যুক্তরাজ্যে কড়া ভিসা নীতি: বাংলাদেশসহ একাধিক দেশের শিক্ষার্থীদের ভর্তির অফার বাতিল করছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো
যুক্তরাজ্য সরকারের কড়া ভিসা নীতি আরোপের কারণে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হতে পারে এমন আশঙ্কায় বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নাইজেরিয়া সহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের দেওয়া ভর্তির অফার বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছে দেশটির উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো।
প্রভাবশালী ব্রিটিশ পত্রিকা ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এর (এফটি) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাজ্যের স্টুডেন্ট ভিসা আবেদনের ১০.৫ শতাংশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। অথচ গত বছরের একই সময়ে এই হার ছিল মাত্র ২.৩ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ছিল ০.৪ শতাংশ। যুক্তরাজ্যের হোম অফিসের [স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়] ডেটা বিশ্লেষণ করে ফাইনান্সিয়াল টাইমস জানায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদন প্রত্যাহারের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০.৯ শতাংশে; গত বছরের একই সময়ে এই হার ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে এই হার ৭.১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৩.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই হার ১.২ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৫.২ শতাংশ।
যুক্তরাজ্য সরকার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্পন্সর করার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য নিয়মকানুন আরও কঠোর করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারিশ করা মোট বিদেশি শিক্ষার্থীর ৫ শতাংশের বেশি ভিসা আবেদন প্রত্যাহার করা হয়, তবে সেই বিশ্ববিদ্যালয়টি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর লাইসেন্স হারাতে পারে। আগে এই ভিসা প্রত্যাখ্যানের সীমা ছিল ১০ শতাংশ।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্য সরকারের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় তারা আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে অনেক ভর্তির অফার বাতিল করছে, যার ফলে ভিসা আবেদন প্রত্যাহারের ঘটনাও বাড়ছে। বিদেশি শিক্ষার্থীরা কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার লেটার বা ভর্তির অনুমতি পাওয়ার পরেই স্টুডেন্ট ভিসার জন্য আবেদন করতে পারেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় অফার ফিরিয়ে নিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সেই ভিসা আবেদন প্রত্যাহার হয়ে যায়।
যুক্তরাজ্যের সরকার বলছে, এই কড়া নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো স্টুডেন্ট ভিসার অপব্যবহার রোধ করা। বিশেষ করে যারা স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাজ্যে এসে পরবর্তীতে আশ্রয় (অ্যাসাইলাম) প্রার্থনা করে কিংবা অবৈধ কাজে যুক্ত হয়, তাদের থামানো।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দাবি, কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা আগে অন্য দেশে পড়াশোনার কথা বিবেচনা করেছিলেন বলে তাদের ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। আবার কোনো কোনো পিএইচডি আবেদনকারীকে কোর্সের নির্দিষ্ট বিষয় বা মডিউল সম্পর্কে বলতে না পারার কারণে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফার লেটার পাওয়ার পরেই স্টাডি ভিসার আবেদন করতে পারেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় পরবর্তী সময়ে অফার লেটার প্রত্যাহার করে নিলে সংশ্লিষ্ট ভিসার আবেদনও প্রত্যাহার হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দাবি, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে হোম অফিসের প্রত্যাখ্যান করা স্টুডেন্ট ভিসার সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে।
যুক্তরাজ্য সরকার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্পন্সর করার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য নিয়মকানুন আরও কঠোর করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারিশ করা মোট বিদেশি শিক্ষার্থীর ৫ শতাংশের বেশি ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়, তবে সেই বিশ্ববিদ্যালয়টি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর লাইসেন্স হারাতে পারে। আগে এই ভিসা প্রত্যাখ্যানের সীমা বা থ্রেশহোল্ড ছিল ১০ শতাংশ।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্য সরকারের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় তারা আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে অনেক ভর্তি অফার বাতিল করছে, যার ফলে ভিসা আবেদন প্রত্যাহারের ঘটনাও বাড়ছে।
পরিসংখ্যান মতে, চলতি বছর প্রায় ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের ভর্তি পুরোপুরি স্থগিত করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে নাইজেরিয়ার শিক্ষার্থীদের ভিসার আবেদন প্রত্যাহারের হারও বেড়ে ২২.৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ছিল ৪.৫ শতাংশ।
ভিসা আবেদন প্রক্রিয়াকরণকারী সংস্থা এনরোলির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের প্রায় অর্ধেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ৫ শতাংশের নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ফলে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির লাইসেন্স হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিদেশ থেকে শিক্ষার্থী নিয়োগকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ইউনিভার্সিটিজ ইউকে ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক জেমি অ্যারোস্মিথ অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর আস্থা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে বলেন, 'ভিসা প্রক্রিয়াকরণ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অনেক ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যানের পেছনে রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ, অসংগতিপূর্ণ যুক্তি। ফলে নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘনের ঝুঁকি এড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ব্যাপক হারে ভর্তির অফার বাতিল করতে হচ্ছে।'
ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাংলিয়ার উপ-উপাচার্য অধ্যাপক স্টিভেন ম্যাকগুয়ার জানান, এই নীতির ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চীন ও ভারতের শিক্ষার্থীদের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। কারণ এসব দেশের ক্ষেত্রে ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার তুলনামূলক কম।'
ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব স্কটল্যান্ডের উপাচার্য অধ্যাপক জেমস মিলার বলেন, 'কিছু ভিসা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্তের পেছনে অত্যন্ত দুর্বল ও অযৌক্তিক যুক্তি দেওয়া হয়েছে।'
তার দাবি, আশ্রয়ের আবেদন করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ ছাড়া প্রত্যাখ্যানের হার বৃদ্ধির বিষয়ে হোম অফিস কোনো বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা দেয়নি। এছাড়া, ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ৫ শতাংশের নিচে রাখতে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বের নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থী নিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছে।
