আনুষ্ঠানিকভাবে কোরীয় যুদ্ধ শেষ করতে উত্তর কোরিয়াকে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দক্ষিণ কোরিয়ার
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং তার উত্তরের প্রতিবেশীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের অবসান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে হয়নি।
লি জে-মিয়ং দুই দেশের দে-ফ্যাক্টো বা কার্যত সীমান্ত, যা ডিমিলিটারাইজড জোন বা সামরিক প্রযুক্তিমুক্ত অঞ্চল নামে পরিচিত, তার চারপাশে উত্তেজনা বা সংঘাত এড়াতে একটি "বহুমুখী নিরাপত্তা ব্যবস্থার" পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতার অগ্রগতি থামানোর বাস্তবসম্মত উপায় নিয়েও আলোচনা করার প্রস্তাব দিয়েছেন।
উত্তর কোরিয়া নিয়মিত এমন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়ে আসছে, যেগুলো পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম। দক্ষিণ কোরিয়া ও কাছের দেশ জাপানে এসব পরীক্ষাকে ভয় দেখানো এবং নিজেদের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা হিসেবে দেখা হয়েছে।
কোরীয় উপদ্বীপের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত ১৯৫৩ সালে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের পর কার্যত স্থবির হয়ে আছে।
তারা কোনো শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেনি। ফলে তখন থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে দুই দেশ এখনো পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধে রয়েছে।
এরপরের কয়েক দশকে দুই দেশের মধ্যে অসামরিকীকৃত অঞ্চল বরাবর সংঘর্ষ ও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি আবর্জনা ও প্রচারসামগ্রী বহনকারী বেলুন পাঠানোসহ বিভিন্ন উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য দুই পক্ষই একে অপরকে দায়ী করেছে।
লি জে মিয়ং গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট হন। তার পূর্বসূরি ইউন সুক ইওল সামরিক আইন জারির চেষ্টা করার কারণে অভিশংসিত হওয়ার পর তিনি ক্ষমতায় আসেন। ইউন সুক ইওলের শাসনামলে উত্তর কোরিয়া ও তার মিত্র চীনের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল। লি সেই সম্পর্কের বরফ গলানোর চেষ্টা করছেন।
জাপানের শাসন থেকে কোরীয় উপদ্বীপের মুক্তির স্মরণে আয়োজিত মুক্তি দিবসের একটি অনুষ্ঠানে লি বলেন, 'আসুন, একে অপরকে হুমকি দেওয়ার মানসিকতা দূরে সরিয়ে রাখি এবং সরাসরি সংশ্লিষ্ট পক্ষ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা এই যুদ্ধের অবসান ঘটাতে আলোচনা শুরু করি।'
লি আশা প্রকাশ করেন, দুই দেশ 'শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও পারস্পরিক প্রবৃদ্ধির জন্য মুখোমুখি বসবে'। তিনি আরও বলেন, এমন একটি বৈঠক উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতার অগ্রগতি থামানোর 'কার্যকর উপায়' নিয়ে আলোচনার একটি মঞ্চ হিসেবে কাজ করতে পারে।
লি জে মিয়ংয়ের এই প্রস্তাবের বিষয়ে উত্তর কোরিয়া এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। দেশটির কর্তৃত্ববাদী শাসনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বরং উত্তর কোরিয়ার নিজস্ব মুক্তি দিবসের স্মরণানুষ্ঠানে কিম জং উনের পুষ্পস্তবক অর্পণ ও গার্ড অব অনারের গ্রহণের খবর প্রচার করেছে।
এর আগে লির আলোচনায় বসার বিভিন্ন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে পিয়ংইয়ং। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের একটি বহর নির্মাণের চুক্তির সমালোচনা করেছে এবং দুই মিত্র দেশের যৌথ সামরিক মহড়ারও নিন্দা জানিয়েছে।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন ঘোষণা করেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে পুনরেকত্রীকরণ আর সম্ভব নয়।
কিম বলেন, সংবিধানে সংশোধন আনা উচিত, যাতে উত্তর কোরিয়ার জনগণকে শেখানো হয় যে দক্ষিণ কোরিয়া তাদের 'প্রধান শত্রু এবং অপরিবর্তনীয় প্রধান প্রতিপক্ষ'।
সে সময় এক ভাষণে তিনি আরও বলেন, কোরীয় উপদ্বীপে যুদ্ধ শুরু হলে উত্তর কোরিয়ার লক্ষ্য হওয়া উচিত দক্ষিণ কোরিয়াকে 'দখল করা', 'পুনর্দখল করা' এবং নিজেদের ভূখণ্ডের সঙ্গে 'একীভূত করা'।
উত্তর কোরিয়া ২০২২ সালে নিজেকে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে এবং তাদের হাতে থাকা পারমাণবিক অস্ত্র কখনো পরিত্যাগ করবে না বলে অঙ্গীকার করে। ধারণা করা হয়, দেশটির কাছে কয়েক ডজন পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে।
লি এর আগে বলেছেন, পিয়ংইয়ং প্রতি বছর আরও ১৫ থেকে ২০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরি করছে। গত বছর বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কিম জং উনের মধ্যে এমন কোনো চুক্তি হলে তিনি তা সমর্থন করবেন, যার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন স্থগিত করা যায়।
পশ্চিমা বিশ্বের নেতাদের মধ্যে ট্রাম্পই একমাত্র নেতা, যিনি কিমের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে এই বৈঠক হয়েছিল।
হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর ট্রাম্প অবশ্য অন্য অঞ্চলগুলোর দিকে মনোযোগ দিয়েছেন। তবে গত আগস্টে তিনি বলেছিলেন, 'উপযুক্ত সময় হলে' তিনি আবার কিমের সঙ্গে বৈঠক করতে চান।
তবে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত থাকার আরেকটি ইঙ্গিত হিসেবে উত্তর কোরিয়া মঙ্গলবার সমুদ্রে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। নির্ধারিত যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া যৌথ সামরিক মহড়ার মাত্র কয়েক দিন আগে এই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হলো। এ নিয়ে চলতি বছরে উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা দাঁড়াল ১১টিতে।
