দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও হরমুজ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানিতে বড় উত্থান
চলতি মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে বলে জানিয়েছেন তেল খাতের আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা। গত মার্চে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার আগে যে পরিমাণ তেল রপ্তানি হতো, বৈশ্বিক তেল সরবরাহ এখন প্রায় সেই স্তরের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তেলের সরবরাহে এমন বড় ধরনের ঘুরে দাঁড়ানো—বিশ্ববাজারে জ্বালানির ওপর তৈরি হওয়া চাপ কিছুটা কমাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে হরমুজ প্রণালি হয়ে গড়ে প্রতিদিন এক কোটি ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়েছে। এ ছাড়া বিকল্প পাইপলাইন ও হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে রপ্তানি করা যায়, এমন সব বন্দরের মাধ্যমে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে চলতি মাসে প্রতিদিন আরও ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রপ্তানি হয়েছে।
ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে– হরমুজ প্রণালি ও অন্যান্য বিকল্প রুট দিয়ে, এই অঞ্চল থেকে দৈনিক প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হতো। তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর সুনির্দিষ্ট অবস্থান জানা জটিল হওয়ায় বিশ্লেষকদের দেওয়া তথ্যের সাথে তেলের প্রকৃত পরিমাণের কিছুটা তারতম্য থাকতে পারে, তবে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞই মনে করছেন—চলতি মাসে রপ্তানির পরিমাণ আগের চেয়ে অনেকটাই বেড়েছে।
এদিকে তেলবাহী জাহাজে ইরানের আক্রমণ অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও–- হরমুজ প্রণালিতেই এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে। হামলা থেকে জাহাজগুলোকে সুরক্ষা দিতে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এ সামরিক নিরাপত্তার কারণে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় রপ্তানিকারক দেশগুলো, অতিরিক্ত তেল সরবরাহে উৎসাহিত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নটরডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ও হরমুজ প্রণালি বিষয়ক সংঘাত বিশেষজ্ঞ ইউজিন ঘোলেজ বলেন, "তারা বিপুল পরিমাণ তেল বের করে আনতে সক্ষম হচ্ছে। শিপিং সংস্থাগুলোর আস্থা বৃদ্ধির সাথে সাথে ক্রমান্বয়ে এই সরবরাহের পরিমাণ বাড়ছে।"
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তাঁর প্রশাসনের অন্যান্য পদস্থ কর্মকর্তা এবং দেশটির সামরিক কর্মকর্তারা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দাবি করে আসছেন যে, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রয়েছে এবং এর ভেতর দিয়ে নিয়মিত তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল করছে।
কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, তেল রপ্তানি বৃদ্ধি পাওয়ার এই চিত্রটি ইঙ্গিত করে যে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর থেকে হয়তো ইরানের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হতে শুরু করেছে। গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের কারণে– ট্যাংকার জাহাজের মাধ্যমে ইরান তাদের নিজেদের তেল রপ্তানি করতে পারছে না, যা দেশটির রাজস্ব আয়ের একটি বড় উৎস বন্ধ করে দিয়েছে।
কিংস কলেজ লন্ডনের 'সেন্টার ফর ডিফেন্স স্টাডিজ'-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মার্টিন নাভিয়াস বলেন, "এই পরিস্থিতি আমাকে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে চাপটা এখন ইরানের ওপর, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নয়।"
তেল সরবরাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে কিছুটা সাফল্য এলেও – প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম এখনো যুদ্ধপূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে অনেক উপরে রয়েছে। আর পেট্রোলিয়াম ও ডিজেলের উচ্চমূল্য বিশ্বজুড়ে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনভিত্তিক আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান– পিকারিং এনার্জি পার্টনার্স-এর প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ড্যান পিকারিং জানান, উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানিতে কিছুটা পুনরুদ্ধার সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী যে পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন, সরবরাহ এখনো তার চেয়ে কম।
পিকারিং বলেন, "আমরা এখনো একটি সংকটপূর্ণ বা আঁটসাঁট বাজার সরবরাহের মুখে দাঁড়িয়ে আছি।"
কেপলারের মতে, বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক ১ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করা হচ্ছে, যা যুদ্ধের শুরুর দিকের তলানিতে নামা অবস্থার তুলনায় বড় ধরণের অগ্রগতি। অবশ্য যুদ্ধের আগে এই প্রণালী দিয়ে দৈনিক যে ১ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হতো, তার তুলনায় এই পরিমাণ এখনো বেশ কম।
তবে কয়েকটি জাহাজ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার পরিসংখ্যানে এই সংখ্যা কিছুটা কম দেখা গেছে। ট্যাংকারট্যাকার্স ডটকম-এর হিসাব অনুযায়ী, চলতি মাসে এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৭৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়েছে।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসি-র সিনিয়র ফেলো ড্যানিয়েল স্টার্নঅফ অবশ্য তথ্যের জন্য কোনো একটি একক ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠানের ওপর শতভাগ নির্ভর না করার পরামর্শ দিয়েছেন। এসব ট্র্যাকিং ফার্মগুলোর পরিসংখ্যানে প্রায়ই পার্থক্য দেখা যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, " তবে এসব সংস্থার দেওয়া সব তথ্যই কিন্তু নির্দেশ করছে যে, সেপ্টেম্বরে তেলের প্রবাহ বা সরবরাহ বেড়েছে।"
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, ইরান এখনো জাহাজ এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা জোরদার করতে পারে। তা হলে তেলের সরবরাহ ফের কমে গিয়ে– বিশ্ববাজারে আরেক দফা মূল্যবৃদ্ধি ঘটতে পারে। চলতি মাসে হামলার শিকার হওয়ার পর সৌদি আরবের একটি বড় পাইপলাইন বন্ধ হয়ে গেছে, যা হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনে ব্যবহৃত হতো।
রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসি-র মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বিষয়ক ফেলো জিম ক্রেন বলেন, "ইরান যদি সংঘাত আরও বাড়াতে চায়, তবে তাদের হাতে অনেক বিকল্প পথ রয়েছে। তবে আমার কাছে মনে হচ্ছে, তারা আপাতত নিজেদের কিছুটা গুটিয়ে রেখেছে।"
অন্যদিকে কয়েক মাস ধরে সংঘাতের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এমন অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত হয়ে গেছে—এমনটা ঘোষণা দেওয়া এখনো কঠিন।
যদিও তেল এখন আগের চেয়ে বড় পরিমাণে বাইরে পাঠানো যাচ্ছে, তবে এর জন্য যে বিশাল মার্কিন সামরিক সুরক্ষার প্রয়োজন হচ্ছে—তা অনির্দিষ্টকালের জন্য বজায় রাখা বেশ কঠিন হবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের এই নিরাপত্তা বলয় থাকা সত্ত্বেও অনেক তেলবাহী জাহাজ প্রণালি পার হওয়ার সময় হামলার শিকার হয়েছে, যার ফলে অনেক আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহন কোম্পানি এখনো এই রুটে ফিরতে ভয় পাচ্ছে।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন-এর মহাসচিব আর্সেনিও ডমিঙ্গেজ গত সপ্তাহে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, "এই প্রণালিটি নৌ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত বলা যাবে না, কারণ এটি এখনো নিরাপদ নয়।" সংস্থাটির হিসাব মতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এপর্যন্ত ৮৫টি জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে এবং ২৪ জন নাবিক তাতে প্রাণ হারিয়েছেন।
কেপলারের কমোডিটি রিসার্চের পরিচালক ম্যাট স্মিথ জানান, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানি যুদ্ধপূর্ববর্তী মাত্রার ৮৫ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছালেও স্বাভাবিক অবস্থা এখনো ফিরে আসেনি।
স্মিথ বলেন, "তেল উৎপাদন এবং শোধনাগারগুলোর কার্যক্রম আরও বাড়ানো প্রয়োজন। আর হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার ঝুঁকি পুরোপুরি দূর না হওয়া পর্যন্ত, তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।"
