নেপালের ভয়াবহ বন্যা কেন ভারতের জন্য বড় সতর্কবার্তা
নেপালে সাম্প্রতিক বিধ্বংসী বন্যা এমন এক ঝুঁকির বার্তা সামনে নিয়ে এসেছে, যা কোনো ভৌগোলিক সীমান্ত চেনে না।
হিমালয় থেকে উৎপন্ন হওয়া একাধিক নদী ভারত ও নেপালের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেপালে বন্যা হওয়া আর ভারতে তা দুর্যোগে রূপ নেওয়ার সমীকরণটি 'পাহাড় থেকে পানি নিচে গড়িয়ে পড়ার' মতো যতটা সাধারণ মনে হয়, বাস্তবে তার চেয়েও অনেক বেশি জটিল বিষয়।
হিমালয় পর্বতমালার বুক চিরে নেমে আসা কোনো কোনো নদীর প্লাবন— স্রোতের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর আর ধ্বংসাবশেষ বয়ে আনে। আবার অনেক বন্যা সমতলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তাদের তাণ্ডবরূপ হারিয়ে সাধারণ বন্যায় রূপ নেয়।
আর সেই পানি ভারতে গিয়ে বড় দুর্যোগ সৃষ্টি করবে কি না, তা কেবল নেপালে কতটা বৃষ্টি হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে না; বরং ভারতের সীমানার ভেতরের বৃষ্টিপাত, নদীর পানির স্তর, বাঁধের অবস্থা, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপরও অনেকাংশে নির্ভর করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপালের বন্যা ভারতের জন্য একটি কড়া সতর্কবার্তা। এটি কেবল উত্তর থেকে দক্ষিণে পানি প্রবাহিত হওয়ার বিষয় নয়, বরং দুটি দেশই যৌথ এবং ক্রমেই অস্থির হয়ে ওঠা হিমালয় নদী ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
নেপাল থেকে কতগুলো নদী ভারতে প্রবাহিত হয়?
নেপালে ৬ হাজারের বেশি ছোট-বড় নদী ও প্রবাহ রয়েছে, যার অধিকাংশ দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে ভারতে গঙ্গা নদীতে গিয়ে মিশেছে।
এখানে মূলত তিনটি বড় নদী ব্যবস্থা আধিপত্য বিস্তার করে আছে: পূর্বে কোশী, মধ্যাঞ্চলে গণ্ডকী (ভারতে গণ্ডক নামে পরিচিত) এবং পশ্চিমে কর্ণালী (ভারতে ঘাগরা নামে পরিচিত)। এছাড়া পশ্চিম সীমান্তে রয়েছে মহাকালী (সারদা) নদী।
এর বাইরে শিবালিক বা চুরে পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন বাগমতী, কমলা, রাপ্তি ও বাবাইয়ের মতো ডজনখানেক ছোট নদী—অত্যন্ত দ্রুত ও পরোক্ষভাবে বন্যা সৃষ্টি করতে পারে। কারণ এই নদীগুলোর অববাহিকা তুলনামূলক ছোট এবং খাড়া।
আন্তর্জাতিক পর্বত গবেষণা সংস্থা 'ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট' (আইসিআইএমওডি)-এর হাইড্রোলজিস্ট মনীশ শ্রেষ্ঠ জানান, নেপাল থেকে প্রায় সাত থেকে নয়টি প্রধান নদী ভারতের সমতল ভূমিতে গিয়ে মেশে, যা মূলত ভারতে বন্যার জন্য দায়ী।
ভারতের সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশনও কোশী, গণ্ডক, বাগমতী ও ঘাগরা নদীকে অন্যতম প্রধান আন্তঃসীমান্ত নদী হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
ভারতের কোন কোন রাজ্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?
ঝুঁকির বিচারে ভারতের বিহার রাজ্য সবার ওপরে। রাজ্যটির উত্তর অঞ্চলের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এলাকা সরকারিভাবে বন্যাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত।
বিহারকে প্লাবিত করা প্রায় সব প্রধান নদীর উৎপত্তিই নেপালে। এর মধ্যে 'বিহারের অভিশাপ' হিসেবে পরিচিত কোশী নদী সবচেয়ে কুখ্যাত। এর পরেই রয়েছে গণ্ডক, বাগমতী ও কমলা নদী।
তবে এই ঝুঁকি কেবল বিহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
উত্তর প্রদেশের পূর্ব অংশও ঘাগরা, রাপ্তি ও গণ্ডক নদীর বন্যায় চরম ঝুঁকিপূর্ণ। গোরখপুর, বাহরাইচ, লখিমপুর খেরি ও শ্রাবস্তীর মতো জেলাগুলো নিয়মিত এই প্লাবনের শিকার হয়।
এছাড়া উত্তরাখণ্ড রাজ্য মহাকালী-শারদা নদীর পানি বহন করে, আর উত্তরবঙ্গ পায় মেচী ও মহানন্দা নদীর পানি।
আইসিআইএমওডি-এর অপর হাইড্রোলজিস্ট প্রদীপ মান ডাঙ্গোল বলেন, "বন্যার মাত্রার দিক থেকে বিহার শীর্ষে থাকলেও উত্তর প্রদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে, যা অনেক সময় সংবাদমাধ্যমে আড়ালেই থেকে যায়।"
নেপালে বন্যা হলে ভারতের ভাগ্য কিসের ওপর নির্ভর করে?
জলবিজ্ঞানীদের মতে, এই প্রক্রিয়াটিকে একটি তিন ধাপের শৃঙ্খল হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রথমত, বৃষ্টিপাত: বৃষ্টি কোথায় হচ্ছে এবং কতটা তীব্রভাবে হচ্ছে। ভারতে পৌঁছানো বন্যার তোড় প্রায়শই উঁচু হিমালয় থেকে নয়, বরং নীচু শিবালিক, চুরে ও তরাই অঞ্চল থেকে তৈরি হয়। সেখানে খাড়া ও ছোট অববাহিকায় ভারী মৌসুমি বৃষ্টিপাত হয়।
দ্বিতীয়ত, নদী: নেপালের নদীগুলো পাহাড় থেকে সমতলে নামার মুখে তাদের ঢালে একটি তীব্র পরিবর্তন দেখে। ফলে নদীগুলো তাদের সঙ্গে আনা পলিমাটি ফেলে দেয় এবং একাধিক আঁকাবাঁকা ধারায় বিভক্ত হয়ে সমতলে ছড়িয়ে পড়ে।
তৃতীয়ত, ভারতে প্রবেশের পর এই বন্যা কতটা ভয়াবহ হবে, তা নির্ভর করে সেখানে পানির অবস্থা কেমন তার ওপর—যেমন ভারতের ভেতরের বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, গঙ্গায় পানির স্তর কতটা পূর্ণ, বেড়িবাঁধ ও ব্যারেজের স্থায়িত্ব এবং রাস্তা, রেলপথ বা বসতির কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা কতটা বাধাগ্রস্ত ইত্যাদির ওপর।
সুতরাং, সীমান্তে আসা পানির সর্বোচ্চ প্রবাহ মূলত নেপালের বৃষ্টির ওপর নির্ভর করলেও— ভারতে বন্যার তীব্রতা কতটা হবে, তা নির্ধারণ করে ভারতের ভেতরের অবকাঠামোগত ও পরিবেশগত পরিস্থিতি।
২০০৮ সালের কোশী ট্র্যাজেডি ও ভুল ধারণার অবসান
২০০৮ সালের কোশী নদীর বিপর্যয়টি এর একটি বড় উদাহরণ।
নেপালে কোশী নদীর বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর সেবছর বিহারে প্রায় ৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। তবে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এটি নদীতে কোনো চরম বা অস্বাভাবিক মাত্রার পানি প্রবাহের ঘটনা ছিল না।
ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি) কানপুরের আর্থ সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক রাজীব সিনহার মতে, নদীটির সাধারণ পানি বহন ক্ষমতার মাত্র দশ ভাগের এক ভাগ পানি ছিল সেই সময়ে। তবে কয়েক দশক আগে নির্মিত এবং সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কারণেই সেই বিপর্যয় ঘটেছিল।
অধ্যাপক সিনহা বলেন, "১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে তৈরি বাঁধগুলো সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। ক্ষয়ে ক্ষয়ে সেগুলোতে দুর্বল পয়েন্ট তৈরি হয়েছিল। নদীর স্রোত সেই দুর্বল জায়গা দিয়ে বাঁধ ভেঙে ভারতের এমন সব এলাকায় ঢুকে পড়েছিল, যেখানে হয়তো গত ১০০ বছরেও কোনো বন্যা হয়নি।"
আইসিআইএমওডি-এর দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কর্মকর্তা সাশ্বত স্যানাল যোগ করেন, এই ব্যর্থতা ছিল "কাঠামোগত (স্ট্রাকচারাল), হাইড্রোলজিক্যাল বা পানি প্রবাহ সংক্রান্ত নয়।"
বাঁধের জলকপাট খুলে দেওয়ার ভুল ধারণা
বিজ্ঞানীদের মতে, ভারতে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো নেপাল ইচ্ছা করে ভারতে পানি "ছেড়ে দেয়"।
বাস্তবতা হলো, নেপালে এমন বড় কোনো জলাধার বা রিজার্ভার নেই যা দিয়ে পানি আটকে রাখা বা ইচ্ছেমতো ছেড়ে দেওয়া সম্ভব। তাদের প্রধান কুলেখানি বাঁধের ধারণক্ষমতা এক ঘন কিলোমিটারের দশ ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম। ফলে সেখানে পানি আটকে রেখে পরে ছেড়ে দেওয়ার মতো কোনো সুযোগই নেই।
এমনকি কোশী ও গণ্ডক ব্যারেজ পরিচালনাকারী সংস্থাও ভারত সরকারের। সীমান্তে যে বন্যার পানি আসে, তা প্রধানত উজান থেকে হওয়া বৃষ্টির কারণে আসে—নেপাল জলকপাট খুলে দিয়েছে বলে নয়।
তবে এর পেছনে একটি সত্যতা রয়েছে: উত্তর বিহার ও উত্তর প্রদেশের পূর্বাঞ্চলকে প্লাবিত করা পানির একটি বড় অংশ আসে নেপালের বৃষ্টিপাত থেকে। তাই নেপালের বৃষ্টিই ভারতে পৌঁছানো বন্যার সময় ও মাত্রা নির্ধারণ করে। গঙ্গা নদীর গড় বার্ষিক প্রবাহের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে নেপাল থেকে।
সাশ্বত স্যানাল বলেন, "বিষয়টিকে কেবল কারণ ও দোষারোপের গল্প হিসেবে দেখাটা অতি সরলীকরণ। বৃষ্টিপাত মানুষের নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই প্রভাব উভয়মুখী। ভারতের সুরক্ষার জন্য নির্মিত বেড়িবাঁধ ও ব্যারেজের কারণে অনেক সময় নদীর পানির স্তর বেড়ে যায় এবং নেপালের তরাই অঞ্চলে উল্টো পলি ও পানি জমে বন্যা তৈরি হয়—যা নেপালের দীর্ঘদিনের একটি বড় দুর্ভোগের কারণ।
ভারতের আসল দুশ্চিন্তার জায়গা কোথায়?
অধ্যাপক রাজীব সিনহা বলেন, "ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত, তবে কেবল নেপালের কোশী নদীর জন্য নয়।"
বিশেষজ্ঞদের মতে, আসল সতর্কবার্তা লুকিয়ে রয়েছে গোটা হিমালয় পর্বতমালায় যা ঘটছে তার মধ্যে—যেখানে পানি, পাথর, বরফ এবং বিপুল পরিমাণ পলি বা বালি হঠাৎ করে একসাথে মিশে তাণ্ডব সৃষ্টি করছে।
সিনহা বলেন, নেপালের সাম্প্রতিক এই দুর্যোগ ভারতের গত কয়েক বছরের কিছু ভয়াবহ ঘটনার সাথে হুবহু মিলে যায়—যেমন ২০২১ সালে উত্তরাখণ্ডের চামোলি বিপর্যয় এবং ২০২৫ সালের ধারালী বিপর্যয়। নেপালের ঘটনাটি ছিল তার চেয়েও "প্রায় ৫ থেকে ১০ গুণ বড়"।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, "মূল বিষয়টি হলো, এগুলো সাধারণ পানিকেন্দ্রিক বন্যা নয়।"
সাধারণ বন্যা মূলত পানির স্রোত দিয়ে হয়। কিন্তু যখন ভারী বৃষ্টিপাত, গলে যাওয়া বরফ বা আকস্মিক ঢল বিপুল পরিমাণ পলিমাটির সাথে মিশে যায়, তখন এটি অত্যন্ত শক্তিশালী এক তরল কাদাস্রোতে (স্লারি) রূপ নেয়, যা পথের সবকিছু ধূলিসাৎ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
২০২১ সালের চামোলি ট্র্যাজেডিতে এটি দেখা গিয়েছিল, যখন হিমালয়ের একটি বিশাল বরফখণ্ড ভেঙে পড়ে পাহাড়ি ঢল তৈরি করেছিল। সেই দুর্ঘটনায় প্রায় ২০০ মানুষের মৃত্যু হয় এবং জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২০২৫ সালে উত্তরাখণ্ডের ধারালীতেও একই দৃশ্য দেখা যায়, যেখানে আকস্মিক বন্যায় গ্রামের পর গ্রাম মিটারের পর মিটার কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। বিশ্বব্যাপী গড়ের চেয়ে এই অঞ্চলে তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। উষ্ণ বায়ুমণ্ডল বেশি জলীয় বাষ্প ধরে রাখতে পারে, যার ফলে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে স্বল্প সময়ে অনেক বেশি ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে।
এছাড়া পারমাফ্রস্ট বা জমাট বাঁধা মাটি, পাথর ও পলি গলে যাওয়ার কারণে হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণ এবং শিলা-বরফের ধসের ঝুঁকি বাড়ছে। এর ফলে পলিযুক্ত দ্রুতগতির বন্যা তৈরি হচ্ছে, যা আগে থেকে অনুমান করা প্রায় অসম্ভব।
আর এসব চরম ঘটনা নদীখাতে পলি জমিয়ে পানির ধারণক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে—যা সীমান্তরেখার দুই পাশেই সমান বিপদ ডেকে আনছে।
