বাদশা বাহাদুর: নির্যাতন থেকে রেহাই, কিন্তু সে এখন যাবে কোথায়?
বাদশা বাহাদুর সেদিন ঠিকমতো হাঁটতেও পারছিল না। ভারী চামড়ার আবরণ ভেদ করে বেড়িয়ে আসতে চাইছিল পাঁজরের হাড়গুলো। সার্কাসে তাকে দিয়ে খেলা দেখানো হতো। তার কাজ ছিল মানুষের মনোরঞ্জন করা। জীবিকা জোগাড়ে সব রকমেই বাধ্য করা হয়েছে তাকে। কিন্তু মানুষ তাকে ঠিকমতো খাবারটুকুও দেয়নি। বরং অংকুশ দিয়ে আঘাত করেছে, কানের লতিতে রশি পেঁচিয়ে ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করেছে। দাঁত উপড়ে নেওয়ার পর ক্ষত উপশমের চেষ্টাও করেনি। পা, পেট সর্বত্রই ক্ষত। সবচেয়ে গভীর ও বড় ক্ষতটি ছিল ঘাড়ে। সেখানে রশি ঝুলিয়ে দু'পাশে খাবারের বস্তা চাপানো হতো বলে ক্ষতটি তৈরি হয়েছিল।
বাদশা ছিল বগুড়ার মহাস্থানগড়ের সার্কাসের একটি হাতি। দ্য বুলবুল সার্কাসসহ বিভিন্ন সার্কাস পার্টিতে খেলা দেখানোর কাজে ব্যবহার করা হয়েছে তাকে। এছাড়া তাকে নওগাঁ, জয়পুরহাটে সড়ক প্রদর্শনী ও চাঁদাবাজিতে ব্যবহারেরও অভিযোগ আছে।
হাতিটির মালিকের নাম সবুর আলম। মহাস্থানগড়েরই বাসিন্দা তিনি। সবুর আলমের দাবি, হাতিটি তিনি কিনেছিলেন ২০১১ সালে। ২০১৪ সালে ঝড়ের সময় গাছ পড়ে দাঁত ভেঙে যায় বাদশা বাহাদুরের এবং সংক্রমণ তৈরি হয়।
অসুস্থ হওয়ার পরেও হাতিটিকে খেলা দেখানোর কাজে বাধ্য করা হচ্ছিল। সেই সঙ্গে নির্যাতনের শিকারও হচ্ছিল প্রাণীটি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষত-বিক্ষত হাতিটি ভাইরাল হলে প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে। তিনি স্বত্বর হাতিটি উদ্ধার করে শুশ্রূষার নির্দেশ দেন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সবুর আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সবুর আলম বগুড়া সদর উপজেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. রায়হানকে জানিয়েছেন, তিনি আর হাতিটির খাবার ও চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে পারছেন না। তাই স্বেচ্ছায় হাতিটি কর্মকর্তাদের হেফাজতে ছেড়ে দিচ্ছেন। তারপর ৪ জুলাই রাত ৮টায় বগুড়া থেকে বাদশা বাহাদুরকে শুশ্রূষার জন্য চিড়িয়াখানার উদ্দেশ্যে রওনা করিয়ে দেওয়া হয়।
ঘাড়ের ক্ষতটিই বেশি ভাবিয়েছিল
গত ৫ জুলাই ভোরে বগুড়া থেকে বাদশা বাহাদুরকে চিড়িয়াখানায় আনা হয়। চিড়িয়াখানার চিকিৎসকদল প্রাথমিকভাবে ভায়োডিন দিয়ে ক্ষত পরিষ্কার করে অ্যান্টিবায়োটিক স্প্রে করে দেন। দাঁতের ক্ষত স্যালাইন দিয়ে পরিষ্কার করে দেন।
হাতিটির চিকিৎসার জন্য কেন্দ্রীয় পশু হাসপাতাল, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী বিশেষজ্ঞ এবং চিড়িয়াখানার সাবেক প্রাণী চিকিৎসকদের সমন্বয়ে একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠনা করা হয়েছিল। বোর্ডের সদস্যরা প্রথমে বাদশা বাহাদুরের ক্ষতগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। এগুলোর মধ্যে ঘাড়ের ক্ষতটিই তাদের বেশি ভাবিয়ে তুলেছিল। তারা বাদশা বাহাদুরকে লং অ্যাকটিভ বা দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর এমন অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের পরামর্শ দেন। বলেন প্রতিদিন দু'বার ড্রেসিং করার কথাও। ঘাড়ের ক্ষত ছাড়া অন্য ক্ষতগুলো সুপারফিশিয়াল বা অগভীর। সেগুলোয় অ্যান্টিবায়োটিক স্প্রে করার এবং দাঁতের ক্ষতে যেখানে পোকা জন্মে গিয়েছিল, সেটি নিয়মিত ওয়াশ করার পরামর্শ দেন।
চিড়িয়াখানার পরিচালক মো. শাহিনুর আলম নিজেও একজন ভেট, তাই চিকিৎসা কাজে তিনিও যুক্ত ছিলেন। বলছিলেন, 'বাদশা বাহাদুরের ওপর দিয়ে অনেক ঝড় গেছে। সম্ভবত অল্প বয়সেই তাকে খেলা দেখানোর কাজে ব্যবহার করা শুরু হয়। হাতিটিকে পোষ মানানোর প্রক্রিয়াটি আদিম এবং নিপীড়নমূলক। এই প্রক্রিয়ায় মারপিট, অনাহারে রাখা, বেঁধে রাখা ইত্যাদির মতো নিপীড়ন চালানো হয়ে থাকে। আর যেহেতু এটি বৃহৎ প্রাণী, তাই নিপীড়নের মাত্রাও অনেক বেশি হয়। সার্কাসে খেলা দেখানোর ট্রেনিংও দেওয়া হয় মেরে ও অনাহারে রেখে। বাহাদুরের মাথায় অনেকগুলো খোঁচার আঘাত দেখে মনে হয় খেলা দেখাতে তাকে বারবারই বাধ্য করা হয়েছে।'
শাহিনুর আলম আরো বললেন, 'বাদশা শান্ত প্রকৃতির হাতি। সংঘর্ষ বাধানোর প্রবণতা তার মধ্যে নেই। নতুন মাহুতের (যিনি হাতি চালান, প্রশিক্ষণ দেন বা দেখাশোনা করেন) সঙ্গে দ্রুত সে মানিয়ে নিয়েছে। এতে তাকে চিকিৎসা দেওয়া সহজ হচ্ছে'।
তৃতীয় দিনেই উন্নতি
ডা. মো. আমির হোসেন একজন জু অ্যানিমেল কনসালটেন্ট। বাদশার চিকিৎসার দায়িত্ব সতীর্থ চিকিৎসকদের নিয়ে তিনি নিয়মিত পালন করছেন। প্রথম দিকে ভাবা হয়েছিল বাদশার সেরে উঠতে তিন থেকে চার মাস লাগবে। কিন্তু উন্নতি দেখা যায় তৃতীয় দিন থেকেই।
বাদশার ওজন হিসাব করে নেওয়া হয়েছিল ৪ হাজার কেজি। দেওয়া হয়েছিল ১৬০ এমএল ঘনত্বের অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন। একটা ইনজেকশন ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করে। ১০ দিনে দেওয়া হয় ৫টি ডোজ। বাদশার যেসব ক্ষতে ডেড সেল তৈরি হয়েছিল, সেগুলো হাইড্রোজেন পার অক্সাইড দিয়ে পরিষ্কার করে নেওয়া হয়েছিল। খাবারের সঙ্গে ভিটামিন ও খনিজ যোগ করা হয়েছিল। হাতিটি যে তিন দিনের মধ্যেই রেসপন্স করবে তা ভাবেনও নাই চিকিৎসকেরা।
আমির হোসেন বললেন, 'বাদশার বয়স ৫০ এর বেশি। এ হিসাবে সে মধ্যবয়স পার করে ফেলেছে। তাই আশা করিনি এতো দ্রুত রেসপন্স করবে।'
ওষুধের সঙ্গে পথ্য
বাদশাকে দীর্ঘদিন কেবল কলাগাছ খাওয়ানো হয়েছে। ফলে হঠাৎ অধিক পরিমাণের খাবার তার হজম প্রক্রিয়ায় গোলমাল বাধাতে পারে। মেডিক্যাল বোর্ড তাই প্রথমদিকে বাদশা বাহাদুরকে একটি হাতির জন্য নির্ধারিত রেশনের ৫০ ভাগ দিয়েছিল। ক্রমে মানিয়ে নিতে থাকলে ৬০ ভাগ, ৭০ ভাগ রেশন দিয়েছে। এখন ১০০ ভাগ বরাদ্দ পাচ্ছে বাদশা।
চিড়িয়াখানার প্রাণিপুষ্টি কর্মকর্তা গাজী ইয়াসির আরাফাত বাদশার খাবার তালিকা জানালেন। বললেন, 'বাদশা একটি সতেজ হাতি। ওষুধের সঙ্গে সঙ্গে পর্যাপ্ত খাবার গ্রহণ তার ক্ষত সারাতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। তাকে এখন আমরা প্রতিদিন ১০০ কেজি সবুজ ঘাস, ১০০ কেজি কলাগাছ, ৩০ কেজি মিক্সড সবজি (মিষ্টি কুমড়া, লাউ, গাজর ইত্যাদি), ৫ কেজি কলা, সাড়ে ৩ কেজি দানাদার খাবার (গমের ভুষি ইত্যাদি) এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি দিচ্ছি। গত দেড় মাসে সে অনেকটাই সুস্থ হয়ে গেছে।'
ডা. আমির হোসেন বলেন, 'যেহেতু ঘাড়ের ক্ষতটি নিয়েই বেশি চিন্তা ছিল, তাই সেটি যখন ভালো হতে শুরু করে, তখন আমরা আশাবাদী হয়ে উঠি। তবে হাতিটার পেছনের বাঁ পা আর কখনো সারবে না। ২০-২২ বছর আগে এই পায়ে ফ্র্যাকচার হয়েছিল। কালক্রমে সেটি অস্বাভাবিকভাবে জোড়া লেগে যায়। আমরা এটিকে বলি ফলস জয়েন্ট ফরমেশন। এতদিন পর এটিকে আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, হাতিটি তাই খুঁড়িয়েই হাঁটে।'
মাহুত বা মালিকেরা ক্ষত সারাতে কোনো ব্যবস্থা কি নেয়? জানতে চাইলে ডা. হোসেন বললেন, 'তারা হয়তো কালেভদ্রে বাজারে সহজলভ্য এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেট গুড়ো করে ক্ষতের ওপর ছড়িয়ে দেয়। এতে ভালো ফল পাওয়ার কথা নয়।'
বাদশা উৎফুল্ল আছে
চিড়িয়াখানায় মাহুতদের কাজ শুরু হয় সকাল ৭টায়। তারা কিছু সময় হাতিগুলোকে এক্সসারসাইজ করান। পরে গোসল করান। তারপর খাবার দেওয়া হয়। বাদশা বাহাদুর এখন বেশ উৎফুল্ল। এত যত্ন-আত্তি সে আগে কখনো পায়নি। সময় নিয়ে গোসল করে, খাওয়ায় বিরতি নেয় না। এটি তার দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠারও একটি কারণ।
২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) 'স্ট্যাটাস অব এশিয়ান এলিফ্যান্টস ইন বাংলাদেশ' শীর্ষক জরিপ থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে বুনো হাতির সংখ্যা ২৬৮টি এবং ক্যাপটিভ হাতির সংখ্যা ৯৬টি। এর মধ্যে ১৪টি আছে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এবং ৮২টি ব্যক্তিগত মালিকানায়।
ক্যাপটিভ হাতিগুলোর অধিকাংশ কি সার্কাসেই ব্যবহৃত হয়? উত্তরে ডা. হোসেন বললেন, 'চিড়িয়াখানা বা সাফারি পার্কের হাতিগুলোকেও ক্যাপটিভ ধরা হয়। তবে ব্যক্তিমালিকানার হাতিগুলোর বেশিরভাগ সার্কাস বা বিনোদনে ব্যবহৃত হয়। কেউ কেউ শখেও হাতি পোষে। আমাদের দেশে দুই-আড়াই বছর আগেও হাতি পোষার লাইসেন্স দেওয়া হতো।'
মানুষ আর হাতির সহাবস্থান কি সম্ভব নয়? উত্তরে চিড়িয়াখানার পরিচালক ডা. শাহিনুর আলম বললেন, বসতি ও খাবার নষ্ট না করলে, হাতির চলাচল পথে বিঘ্ন তৈরি না করলে হাতি ও মানুষের সংঘর্ষ সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ থাকে কম। মানুষ তার সঙ্গে সংঘর্ষে যাওয়ার ফলে প্রাণীটি এখন বিপন্ন। অথচ এটি বনায়নে দারুণ সাহায্য করে।'
বাদশা বাহাদুর কি বনে থাকতে পারবে?
আঠার শতকে ব্রিটিশরা ভারত উপমহাদেশে ব্যাপকভাবে হাতি ক্যাপটিভ করা শুরু করে। সামরিক বাহিনীর মালামাল বহন করা, গাছের গুড়ি টানা, দুর্গম পথে চলাচল ইত্যাদি নানা কাজে হাতি ব্যবহার করত তারা। ঢাকায় ব্রিটিশরা গড়ে তুলেছিল পিলখানা বা হাতি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। আর ঢাকা হয়ে ওঠে পোষা হাতির কেন্দ্রস্থল।
হাতি ক্যাপটিভ করার উপনিবেশিক আমলের উদ্দেশ্য বর্তমান সময়ে একেবারেই ফুরিয়েছে। তবুও বিনোদন ও চাঁদাবাজির নিমিত্তে এখনো হাতি ব্যবহৃত হচ্ছে এবং নির্মমতার শিকার হচ্ছে। বাদশা বাহাদুর এর স্পষ্ট উদাহরণ।
এই পরিপ্রেক্ষিতে ডা. আমির হোসেনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, বাদশা বাহাদুরকে কি প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ আছে? তিনি উত্তরে বললেন, 'বিষয়টি যথেষ্ট জটিল। প্রথমত ওর জন্ম ইতিহাস আমাদের কাছে নেই। যদি সে ক্যাপটিভ ব্রিড হয়ে থাকে, তবে প্রকৃতিতে মানিয়ে চলা তার জন্য খুবই কঠিন হবে। খাবার খোঁজার উপায়ও তার বেশি জানা নেই। সে ক্যাপটিভ অবস্থাতেই ভালো থাকবে মনে হয়।'
হাতির অভয়াশ্রম
বাদশা বাহাদুরকে সুস্থ করে তোলার উদ্যোগ যেমন প্রশংসা কুড়িয়েছে, তেমনি হাজির করেছে একটি প্রশ্নও: বাদশার মতো যে হাতিগুলো এখনো ক্ষত নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সার্কাসে খেলা দেখাচ্ছে বা পাহাড়ে মালামাল পরিবহনের কাজে ব্যবহার হচ্ছে, সেগুলোর বিষয়ে কী উদ্যোগ নেওয়া হবে?
বিষয়টি আমরা বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. আলী রেজা খানের কাছে উপস্থাপন করি। তিনি বলেন, প্রথমত ব্যক্তি মালিকানায় কোনো হাতি রাখা যাবে না। আবার এগুলো বনেও ছেড়ে দেওয়া যাবে না। কারণ, মানুষের সংস্পর্শে এসে তারা বিভিন্ন রোগের জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত। এগুলো অন্য প্রাণীতে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করবে।
তিনি আরও বলেন, সেক্ষেত্রে তাদের জন্য ১০ বা ১২ বর্গ কিলোমিটারব্যাপী একটি অভয়াশ্রম গড়ে তোলা যেতে পারে, যা হবে সেমি ডমেস্টিকেটেড। ওয়াইল্ডলাইফ বায়োলজিস্ট, ভেট ও মাহুত থাকবে অভয়াশ্রমগুলোতে। মানে হলো মানুষ ও প্রকৃতির সমন্বিত একটি ব্যবস্থায় থাকবে হাতিগুলো। এমন অভয়াশ্রম বা এলিফ্যান্ট অরফানেজ আছে ভারতের তামিলনাড়ু ও শ্রীলংকায় যেখান থেকে আমরা শিক্ষাগ্রহণ করতে পারি।
