‘লক্ষ্যভ্রষ্ট’ মার্কিন বোমার আঘাতেই ইরানে বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রাণহানি ঘটেছে
দক্ষিণ ইরানে বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালে একটি বাড়িতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা তদন্ত করছে পেন্টাগন। অভিযান সম্পর্কে অবগত একজন ব্যক্তির দাবি, কাছের একটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সময় মার্কিন একটি বোমা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ওই বাড়িতে আঘাত হানার সম্ভাবনাই বেশি।
ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, বাড়িটিতে হামলায় অন্তত চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং আরও কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন। গত মঙ্গলবার দক্ষিণ ইরানে চালানো একাধিক মার্কিন হামলার অংশ ছিল এটি।
একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের উপকূলীয় শহর কুহেস্তাকে একটি যোগাযোগকেন্দ্র লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। কমপ্লেক্সটি বেসামরিক এলাকায় থাকলেও, এর একটি অংশ ইরানি বাহিনী সামরিক অভিযান পরিচালনায় ব্যবহার করত বলে ধারণা করা হচ্ছিল।
অভিযান সম্পর্কে অবগত ওই ব্যক্তি জানান, মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধবিমান থেকে ছয়টি বোমা ফেলা হয়। এর মধ্যে পাঁচটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানলেও একটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় বলে মনে হয়েছে।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের যাচাই করা ছবি ও ভিডিও অনুযায়ী, টাওয়ারটি থেকে প্রায় ৪৪০ ফুট দূরের ওই বাড়ির ছাদে বিস্ফোরণ ঘটে।
ইরানের উপ-স্বাস্থ্যমন্ত্রী আলী জাফারিয়ান জানান, বিস্ফোরণে অন্তত দুই নারী এবং ৪ ও ১৬ বছর বয়সী দুই শিশু নিহত হয়েছে। আহত হয়েছেন ৯০ জনের বেশি। তবে এসব তথ্য দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
অভিযান সম্পর্কে অবগত ওই ব্যক্তি জানান, বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ওই অভিযানে লক্ষ্যবস্তু যাচাই-বাছাইয়ের একাধিক স্তরসহ ব্যাপক সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছিল।
গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, 'আমরা বিষয়টি তদন্ত করছি। কারণ আমরা এটি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি এবং প্রকৃত ঘটনা জানতে চাই।'
অঞ্চলটিতে সামরিক কার্যক্রম তদারককারী মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা বেসামরিক হতাহতের খবরের বিষয়ে অবগত এবং বিষয়টি 'খতিয়ে দেখা' হচ্ছে। তবে এ নিয়ে বিস্তারিত আর কোনো তথ্য দিতে তারা অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র নেভি ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেন, 'ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মতো মার্কিন সামরিক বাহিনী কখনোই বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করে না।'
বিস্ফোরণের কারণ হিসেবে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কোনো ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ওই বাড়িতে পড়ার একটি সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন কর্মকর্তারা। তবে বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানিয়েছে, কুহেস্তাকে কেবল একটি টাওয়ারকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। ফলে ওই বাড়িতে ইচ্ছাকৃতভাবে হামলা চালানো বা লক্ষ্যবস্তু গুলিয়ে ফেলার কোনো অবকাশ নেই।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হামলার রাত ও পরবর্তী সময়ের ভিডিও এবং ছবি বিশ্লেষণ করে হামলার সঠিক স্থান ও দূরত্ব নিশ্চিত করেছে। এর আগে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এবং বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই হামলার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছিল।
ছয় মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় বেসামরিক নাগরিক নিহতের তালিকায় এটি সবশেষ সংযোজন। বর্তমানে ওই অঞ্চলে একটি ভঙ্গুর অস্ত্রবিরতি চললেও মাঝে মাঝেই হামলার ঘটনা ঘটছে।
এদিকে, মানবাধিকার সংস্থা ও আইনপ্রণেতাদের উদ্বেগকে নাকচ করে দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছিল, বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি তোয়াক্কা না করে চালানো এসব বিমান হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
অন্যদিকে, পেন্টাগন বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য নিয়োজিত একটি দপ্তর প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে এবং এর তদন্ত কর্মকর্তাদের অন্যত্র বদলি করেছে।
এর আগে যুদ্ধের শুরুতে গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানি সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন হামলায় পাশের একটি স্কুলে অন্তত ১৭৫ জন নিহত হয়েছিল, যাদের অধিকাংশই ছিল শিশু। দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের পূর্ববর্তী প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুরোনো তথ্যের ভিত্তিতে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের ভুলের কারণে ওই হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল।
বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার পর ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, মানুষ টর্চ হাতে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের ভেতরে ছুটছেন এবং উদ্ধারকর্মীরা আগুন নেভাতে পানি ব্যবহার করছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ সংস্থাটি লিখেছে, 'স্কুল, স্টেডিয়াম ও আবাসিক ভবনের পর ইরানের বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে মার্কিন সেনাবাহিনীর যুদ্ধাপরাধের তালিকায় এখন বিয়ের অনুষ্ঠানকেও যুক্ত করুন...।'
গত মঙ্গলবারের হামলায় বোমাটি কেন লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো তা এখনো স্পষ্ট নয়। অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, গাইডেড বোমাগুলো জিপিএসসহ একাধিক নিখুঁত প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে এবং সাধারণত এগুলো লক্ষ্যবস্তুতেই আঘাত হানে। লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার ঘটনা খুব কমই ঘটে এবং তা মূলত ভুল গোয়েন্দা তথ্য, মানবিক ভুল বা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে হতে পারে।
অভিযান সম্পর্কে অবগত ওই ব্যক্তি জানিয়েছেন, টাওয়ার কমপ্লেক্সে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি গ্লাইড বোমা 'জয়েন্ট স্ট্যান্ডঅফ ওয়েপনস' (জেএসওডব্লিউ) ব্যবহার করা হয়েছিল।
অস্ত্র বিশেষজ্ঞ ট্রেভর বল জানান, ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে দেখানো হামলার ধ্বংসাবশেষ জেএসওডব্লিউ বোমার লেজ ও আবরণের অংশের সঙ্গে মিলে যায়। তবে ধ্বংসাবশেষগুলো ওই ঘটনাস্থল থেকেই উদ্ধার করা হয়েছে কি না, তা ওয়াশিংটন পোস্ট স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
ট্রেভর বল আরও বলেন, ক্ষয়ক্ষতির ধরন দেখে মনে হচ্ছে এতে জেএসওডব্লিউ-এর একটি সংস্করণ ব্যবহার করা হয়েছে। এতে প্রায় ১৯৩ পাউন্ড বিস্ফোরক থাকে। গর্তের আকৃতি এবং আশপাশের ভবনে ছড়িয়ে থাকা স্প্লিন্টারের আঘাত দেখে ধারণা করা হচ্ছে, বোমাটি সরাসরি ছাদের ওপর বা ঠিক তার ওপরে বিস্ফোরিত হয়েছে।
তিনি ধ্বংসাবশেষ ও স্প্লিন্টারের চিহ্ন বিশ্লেষণ করে জানান, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া বা কাছাকাছি কোনো অস্ত্রাগার বিস্ফোরণের যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা হওয়ার অবকাশ নেই। কারণ সেক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মার্ক ক্যানসিয়ান বলেন, লক্ষ্যবস্তুর দিকে যাওয়ার সময় জেএসওডব্লিউ বোমার দিকনির্দেশনা পরিবর্তন করা যায়। টাওয়ারের খুব সরু একটি অংশকে 'টার্গেট' করায় বোমাটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে থাকতে পারে।
তিনি জানিয়েছেন, ইলেকট্রনিক জ্যামিং বা অন্য কোনো বাধার কারণে বোমাটির গতিপথ বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ জেএসওডব্লিউতে একাধিক নির্দেশনা ব্যবস্থা রয়েছে। সংগৃহীত ছবি এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনার পর তিনি বলেন, টাওয়ার ও বাড়িতে চালানো হামলাগুলো মার্কিন বাহিনীর হওয়ার 'প্রবল সম্ভাবনা' রয়েছে।
মার্কিন বিমানবাহিনীর বিশেষ অভিযানে আগে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের দায়িত্বে থাকা ওয়েস ব্রায়ান্ট জানিয়েছেন, জনবসতিপূর্ণ এলাকায় হামলা চালানোর আগে সামরিক পরিকল্পনাকারীদের আশপাশের এলাকা বিবেচনায় নিতে হয়।
ব্রায়ান্ট বলেন, 'হামলার আগে বেসামরিকদের স্বাভাবিক চলাচল সম্পর্কে জানতে হবে। পাশাপাশি লক্ষ্যবস্তুর আশপাশের প্রতিটি ভবন সম্পর্কেও তথ্য নিতে হবে।'
