ইউরোপে তেলের চালান বাতিল করেছে সৌদি আরব
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে ইউরোপের অন্তত দুটি তেল শোধনাগারকে (রিফাইনারি) আগামী অক্টোবরের অপরিশোধিত তেল সরবরাহ না করার কথা জানিয়ে দিয়েছে সৌদি আরব।
সাধারণত নির্দিষ্ট মেয়াদি চুক্তির আওতায়, সৌদি আরবের কাছ থেকে মাসভিত্তিক নির্দিষ্ট পরিমাণে অপরিশোধিত তেল কেনে ইউরোপের রিফাইনারিগুলো। তবে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি উল্লেখ করে 'ফোর্স মাজ্যুর' ঘোষণার মাধ্যমে জ্বালানি কোম্পানিগুলো এসব চালান বাতিলের আইনি সুযোগ পায়।
এর আগে, চলতি মাসের শুরুর দিকে পারস্য উপসাগরের কৌশলগত সমুদ্রপথ– হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকার কারণে, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে তাদের ঘোষিত 'ফোর্স মাজ্যুর'-এর মেয়াদ আগামী নভেম্বরের শুরু পর্যন্ত বাড়ায় কাতার।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনার প্রভাব ওই সমুদ্রপথে জ্বালানি পরিবহন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তবে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ব্যবহারের মাধ্যমে ইরানকে এড়িয়ে তেল রপ্তানি বজায় রাখতে পারছিল রিয়াদ। এই পাইপলাইনের সাহায্যে যুদ্ধপূর্ব সময়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বা দৈনিক প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছিল দেশটি।
তবে গত সপ্তাহে এক ড্রোন হামলায়– কৌশলগত এই পাইপলাইনটির কার্যক্রম অচল হয়ে পড়ে। সৌদি আরবের দাবি, ইরাকের ইরানঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে এই হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরাও ইয়ানবু বন্দর এবং সৌদি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি আরামকোর বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার দায় স্বীকার করেছে।
ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হুথিরা— নতুন করে হামলা শুরু করার পর থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড-এর দাম হু-হু করে বাড়ছে। সৌদি আরব ইয়েমেনের ভেতরে হুথি লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা জোরদার করেছে, এর জবাবে হুথিরাও সৌদি আরবের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
গত শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০৩ ডলারে পৌঁছায়। তবে জ্বালানি বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, ব্রেন্টের নির্ধারিত এই মূল্য কেবল আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক; বাস্তবে সরাসরি তেল কেনার ভৌত খরচ অনেক বেশি এবং ডিজেল ও জেট ফুয়েলের মতো পরিশোধিত জ্বালানির দাম আরও বেশি আকাশচুম্বী।
এমনকি স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত জ্বালানি উৎপাদন থাকায়— মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ থেকে কিছুটা সুরক্ষিত থাকা যুক্তরাষ্ট্রেও গত সপ্তাহে ডিজেলের দাম ৭.৭ শতাংশ বেড়েছে।
সৌদি জাহাজের ওপর লোহিত সাগরে চলাচলের ক্ষেত্রে—হুথিরা বিধিনিষেধ ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর রিয়াদ 'সুয়েজ মেডিটেরেনিয়ান পাইপলাইন' (সুমেদ) দিয়ে তেলের চালান বিকল্প পথে পাঠানোর উদ্যোগ নেয়।
উল্লেখ্য, এক দশক আগে হুথিরা ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল এলাকা দখল করার পর—তাদের ক্ষমতাচ্যুত করতে আরব দেশগুলোর একটি সামরিক জোটের নেতৃত্ব দেয় সৌদি আরব। পরবর্তীতে ২০২২ সালে সৌদি আরবের সমর্থিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার হুথিদের সাথে অস্ত্রবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার মাধ্যমে সৌদি আরব সরাসরি যুদ্ধ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
তবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে এলেও হুথি-নিয়ন্ত্রিত বন্দর ও বিমানবন্দরগুলোতে আকাশ ও নৌ অবরোধ বহাল রাখে রিয়াদ। হুথিদের দাবি, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে তাদের ঘোষিত নৌ-নিষেধাজ্ঞা তুলতে হলে—ইয়েমেনের ওপর বহাল এই অবরোধ পুরোপুরি প্রত্যাহার করতে হবে।
