কাজের চাপ এড়াতে তদন্ত ছাড়াই নিখোঁজ ব্যক্তিদের মামলা বন্ধ করে দিতেন দক্ষিণ কোরিয়ার পুলিশ কর্মকর্তা
কাজের বাড়তি চাপ এড়াতে তদন্ত না করেই নিখোঁজ সংক্রান্ত মামলা বন্ধের কথা স্বীকার করেছেন দক্ষিণ কোরিয়ার একজন পুলিশ কর্মকর্তা।
বু নামের ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে চলতি মাসের শুরুর দিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে জনপ্রিয় পর্যটন দ্বীপ জেজুতে কয়েকজনের নিখোঁজের মামলা নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ করে দেওয়া এবং নিখোঁজদের পরিবারের কাছে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
ব্যাপক জনরোষের মুখে পুলিশ পরবর্তীতে দ্বীপে নিখোঁজ কয়েকজনের সন্ধানে নতুন করে অভিযান শুরু করে এবং সম্প্রতি চারটি মরদেহ উদ্ধার করে। এমন এক সময়ে এই কেলেঙ্কারির ঘটনাটি ঘটল যখন সরকার পুলিশকে আরও বেশি ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে বিষয়টিতে প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং পুলিশ বিভাগে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হয়েছেন।
মঙ্গলবার জেজুর প্রাদেশিক পুলিশ জানায়, বু দুটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা জালিয়াতি করে বন্ধ করে দেন। তার বিরুদ্ধে সরকারি ইলেকট্রনিক রেকর্ড বিকৃতি, সরকারি দায়িত্বে ব্যাঘাত ঘটানো এবং কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগ আনা হয়েছে। উভয় মামলাতেই বু দাবি করেন, তিনি নিখোঁজ ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ করেছেন এবং পরবর্তীতে তাদের অবস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই মামলাগুলো বন্ধ করে দেন।
পুলিশ এক বিবৃতিতে জানায় তদন্ত চলাকালে বু বলেন, 'নিখোঁজ ব্যক্তিরা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় বিষয়টি সহজভাবে নিয়েছিলাম। মামলা বন্ধ না করলে অনেক ঝামেলার কাজ জমা হতো, আর দায়িত্ব হস্তান্তরের চাপ এড়াতেই আমি ভুয়া তথ্য দিয়ে মামলা বন্ধ করে দিই।' এসব মামলার মধ্যে একটি ছিল ৩৭ বছর বয়সী জ্যাং মি-রান নামের এক নারীর, যিনি গত মে মাসে নিখোঁজ হন এবং তার প্রেমিক বিষয়টি পুলিশকে জানান।
সেই সময় বু মি-রান-এর প্রেমিককে জানিয়েছিলেন যে তিনি মি-রান এর সাথে কথা বলেছেন এবং তিনি পুলিশের সাথে দেখা করতে কিংবা প্রেমিকের সাথে যোগাযোগ রাখতে চান না। কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে জানায়, এটি ছিল বু-এর সম্পূর্ণ কাল্পনিক গল্প। কর্তৃপক্ষের মতে, বু এই ভুয়া তথ্য ইনপুট করেন সিস্টেমে এবং কেসটি বন্ধ করার আগে মি-রান সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন বলেও মিথ্যা রেকর্ড তোলেন।
গত সপ্তাহে জেজুতে একটি তালগাছ বাগানের কাছ থেকে মি-রান এর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অপর এক ঘটনায়, জুলাই মাসে ৬০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি নিখোঁজ হলে বু একইভাবে মিথ্যা দাবি করেন যে তিনি ওই ব্যক্তির সাথে কথা বলেছেন এবং তিনি কারও সাথে যোগাযোগ রাখতে চান না।
চলতি মাসের শুরুর দিকে সেই ব্যক্তিকেও মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পুলিশ আরও জানায়, বু সম্ভবত আরও ২৫টি নিখোঁজ সংক্রান্ত মামলা একইভাবে অসময়ে বন্ধ করে দিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে; যদিও পরবর্তীতে সেগুলোর কয়েকটিতে নিখোঁজ ব্যক্তিরা জীবিত ও ঝুঁকিমুক্ত আছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় সহিংস অপরাধ বিরল হলেও দেশটিতে আত্মহত্যার হার বিশ্বে অন্যতম সর্বোচ্চ। দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রতি বছর ৭০ হাজারেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও, তাদের মধ্যে ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই এক মাসের মধ্যে সমাধান হয়েছে বলে চিহ্নিত করা হয়।
প্রসিকিউটরদের রাজনীতিতে প্রভাব খর্ব করার উদ্দেশ্যে তদন্তের পূর্ণ ক্ষমতা তাদের কাছ থেকে পুলিশের কাছে হস্তান্তরের জন্য দেশটির সরকার সম্প্রতি আইন পাস করে। তবে সরকারের এই পদক্ষেপ সাধারণ জনগণের কাছে জনপ্রিয় হয়নি, কারণ তারা বহু বছর ধরে পুলিশের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনেছেন।
সম্প্রতি তীব্র সমালোচনার মুখে প্রেসিডেন্ট লি পুলিশ বিভাগে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট লি বলেন, 'এটি অত্যন্ত দুঃখজনক যে কতিপয় কাদা মাছের (যারা পুরো পুকুরের পানি ঘোলা করে) মতো চরিত্রের জন্য, অধিকাংশ পরিশ্রমী পুলিশ কর্মকর্তার সম্মান ও সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।'
