ভারতের মধ্যপ্রদেশে পুরোনো মসজিদের একাংশ ভাঙা নিয়ে উত্তেজনা, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ; আহত অন্তত ১২
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আসন্ন একটি তীর্থযাত্রার জন্য রাস্তা প্রশস্ত করতে মধ্য ভারতের উজ্জয়িনী শহরের একটি মসজিদের একাংশ ভাঙাকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করে মসজিদ প্রাঙ্গণ ঘিরে রেখেছে স্থানীয় প্রশাসন।
২০২৮ সালে ক্ষিপ্রা নদীর তীরে অনুষ্ঠেয় 'সিংহাস্থ কুম্ভমেলা' উপলক্ষে উজ্জয়িনীর ছত্রী চক এলাকার ঐতিহাসিক শাহী মসজিদের অংশবিশেষ ভেঙে রাস্তা চওড়া করার উদ্যোগ নিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মুসলিম সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে স্থানীয় হাইকোর্টে আবেদন করা হলেও আদালত তা খারিজ করে জনস্বার্থের কথা বলে রদবদল স্থগিত রাখতে অস্বীকৃতি জানায়।
রোববার রাতে মসজিদের কাছে বুলডোজার নিয়ে আসা হলে সেখানে হাজারো মানুষ জড়ো হয়ে রাতভর বিক্ষোভ করেন। পরদিন সোমবার সকালে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ চালায়। এতে অন্তত ১২ জন আহত হন এবং বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর মসজিদ কমিটি বাধ্য হয়ে সমঝোতায় পৌঁছায়। বুলডোজারের তাণ্ডব এড়াতে স্থানীয় মুসলিম যুবকরা নিজেরাই হাতুড়ি ও রড দিয়ে মসজিদের সামনের চত্বরের তিন ফুট অংশ ভাঙতে শুরু করেন। মঙ্গলবার কর্তৃপক্ষ মসজিদের মিনারের একটি অংশও ভেঙে ফেলে।
ডিজিটাল বিপণন পেশাজীবী জিশান খান জানান, প্রশাসন এলাকাটি অবরুদ্ধ করে তাদের বলেছিল, 'হয় আপনারা নিজেরা মসজিদ ভাঙুন, না হলে আমরা ভাঙব।' তিনি আরও বলেন, 'আমরা নিজেদের হাতে এটি ভেঙেছি। এতে আমাদের অন্তরে গভীর আঘাত লেগেছে।'
মধ্যপ্রদেশের রাজধানী ভোপাল থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত উজ্জয়িনী। বিরোধিদল কংগ্রেসের সংক্ষিপ্ত ১৫ মাসের মেয়াদ ছাড়া ২০০৩ সাল থেকেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এই রাজ্য শাসন করছে।
এদিকে উজ্জয়িনীতে তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই মঙ্গলবার ভারতের রাজধানীতে 'মসজিদ ও উপাসনালয় লক্ষ্য করে ধারাবাহিক অভিযান এবং ভাঙচুরের' প্রতিবাদে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে একটি মুসলিম সংগঠন। 'মনিটরিং কমিটি অব ইন্ডিয়ান মুসলিমস' আয়োজিত এই কর্মসূচিতে একাধিক মুসলিম সংসদ সদস্য ও ধর্মীয় নেতারা অংশ নেন।
জামায়াতে ইসলামী হিন্দের সভাপতি সৈয়দ সাদাতুল্লাহ হুসাইনি এক বিবৃতিতে বলেন, 'আমাদের বিষয়টি কেবল একটি একক মসজিদ বা কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের নয়। যখন কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ের বিরুদ্ধে আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষার তোয়াক্কা না করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তখন তা আইনের শাসন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।'
এ বিষয়ে মধ্যপ্রদেশের দুজন বিজেপি মুখপাত্রের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা সাড়া দেননি।
নয়াদিল্লিভিত্তিক একটি দাতব্য সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা আসিফ মুজতবা জানান, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতে যে রাজনৈতিক আবহ তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গেই অনেক মুসলিম এসব উচ্ছেদ অভিযানের সম্পর্ক দেখছেন।
তিনি বলেন, 'রাজনীতিতে ব্যবহৃত ভাষা, মসজিদকেন্দ্রিক প্রচারণা, মাদরাসার ওপর চাপ এবং মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘিরে বারবার বিরোধ সৃষ্টির সঙ্গেই মানুষ এসব ধ্বংসযজ্ঞকে সম্পর্কিত মনে করছেন। শহর থেকে মানুষ তাদের ইতিহাস হারিয়ে যেতে দেখছে।'
