ইরান যুদ্ধের জেরে ইউরোপে মার্কিন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ‘সংকটজনক পর্যায়ে’ পৌঁছেছে
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থার মজুত 'সংকটজনক পর্যায়েরও নিচে' নেমে গেছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের একজন কর্মকর্তা ও ন্যাটোর একজন কর্মকর্তা। এতে ন্যাটোর জোটভুক্ত দেশগুলো রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দিয়েছে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টরের মজুত নিয়ে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র রাশিয়ার উচ্চগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসে ব্যবহার করা হয়।
ইউরোপে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনী ও ন্যাটোর বিভিন্ন সদস্যদেশের কাছে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত এখন খুবই কম বলে জানিয়েছেন ওই দুই কর্মকর্তা। সংবেদনশীল সামরিক বিষয় নিয়ে কথা বলার অনুমতি না থাকায় তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
উদাহরণ হিসেবে রাশিয়া যদি কোনো সামরিক সদর দপ্তর বা বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তাহলে ন্যাটোও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের সংকটে থাকা ইউক্রেনের মতো পরিস্থিতিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ওই মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে ন্যাটোকে হয়তো 'কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করার পর্যাপ্ত সক্ষমতা ছাড়াই একের পর এক হামলা সহ্য করতে হবে'।
ইউরোপে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর কাছে সম্ভাব্য দীর্ঘস্থায়ী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকানোর মতো পর্যাপ্ত প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র 'নিশ্চিতভাবেই' নেই বলে জানিয়েছেন ওই মার্কিন কর্মকর্তা। এমনকি একটি মাত্র ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বা লক্ষ্যচ্যুত কোনো রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর ক্ষেত্রেও তাদের সক্ষমতা 'খুবই সীমিত'।
ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তের প্রভাব যে অন্য জায়গাতেও পড়ছে, এ ঘটনা তারই উদাহরণ। শুক্রবার এই যুদ্ধের ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে।
ইউরোপে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রের কিছু মজুত মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের উপসাগরীয় মিত্ররা ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে প্যাট্রিয়টসহ বিপুলসংখ্যক প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।
ইরানের এসব হামলার কয়েকটিতে মার্কিন সেনাসদস্য নিহত ও আহতও হয়েছেন।
রাশিয়া খুব শিগগির ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাবে—এমন আশঙ্কা এখনো নেই। তবে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়াকে ন্যাটোতে হামলা না করার বিষয়ে সতর্ক করতে চলতি সপ্তাহে মস্কো সফর করেন সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিকেরা জানতে চান, র্যাটক্লিফ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে এ বার্তা দিয়েছেন কি না। জবাবে ট্রাম্প সরাসরি কিছু না জানিয়ে বলেন, 'আমি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাই না। তবে তারা হামলা করবে না।'
ইউরোপীয় ও ন্যাটোর কর্মকর্তাদের ধারণা, ২০৩০ সালের মধ্যে রাশিয়া ন্যাটোভুক্ত কোনো দেশে হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। তত দিনে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও আবার বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এর মধ্যে ইউক্রেনের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ ইউরোপে রাশিয়ার সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতাকে সীমিত করতে পারে। কারণ, একই সময়ে দুই ফ্রন্টে আকাশযুদ্ধ চালানো মস্কোর জন্য কঠিন হবে।
ন্যাটোর ঊর্ধ্বতন সামরিক মুখপাত্র মার্কিন সেনাবাহিনীর কর্নেল মার্টিন ও'ডনেল অবশ্য ইউরোপে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত 'সংকটজনক পর্যায়েরও নিচে' নেমে গেছে—এমন দাবি নাকচ করেছেন। তিনি বলেন, ন্যাটোর নিজেদের রক্ষা এবং ইউক্রেনকে সহায়তা করার মতো পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র আছে।
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেলও মার্কিন অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার দাবি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, 'মার্কিন অস্ত্রের ঘাটতির দাবি মিথ্যা। প্রেসিডেন্ট যে সময় ও স্থানে চান, হামলা চালানোর জন্য আমাদের প্রয়োজনীয় সবকিছুই আছে।'
তবে ইউক্রেন রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে আরও প্যাট্রিয়ট চেয়ে আসছে। কিয়েভ বলছে, রাশিয়ার আধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে কার্যকরভাবে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়টই সক্ষম।
লন্ডনের সামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক এড আর্নল্ড বলেন, ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট সরবরাহ পরিকল্পিত ছিল। তবে ইরান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে অপ্রত্যাশিতভাবে বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ফলে মজুত দ্রুত কমে গেছে।
মজুত কমে যাওয়ায় ইউরোপের বিকল্পও কম
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে গেলে রাশিয়ার আধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর বিকল্প খুবই সীমিত হয়ে যাবে। রাশিয়া সস্তা ড্রোনের বড় বহরের সঙ্গে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করে দিতে পারে।
ইউক্রেন ও তার কিছু মিত্র ধীরগতির ড্রোন ভূপাতিত করতে অন্য ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। তবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের গতির পাঁচ গুণের বেশি গতিতে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হান্তে সক্ষম। তাই সেগুলো ঠেকানোর জন্য সময় খুব কম থাকে।
প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ শনাক্ত ও হিসাব করে কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। তবে একটি প্যাট্রিয়ট ব্যাটারি শুধু সীমিত এলাকা, যেমন একটি ছোট সামরিক ঘাঁটি রক্ষা করতে পারে; পুরো শহর নয়।
ফ্রান্স ও ইতালির 'এসএএমপি/টি এনজি' আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি বিকল্প হতে পারে। তবে এর নতুন সংস্করণ এখনো যুদ্ধে পরীক্ষা করা হয়নি এবং বর্তমান সংস্করণের পাল্লা প্যাট্রিয়টের চেয়ে কম। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের যুদ্ধজাহাজও ভ্রাম্যমাণ আকাশ প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে, তবে সেগুলো লক্ষ্যবস্তু থেকে দূরে থাকতে পারে এবং হামলায় ডুবে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
ইরান যুদ্ধে ব্যাপকভাবে কমেছে প্যাট্রিয়টের মজুত
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মজুত থেকে ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট দেওয়া হচ্ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিএসআইএসের হিসাব অনুযায়ী, বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেনকে প্রায় ৬০০টি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর দিয়েছিল।
তবে সবচেয়ে বেশি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার হয়েছে ইরান যুদ্ধে। সিএসআইএসের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২ হাজার ৩৩০টি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের মধ্যে ৬৫ শতাংশ বা প্রায় ১ হাজার ৫০০টি এ যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে।
এ বছর ইউরোপের জন্য নির্ধারিত ক্ষেপণাস্ত্রসহ প্রায় ৬০০টি প্যাট্রিয়ট তৈরি হওয়ার কথা রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে ২ হাজার প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ন্যাটো জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরে জার্মানিতে ইউরোপের প্রথম প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কারখানা চালু হওয়ার কথা। আগামী বছরের শুরুতে সরবরাহ শুরু হতে পারে। প্রথমে জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, রোমানিয়া ও স্পেনের মতো আগে থেকে অর্ডার দেওয়া দেশগুলো এসব ক্ষেপণাস্ত্র পেতে পারে।
তবে বর্তমানে জার্মানির মতো কিছু দেশ ব্যয়বহুল প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা কিনলেও সেগুলো থেকে ছোড়ার মতো পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র নেই বলে মন্তব্য করেছেন গবেষক এড আর্নল্ড। জার্মানির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অবশ্য ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
রাশিয়ারও সীমাবদ্ধতা আছে
আর্নল্ডের মতে, ইউক্রেনে প্রায় প্রতি রাতে হামলা চালানোর পাশাপাশি ন্যাটোর কোনো লক্ষ্যবস্তুতে দীর্ঘ সময় ধরে বড় আকাশ হামলা চালানোর সক্ষমতা সম্ভবত রাশিয়ার নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন রাশিয়ার ভেতরে হামলা চালিয়েছে এবং এতে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা ফুটে উঠেছে। এতে ন্যাটোর বিরুদ্ধে কোনো উসকানিমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে পুতিনকে দ্বিতীয়বার ভাবতে হতে পারে।
আর্নল্ড বলেন, 'অস্বস্তিকর সত্য হলো, সম্ভবত আমাদের সবচেয়ে ভালো আকাশ প্রতিরক্ষা হলো রাশিয়ার নিজস্ব সীমাবদ্ধতা।'
