সাবেক মার্কিন সেনা কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ‘লাইভ স্ট্রিম’ নিয়ে ভ্যান্সের সংশয়, সম্প্রচার হলেও দেখবেন না
২০০৯ সালে টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে হামলাকারী সাবেক মেজর নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড ফায়ারিং স্কোয়াডে কার্যকরের ঘটনাটি সরাসরি সম্প্রচারের (লাইভ স্ট্রিম) যে পরিকল্পনা পেন্টাগন নিয়েছে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, এটি সম্প্রচার করা হলেও তিনি তা দেখবেন না।
শুক্রবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ভ্যান্স জানান, আগামী ডিসেম্বরে নির্ধারিত এই মৃত্যুদণ্ড আদৌ পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তিনি বলেন, 'আমি জানি না বাস্তবে এমন কিছু ঘটতে যাচ্ছে কি না।' তিনি আরও যোগ করেন, 'যদি এটি সরাসরি সম্প্রচার করাও হয়, তবুও আমি তা দেখতে যাচ্ছি না।'
তবে এর কয়েক ঘণ্টা পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, সরাসরি সম্প্রচারের এই পরিকল্পনার প্রতি তার 'সম্পূর্ণ' অনুমোদন রয়েছে; যদিও পেন্টাগন বিষয়টি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
হাসান প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, 'সে ১৩-১৪ জনকে হত্যা করেছে এবং প্রায় ২০ জনের বেশি মানুষকে গুরুতর আহত করেছে। সে পুরোপুরি উন্মাদ। তাই সে কীভাবে মরল তাতে আমার কিছু যায় আসে না, কেবল তার মৃত্যু হওয়াটা জরুরি। আমি মনে করি তার জন্য মৃত্যুদণ্ডই অত্যন্ত উপযুক্ত।'
এর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুতে পেন্টাগন ঘোষণা দেয়, আগামী ৩ ডিসেম্বর ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। গত ৬০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটিই হতে যাচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর হাতে কার্যকর হওয়া প্রথম কোনো মৃত্যুদণ্ড।
এরপর বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ঘোষণা দেন, এই মৃত্যুদণ্ড জনসাধারণের জন্য সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। সিদ্ধান্তের সপক্ষে তিনি যুক্তি দেন, 'মানুষের বোঝা দরকার এই ধরনের কাজের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।'
এদিকে একটি মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের এই পরিকল্পনাকে ঘিরে মার্কিন রাজনীতিতে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলের নেতারাই এর বিরোধিতা করছেন। রিপাবলিকান সিনেটর জন কার্টিস প্রাচীন রোমের রক্তক্ষয়ী প্রদর্শনীগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সতর্ক করে বলেন, মৃত্যুদণ্ডকে যখন বিনোদনের মাধ্যম বানানো হয়, তখন তা মানবসভ্যতার অবক্ষয় ঘটায়।
তিনি হেগসেথকে পরিকল্পনাটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'নিহতদের পরিবারের সম্মানজনক বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এভাবে মৃত্যু প্রচার করা আমাদের হীন করে তোলে এবং এটি কোনো কার্যকর প্রতিরোধক হতে পারে না।'
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর ক্রিস মারফি সিএনএনকে বলেন, এই ভাবনাটি 'ঘৃণ্য' এবং এটি জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের কর্মকাণ্ডের কথা মনে করিয়ে দেয়। একই ধরনের মত দিয়ে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা অস্টিন স্কট বলেন, 'জিহাদিরা এ ধরনের কাজ করে থাকে। আমেরিকা এর চেয়ে অনেক উন্নত।'
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন বিবিসিকে বলেন, এটি সম্পূর্ণ 'অপ্রয়োজনীয়' এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী কেবল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে খুশি করতেই এমন পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
এছাড়া মার্কিন ক্যাথলিক বিশপ সম্মেলন এ সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়ে গভীর শোক প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার করার অর্থ একে 'প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ডে রূপ দেওয়া, যা নির্যাতনবিরোধী আন্তর্জাতিক নীতিমালার চরম লঙ্ঘন'।
মার্কিন সামরিক আইন অনুসারে, এ ধরনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের পাশাপাশি উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত পর্যালোচনার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডটি কীভাবে বা কোন মাধ্যমে সরাসরি দেখানো হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি পেন্টাগন। অন্যদিকে প্রধান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—মেটা, ইউটিউব, টিকটক কিংবা এক্স-এর সহিংসতা ও মৃত্যু প্রদর্শনী সংক্রান্ত কঠোর নীতিমালা রয়েছে। মেটা আগেই স্পষ্ট করেছে, তারা কোনো মৃত্যুদণ্ডের সরাসরি সম্প্রচারের অনুমতি দেয় না।
ইউটিউব ও টিকটকেও সহিংস ও মৃত্যুর দৃশ্য প্রচারের ওপর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে হাসানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত কোনো প্ল্যাটফর্মে দেখানো সম্ভব হবে কি না, সে বিষয়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত কিছু জানায়নি।
