ভূমিকম্পের সতর্কবার্তায় মসজিদের লাউডস্পিকার ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে ইন্দোনেশিয়া
ভূমিকম্পপ্রবণ ইন্দোনেশিয়ায় আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানীরা দূরবর্তী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছেও অ্যালার্ম নেটওয়ার্ক পৌঁছে দিতে মসজিদগুলোকে ব্যবহার করার আশা করছেন।
একটি পাঁচ বছর মেয়াদী ট্রায়ালের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, আজান প্রচারের জন্য ব্যবহৃত লাউডস্পিকারগুলোকে ভূমিকম্পের সতর্কতামূলক সাইরেন হিসেবেও ব্যবহার করা যায় কি না।
এই প্রকল্পের প্রধান ড. ইনোউয়ে হিরোশি বলেন, 'প্রত্যেকটি এলাকা বা সম্প্রদায়েরই একটি করে মসজিদ রয়েছে।' পরীক্ষামূলক এই প্রকল্পটি এই জাপানি দুর্যোগ বিশেষজ্ঞেরই মস্তিষ্কপ্রসূত। তিনি জানান প্রায় দুই দশক আগে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রায় ভয়াবহ ভূমিকম্প নিয়ে গবেষণার সময় তার মাথায় এই ভাবনাটি আসে।
জাপানের কিওটো ইউনিভার্সিটির ডিসাস্টার প্রিভেনশন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ইনোউয়ে ইন্দোনেশিয়া সরকারের সাথে কাজ করছেন, দেশটি জাপানের মতো একটি আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে পারে কি না তা মূল্যায়ন করার জন্য।
২০০৯ সালে পশ্চিম সুমাত্রায় অন্তত এক হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটানো একটি ভয়াবহ ভূমিকম্পের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, 'আমি ভেবেছিলাম যদি ইন্দোনেশিয়ায় এই একই সেবা থাকত এবং কম্পন শুরুর আগেই মানুষ সতর্কতা পেত, তবে সেই কয়েকশ মানুষের মধ্যে অনেকেই মারা যেতেন না।'
ইন্দোনেশিয়ার দুর্যোগ সংস্থাকে বিশাল দূরত্ব এবং দুর্গম এলাকার সাথে লড়াই করতে হয়, তবে তাদের একটি সুবিধা রয়েছে—তা হলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় এমন লাউডস্পিকারের একটি পূর্বনির্ধারিত ও প্রতিষ্ঠিত নেটওয়ার্ক, যা অন্য অনেক দেশেরই নেই।
বিশ্বে সর্বাধিক মুসলিম জনসংখ্যার দেশ হিসেবে ইন্দোনেশিয়ায় লাখ লাখ মসজিদ রয়েছে, যেখান থেকে দিনে পাঁচবার আজান প্রচার করা হয়। এই পরীক্ষামূলক প্রকল্পের অধীনে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি মসজিদকে ভূকম্পন নির্ণায়ক (সিসমিক) সেন্সর নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত করা হয়েছে।
ভূমিকম্পের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা মানুষের জীবন বাঁচাতে পারবে কি না—তা দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর নির্ভর করে: অ্যালার্মের একটি কার্যকর নেটওয়ার্ক থাকা এবং সেগুলোর সঠিক কার্যক্রম। ইনোউয়ে বলেন, 'মসজিদের স্পিকারের প্রধান সুবিধা হলো এগুলো প্রস্তুত রয়েছে এবং ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। যেকোনো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অবকাঠামোর ক্ষেত্রে মূল চ্যালেঞ্জ হলো এর রক্ষণাবেক্ষণ... কিন্তু মসজিদের স্পিকারগুলো সাধারণ মানুষ নিজেরাই যত্ন সহকারে রক্ষণাবেক্ষণ করেন।'
আধুনিক দুর্যোগ প্রস্তুতির অনেক কৌশলই মোবাইল ফোনের ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়, যদিও সেগুলো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ ভূমিকম্প যোগাযোগের অবকাঠামোকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।
২০০৮ সাল থেকেই দেশটির একটি সুনামির আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা চালু রয়েছে, তবে এই ভূমিকম্প প্রতিরোধমূলক উদ্যোগটি একটি "যুগান্তকারী সাফল্য" হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ইন্দোনেশিয়া সরকারের অধীনস্থ ন্যাশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন এজেন্সির জ্যেষ্ঠ গবেষক এবং যৌথ গবেষণা দলের ইন্দোনেশীয় প্রধান অ্যান্ডি এক সাকিয়া।
সুনামি উপকূলীয় অঞ্চলগুলোকে প্রভাবিত করে এবং এর পূর্বাভাস দিতে কয়েক মিনিট বা এমনকি কয়েক ঘণ্টার মতো সময় পাওয়া যায়। অন্যদিকে, ভূমিকম্পের তরঙ্গ অবিশ্বাস্য গতিতে মাটির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। সাকিয়া জানান, উৎপত্তিস্থল থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কোনো গ্রাম নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য মাত্র ৫ থেকে ১০ সেকেন্ড সময় পেতে পারে।
তিনি বলেন, 'এটি এখনও একটি প্রাথমিক মডেল পর্যায়ে রয়েছে এবং সাধারণ মানুষের জন্য এখনও সতর্কবার্তা জারি করা হচ্ছে না। তবে এর চূড়ান্ত লক্ষ্য মানুষকে দ্রুত সতর্ক করা যাতে তারা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে।'
২০৩০ সাল পর্যন্ত মেয়াদী এই প্রকল্পের আওতায় স্কুলের লাউডস্পিকারগুলোতে অ্যালার্ম সিস্টেম স্থাপন এবং রেডিও ও টেলিভিশন সম্প্রচার ব্যবহারের বিষয়টি নিয়েও চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়া এবং জাপান উভয় দেশই প্রশান্ত মহাসাগরীয় 'রিং অব ফায়ার'-এ অবস্থিত এবং প্রায়শই ভূমিকম্প দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গবেষকরা দেখছেন জাপান এবং ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে মানুষের আচরণ এবং বেঁচে থাকার কৌশলগুলোতে কী কী পার্থক্য রয়েছে।
জাপানে, সরকারি দুর্যোগ নির্দেশিকাগুলোতে বহুল ব্যবহৃত "ড্রপ অ্যান্ড কভার" (নিচু হওয়া এবং আশ্রয় নেওয়া) কৌশলের ওপর জোর দেওয়া হয়—উদাহরণস্বরূপ, সাথে সাথে টেবিলের নিচে আশ্রয় নেওয়া এবং ভেতরে অবস্থান করা।
এর বিপরীতে, ইন্দোনেশিয়ার মতো কিছু উন্নয়নশীল দেশের এক-দুই তলার বাড়িগুলো প্রায়শই সিমেন্ট-রড ছাড়া ইট-পাথরের গাঁথুনি দিয়ে নির্মিত হয়, যা ধসে পড়ার তীব্র ঝুঁকিতে থাকে। তাই মানুষ দ্রুত বাইরে পালিয়ে বেঁচেছে। কিছু ক্ষেত্রে, ইন্দোনেশিয়ার দুই তলা ভবনগুলোর প্রথম তলা পুরোপুরি দুমড়ে-মুচড়ে গুঁড়িয়ে গেলেও দ্বিতীয় তলা তুলনামূলকভাবে অক্ষত থাকতে দেখা গেছে।
ইনোউয়ে বলেন, 'মানুষ যেভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় তা হলো—তারা দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে পালিয়ে যায়। তারা কীভাবে বেঁচে থাকতে হয় তা জানে।'
যেহেতু আন্তর্জাতিক মানসম্মত পরামর্শগুলো সর্বদা ঝুঁকিপূর্ণ বা দুর্বল ভবনগুলোর ক্ষেত্রে উপযোগী হয় না, তাই প্রকল্পের গবেষকরা বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে নির্দেশিকা তৈরি করতে সিমুলেশন এবং মানব পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিচালনা করছেন। ইনোউয়ে বলেন, 'এটি মূলত গবেষণার অন্যতম প্রধান বিষয়।'
মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য দেশও একই ধরনের ব্যবস্থা বিবেচনা করে দেখেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার যখন তাদের 'বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র' চালু করার পরিকল্পনা করেছিল, তখন এই প্রকল্পের এক কর্মকর্তা জানান, তেজস্ক্রিয়তা বা বিকিরণ ফাঁসের ঘটনা ঘটলে আরও বড় অ্যালার্ম নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে মসজিদের লাউডস্পিকারগুলো ব্যবহার করা হবে।
মসজিদের লাউডস্পিকার ব্যবহার করার ক্ষেত্রে অনেক বড় পরিসরের একটি প্রকল্প চলছে উজবেকিস্তানে, যেখানে জরুরি অবস্থা বিষয়ক মন্ত্রণালয় এ বছর ২৭২টি মসজিদে এই সংক্রান্ত সরঞ্জামাদি বা যন্ত্র ইনস্টল করার জন্য একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্পের ঘোষণা দিয়েছে। এই অ্যালার্মগুলো মানুষকে বন্যা, কাদা ও মাটির ধস, ভূমিধস এবং তুষারধসের বিষয়ে সতর্ক করবে।
উদ্যোগটির অংশীদার জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি এক বিবৃতিতে বলেছে, 'মসজিদ নির্বাচন আকস্মিক বা কাকতালীয় নয়। ঐতিহ্যগতভাবেই এগুলোকে স্থানীয় সম্প্রদায়ের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাবশালী কর্তৃত্বপূর্ণ সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করা হয়।'
