমি কিছু মনে করতাম না, কিন্তু তারা একের পর এক করেই যাচ্ছে। আর তারপর ম্যানেজার নিজেই উদযাপন শুরু করলেন। আমি এতা দেখে খুশি না, আর আমি মনে করি না এটা ভালো কিছু।"
নেচে উদযাপন করার সংস্কৃতি অবশ্য ব্রাজিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৯০ ইতালি বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের স্ট্রাইকার রজার মিলা কর্নার পতাকার সামনে গিয়ে নেচে উদযাপন করেন। চার বছর পর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপেও একই জিনিস দকেহা যায়। ২০০২ সালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে গোল করে সেনেগালের পাপা বুবা দিওপও অন্যান্য খেলোয়াড়দের সাথে একসাথে নেচে উদযাপন করেন।
কারো কারো কাছে এটা অসম্মানজনক মনে হলেও, নাচ স্বভাবগতভাবেই ফুটবলের সাথে সংযুক্ত, বিশেষ করে ব্রাজিলের ক্ষেত্রে। এই সাম্বা নাচ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে চলে যাবে,যেমনটা চলে আসছে ১৯৩০-এর দশক থেকেই।
