যুক্তরাজ্যে বাঘের বেষ্টনীতে তরুণের মৃত্যুর পর সেই বাঘের সঙ্গে কুস্তির এআই ভিডিও প্রকাশ, সমালোচনার মুখে ট্রাম্প
ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের একটি বন্য প্রাণী পার্কে বাঘের আক্রমণে এক তরুণের মৃত্যুর ভিডিও প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি নিজের আরেকটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এতে তাকে একটি বাঘকে তাড়া করতে, সেটির সঙ্গে খেলতে এবং শেষে বাঘটিকে জড়িয়ে ধরতে দেখা যায়।
ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে প্রকাশিত ভিডিওটির শেষে 'দ্য লায়ন স্লিপস টুনাইট' গানটি বাজতে থাকে।
অন্য একটি ভিডিওতে ট্রাম্পকে হায়েনাদের সঙ্গে লড়াইরত একটি সিংহের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এ সময় পর্দায় যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতাদের ভিডিওচিত্রও দেখানো হয়।
গভীর রাতে ধারাবাহিকভাবে বেশ কয়েকটি পোস্ট প্রকাশ করেন ট্রাম্প। এসব পোস্টের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি আরও কিছু ভিডিও ছিল। সেগুলোতে তাঁকে ঈশ্বরের দ্বারা নিযুক্ত একজন তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এর আগে শনিবার ইংল্যান্ডের ডনকাস্টারের কাছে ইয়র্কশায়ার ওয়াইল্ডলাইফ পার্কে একটি বাঘের খাঁচায় প্রবেশের পর ২৩ বছর বয়সী উইলিয়াম চ্যাপম্যান বাঘের আক্রমণে নিহত হন।
পরিবারের সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় তাদের 'তীব্র মানসিক যন্ত্রণা'র কথা জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ভিডিওটি পুনরায় প্রকাশ করার পর তারা এ প্রতিক্রিয়া জানান।
পরিবার উইলিয়ামকে 'প্রাণবন্ত, উষ্ণ ও মিশুক' স্বভাবের একজন তরুণ হিসেবে বর্ণনা করেছে। একই সঙ্গে জানিয়েছে, তিনি গুরুতর মানসিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি অত্যন্ত আপত্তিকর। এটি তাদের তীব্র মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যারা ওই ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে দিয়েছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ অনুসারীর কাছে বাঘের আক্রমণের একটি ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি।
ভিডিওতে দেখা যায়, খাচার ভেতরে বসে থাকা চ্যাপম্যানকে বাঘটি কামড়াচ্ছে এবং নখ দিয়ে আঁচড়াচ্ছে। একপর্যায়ে তিনি বাঘটির দিকে আঙুল নাড়ান।
ভিডিওটির সঙ্গে ট্রাম্প লিখেছেন, 'প্রকৃতির সঙ্গে কখনো বাড়াবাড়ি করবেন না! প্রেসিডেন্ট ডি জে টি।' তবে ভিডিওতে চ্যাপম্যানের মৃত্যুর দৃশ্য দেখানো হয়নি।
পরে ট্রাম্প কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি নিজের আরেকটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে তাকে হাসিখুশি অবস্থায় বাঘটির সঙ্গে তাড়া করার খেলা ও মজা করে লড়াই করতে দেখা যায়।
ভিডিওতে ট্রাম্পকে চ্যাপম্যানের মতো করে আঙুল নির্দেশ করতে দেখা যায়। শেষ দৃশ্যে তিনি বাঘটিকে জড়িয়ে ধরেন।
বন্য প্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা বর্ন ফ্রি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী সভাপতি উইল ট্রাভার্স বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি ভিডিওটি শুধু অত্যন্ত সংবেদনহীনই নয়, একই সঙ্গে বেপরোয়া আচরণেরও পরিচয়।
তিনি বলেন, 'এ ধরনের ভিডিও মানুষ এবং বন্দি বন্য প্রাণীর জীবনকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। এ ধরনের ছবি ও ভিডিও মানুষকে বন্দি বন্য প্রাণীর সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করতে পারে। অথচ এমন সংস্পর্শ বাস্তবসম্মত নয় এবং এতে বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।'
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রকাশিত এক বিবৃতিতে চ্যাপম্যানের পরিবারের সদস্যরা বলেন, 'উইলিয়ামকে হারিয়ে আমাদের পরিবার সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত। কী ঘটেছে, তা মেনে নিতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। এমন অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়ে আপত্তিকর ভিডিও ও অন্যান্য বিষয় প্রকাশ এবং ছড়িয়ে দেওয়ার কারণে আমরা তীব্র মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমরা সবাইকে এসব করা বন্ধ করার অনুরোধ জানাচ্ছি।
তারা আরও বলেন, 'আমাদের অসাধারণ ছেলেটি কেন এমন কাজ করেছিল, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা খুঁজে বের করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে বলে আমরা আশাবাদী।'
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, 'উইলিয়াম ছিলেন প্রাণবন্ত, উষ্ণ ও মিশুক স্বভাবের একজন তরুণ। তার পরিবার তাকে গভীরভাবে ভালোবাসত। উইলিয়ামও তার পরিবারকে ভালোবাসতেন। দুঃখজনকভাবে, উইলিয়াম বেশ কয়েক বছর ধরে গুরুতর মানসিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। এ কারণে তাকে শক্তিশালী ওষুধ দেওয়া হয়েছিল।
তারা আরও বলেন, 'তার মৃত্যুর পেছনে এসব ওষুধের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তা নির্ধারণ করবেন মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা। আমরা সবাইকে সেই প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান দেখানোর অনুরোধ জানাচ্ছি।'
ছোটবেলায় চ্যাপম্যান আইটিভির ২০০৯ সালের হাস্যরসাত্মক নাটক 'মে কনটেইন নাটস' এবং বিবিসি লার্নিংয়ের 'ট্রু স্টোরিজ' ধারাবাহিকে অভিনয় করেছিলেন বলে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনবিষয়ক তথ্যভান্ডার আইএমডিবিতে উল্লেখ রয়েছে।
এর আগে তিনি বাকিংহামশায়ারের হাই উইকম্বে অবস্থিত জ্যাকি পালমার অভিনয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছিলেন। তার মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটি ফেসবুকে শোক প্রকাশ করে এবং শিক্ষার্থী হিসেবে শৈশবে তোলা চ্যাপম্যানের একটি ছবিও প্রকাশ করে।
প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, 'উইলিয়ামের মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। একজন মানুষ ও অভিনয়শিল্পী হিসেবে তার বেড়ে ওঠা দেখতে আমাদের খুব ভালো লাগত। তার পথচলার অংশ হতে পারা আমাদের জন্য সৌভাগ্যের বিষয় ছিল। যারা তাকে চিনতেন, তারা সবাই তাকে গভীর ভালোবাসা ও মমতার সঙ্গে স্মরণ করবেন।
বন্য প্রাণী পার্ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘটনার সময় খাঁচার ভেতরে থাকা আলতাই নামের আমুর বা সাইবেরীয় বাঘটিকে মেরে ফেলা হবে না।
সপ্তাহান্তে ঘটে যাওয়া এই ঘটনার পর থেকে পার্কটি বন্ধ রয়েছে। পার্কটির পরিচালনার অনুমতিপত্র দেওয়ার দায়িত্বে থাকা ডনকাস্টার নগর পরিষদ জানিয়েছে, তারা স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাবিষয়ক তদন্ত শুরু করেছে।
বৃহস্পতিবার সকালে ডনকাস্টার করোনার আদালতে চ্যাপম্যানের মৃত্যুর ঘটনায় আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
