ইয়েমেনের মোখা এখন হুথিদের নিয়ন্ত্রণে: যে কারণে এ শহর দখল গুরুত্বপূর্ণ
সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের সাথে ইরান-ঘনিষ্ঠ আন্দোলনের তীব্র সংঘাতের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার এক বড় ধরনের সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইয়েমেনের বন্দরনগরী মোখা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে হুথি বিদ্রোহীরা।
ক্রমবর্ধমান এই সহিংসতার কারণে মোখা ছেড়ে পালিয়ে গেছেন শত শত নারী ও শিশু। তারা সৌদি-সমর্থিত সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা লাহেজ ও এডেন প্রদেশে আশ্রয় খুঁজছেন। এই তীব্র সংঘাতের ফলে তাইজ ও আল-হুদায়দাহ প্রদেশে আগে থেকেই চলা ভয়াবহ মানবিক সংকট আরও চরম আকার ধারণ করেছে। গত দুই সপ্তাহে এই দুই প্রদেশে সংঘর্ষের কারণে ২০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
এই সামরিক পরিবর্তনের ফলে সাধারণ মানুষের ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরে আল জাজিরার ইয়েমেন বিষয়ক সম্পাদক আহমেদ আল-শালাফি বলেন, 'হুদায়দাহর দক্ষিণাঞ্চল ও মোখা থেকে ধুবাব ও এডেনের দিকে মানুষের বড় ধরনের বাস্তুচ্যুতির ঢেউ দেখা গেছে।'
আকস্মিক প্রত্যাহার
মোখার পতন মূলত হুথিদের এক বিশাল সামরিক অভিযানের চূড়ান্ত পরিণতি, যা সরকারপন্থি প্রতিরক্ষার দুর্বলতাগুলোকে প্রকাশ্যে এনেছে। আল-শালাফির তথ্যমতে, হুথিরা গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে তিনটি পৃথক দিক থেকে চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে: পশ্চিম তাইজ, দক্ষিণ হুদায়দাহ এবং খোদ মোখা শহর।
আল-শালাফি এবং তাইজ থেকে প্রতিবেদন পাঠানো আল জাজিরার প্রতিনিধি মহা আলী জানান, হুথিদের এই শহরটির নিয়ন্ত্রণ নিতে সাহায্য করার পেছনে মূল কারণ ছিল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেসের প্রত্যাহার।
ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্সের নেতৃত্বে রয়েছেন তারেক সালেহ—তিনি ইয়েমেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর ভাতিজা (যিনি শুরুতে হুথিদের সঙ্গে জোট গড়েছিলেন এবং পরবর্তীতে তাদের হাতেই নিহত হন)। তারেক সালেহর এই বাহিনী সৌদি-সমর্থিত জোট এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অন্যতম প্রধান অংশ ছিল।
আল-শালাফি বলেন, 'আজ ভোরে ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস নিজেদের অবস্থান থেকে সরে গিয়ে মোখার ভেতরের দিকে চলে যাওয়ার পরই' হুথিরা শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। তিনি আরও যোগ করেন, ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স বাহিনী 'নিজেদের নতুন করে সংগঠিত করতে, নাকি কোনো সামরিক কারণে, অথবা হুথিদের তীব্র সামরিক বহরের সামনে দাঁড়াতে না পেরে' পিছু হটেছে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
আল জাজিরার মহা আলীর তথ্য অনুযায়ী, আল-ওয়াজিয়াহ ও মাওজা ফ্রন্টে হুথিদের অগ্রযাত্রার মুখে সালেহ তাঁর বাহিনীকে 'কৌশলগতভাবে প্রত্যাহার ও নতুন অবস্থানে মোতায়েন করার' নির্দেশ দেন এবং তাদের একটি বিকল্প কমান্ড সেন্টার গড়ে তোলার নির্দেশ দেন।
সম্প্রসারিত ফ্রন্ট
এই সংঘাত এখন খুব দ্রুত সমুদ্র এবং দূরবর্তী স্থলভাগেও ছড়িয়ে পড়ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স অজ্ঞাত চারটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, হুথিরা 'লোহিত সাগরের কৌশলগত হানিশ দ্বীপে আক্রমণ শুরু করেছে।'
একই সময়ে মহা আলী জানান, 'ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্সের সামরিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, সরকারপন্থি বাহিনীর বিমান হামলায় হুদায়দাহ প্রদেশের আল-তুহায়তা, আল-সালিফ এবং কামারান দ্বীপে থাকা হুথিদের অবস্থান লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। অন্যদিকে হুথিরা কৌশলগত জুকার দ্বীপের দিকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।'
অভ্যন্তরীণ এলাকায়ও লড়াই তীব্র হয়েছে। আলী জানান, মারিবে 'সানা থেকে আসা হুথিদের অতিরিক্ত সেনা বহর লক্ষ্য করে যুদ্ধবিমান থেকে হামলা চালানো হয়েছে ফারদাত নিহমে এবং মারিবের উত্তর ও দক্ষিণে অগ্রসর হওয়া অন্যান্য বহরেও আক্রমণ করা হয়েছে।'
বিশ্ব বাণিজ্যের সংবেদনশীল রুট
মোখার ভৌগোলিক অবস্থান এর পতনকে একটি বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত করেছে। শহরটি বাব আল-মান্দেব প্রণালী থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার (৪৭ মাইল) উত্তরে অবস্থিত, যা লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সাথে যুক্ত করেছে।
গেট অব টিয়ার্স নামে পরিচিত এই সংকীর্ণ নৌপথটি মূলত উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সুয়েজ খাল হয়ে ভূমধ্যসাগরে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও জ্বালানি পরিবহনের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ধমনী। পাশাপাশি এশীয় পণ্য ও রুশ তেল পরিবহনের জন্যও এটি ব্যবহৃত হয়।
আল জাজিরার ইউসেফ মাউরি ব্যাখ্যা করে বলেন, মোখার নিয়ন্ত্রণ হুথিদের 'বাব আল-মান্দেব বরাবর একচ্ছত্র আধিপত্য' দেওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে।
তাছাড়া, এটি হুথি-বিরোধীদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ পথও বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে; যার মধ্যে রয়েছে মোখা থেকে দক্ষিণের দিকে গিয়ে তাইজকে যুক্ত করা প্রধান সড়ক এবং মোখা বন্দরের মাধ্যমে আসা রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা।
প্রতিরক্ষা নীতি বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুশতাই আল জাজিরাকে বলেন, 'এটি এই যুদ্ধের একটি চূড়ান্ত টার্নিং পয়েন্ট। এর ফলে দক্ষিণ ইয়েমেনে সরকারি বাহিনীর পুরোপুরি ভেঙে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।'
পুশতাই আরও বলেন, 'আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকা সর্বশেষ কার্যকর বন্দর ছিল এই মোখা।'
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
যুক্তরাজ্যের ফরেন কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের এক মুখপাত্র ঘোষণা করেছেন, 'এই সংকটের জন্য সম্পূর্ণ দায় হুথিদের।' তিনি তাদের 'তাৎক্ষণিকভাবে আক্রমণ এবং সংঘাত বাড়ানো বন্ধ করার' আহ্বান জানান।
কফির আদি ইতিহাস
একটি ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠার বহু আগে থেকেই মোখা ছিল আরব উপদ্বীপের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং বৈশ্বিক কফি বাণিজ্যের জন্মস্থান। বিশ্ববিখ্যাত 'মোখা কফি'র নামকরণ হয়েছিল মূলত এই শহরের নাম থেকেই।
প্রাচীন হিমিয়ারীয় গ্রন্থে 'মাখন' হিসেবে উল্লেখিত এই শহরটি ৫১৭ খ্রিষ্টাব্দে আবিসিনীয়রা প্রথম দখল করেছিল, পরবর্তীতে হিমিয়ারীয় রাজা ধু নুওয়াস তাদের বিতাড়িত করেন।
১৫৩৬ থেকে ১৫৩৮ খ্রিষ্টাব্দে অটোমান সাম্রাজ্য শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর জন্য এটিকে একটি সামরিক ঘাঁটিতে রূপান্তরিত করে।
ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, পর্তুগিজরাই ছিল প্রথম ইউরোপীয় যারা এই ইয়েমেনি কফির স্বাদ পেয়েছিল। যখন মোখার শেখ তাদের আতিথ্য দিয়েছিলেন এবং এমন এক 'কালো পানীয় পরিবেশন করেছিলেন যা শরীরকে সতেজ করে এবং মনকে শান্ত করে'।
ঐতিহাসিকদের মতে, সুফি পণ্ডিত আলি বিন ওমর আল-শাধিলি প্রথম আবিসিনিয়া থেকে কফি মোখায় নিয়ে এসেছিলেন।
১৫৩৬ সালে অটোমানরা এই বন্দরের মাধ্যমে প্রথম কফি রপ্তানি কার্যক্রম শুরু করে। তারা লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ ও আলেকজান্দ্রিয়ায় কফির বীজ পাঠাত, যেখান থেকে সেগুলো ইউরোপীয়দের কাছে বিক্রি হতো। ডাচরা ১৬২৮ সালে প্রথম বাণিজ্যিক কফি চুক্তি নিশ্চিত করে এবং পরবর্তীতে সেখান থেকে জ্যান্ত বীজ চোরাচালান করে নিয়ে গিয়ে জাভা ও আমেরিকায় এর চাষ শুরু করে।
সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দী জুড়ে বিস্তৃত ছিল মোখার স্বর্ণযুগ। তবে উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে অটোমান ও ব্রিটিশদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এবং এডেন ও হুদায়দাহর মতো প্রতিদ্বন্দ্বী বন্দরগুলোর দ্রুত উত্থানের ফলে মোখার গুরুত্ব ম্লান হয়ে যায়।
এই অর্থনৈতিক পতন স্থানীয় জনসংখ্যার ওপর মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে এনেছিল। উনবিংশ শতাব্দীতে মোখার জনসংখ্যা প্রায় ২০ হাজার থেকে কমে ১৯৩০-এর দশকে মাত্র ১ হাজারে নেমে আসে। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়ে ২০০৪ সাল নাগাদ শহরটির জনসংখ্যা আবার ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
