রেফারিদের জন্য ‘যৌন বিনোদন’ কিনে দিত দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন, দেশজুড়ে তোলপাড়
২০১০-এর শুরুর দিকে ম্যাচের আগে বা পরে বিদেশি রেফারিদের জন্য যৌনসেবা কিনতে হাজার হাজার ডলার খরচ করেছিল দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা। সম্প্রতি এমন বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছে সংস্থাটি।
কোরিয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনে (কেএফএ) দুর্নীতির তদন্ত শেষে ২০১৬ সালে এই প্রতিবেদন প্রথম তৈরি করেছিল দেশটির সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। তবে গত সপ্তাহ পর্যন্ত তা গোপনই ছিল। দক্ষিণ কোরিয়ার চ্যানেল ও সিএনএনের সহযোগী প্রতিষ্ঠান জেটিবিসি' প্রতিবেদনটি হাতে পেয়ে ফাঁস করার পর এ তথ্য প্রকাশ্যে আসে।
সিএনএন পরে আইনপ্রণেতা জিন সান-মি-র অফিস থেকে প্রতিবেদনটি সংগ্রহ করে। এতে দেখা যায়, ২০১১-২০১২ অন্তত আটবার দক্ষিণ কোরিয়া সফরে আসা বিদেশি রেফারি ও ফুটবল কর্মকর্তাদের ম্যাসেজ পার্লারে 'যৌন বিনোদনের' ব্যবস্থা করেছিল কেএফএ। এর মধ্যে তিনটি ম্যাচ ছিল বিশ্বকাপ ও অলিম্পিক গেমসের বাছাইপর্বের।
শনিবার নিজেদের ওয়েবসাইটে দেওয়া বিবৃতিতে কেএফএ বলেছে, 'সংসদীয় শুনানি, তল্লাশি ও জব্দের অভিযান থেকে শুরু করে এক দশকেরও বেশি সময় আগের ঘটনা নিয়ে মিডিয়া রিপোর্ট—যা সম্পর্কে অ্যাসোসিয়েশনের অনেক সদস্যই জানতেন না—এমন নানা ইস্যুতে তৈরি হওয়া উদ্বেগের জন্য আমরা গভীরভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।'
সংস্থাটি আরও দাবি করেছে, 'বর্তমানে কর্পোরেট কার্ডের এমন অপব্যবহার বা কোনো অনুচিত আচরণ একেবারেই ঘটছে না।'
সরকারি প্রতিবেদনে থাকা এক উদাহরণে ছিল ২০১১ সালের ২১ সেপ্টেম্বরের একটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। ওইদিন ২০১২ লন্ডন অলিম্পিকে জায়গা করে নেওয়ার লড়াইয়ে ওমানের মুখোমুখি হয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় দল। পরের দিন ভোরে ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা চার রেফারিকে একটি ম্যাসেজ পার্লারে নিয়ে যায় কেএফএ। সেখানে খরচ করা হয় ৭ লাখ ৬০ হাজার কোরিয়ান ওন (৫৩৬ ডলার)। পরে কেএফএ কর্মীরা খরচের হিসাব জমা দেওয়ার সময় মিথ্যা দাবি করে লেখেন, ম্যাচ-পরবর্তী মদ্যপানের জন্য এই অর্থ খরচ হয়েছে।
একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল ২০১২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে দক্ষিণ কোরিয়া ও কুয়েত ম্যাচের আগে। এরপর ২০১২ সালের ১৪ মার্চ কাতারের বিপক্ষে আরেকটি অলিম্পিক বাছাইপর্বের ম্যাচ চলাকালীন একজন রেফারি অ্যাসেসরের জন্যও এমন বিনোদনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
সব মিলিয়ে ওই এক বছরের ব্যবধানে 'যৌন বিনোদনের' পেছনে কেএফএ প্রায় ৫৬ লাখ কোরিয়ান ওন (প্রায় ৩ হাজার ৯৫০ ডলার) খরচ করেছিল বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব ক্ষেত্রে কেএফএ কর্মীরা অনেকবার ভুয়া খরচের হিসাব জমা দেন। আসল ঘটনা লুকিয়ে সেগুলোকে খাবার, পানীয় বা সাধারণ ম্যাসেজের খরচ হিসেবে উল্লেখ করেন তারা।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রেফারি বিনিময় কর্মসূচির অংশ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া সফরে আসা চাইনিজ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের তিন কর্মকর্তার জন্যও যৌনসেবা কিনে দিয়েছিল কেএফএ। সিএনএন এ বিষয়ে চীনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের বক্তব্য জানতে চেয়ে যোগাযোগ করেছে।
অভিযোগে নাম উঠে আসা অন্য রেফারিরা কোন দেশের নাগরিক, প্রতিবেদনে তার উল্লেখ নেই। তবে জাপানি মিডিয়ার খবর অনুসারে, চার জাপানি রেফারির এতে জড়িত থাকার অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে জাপান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (জেএফএ)। সিএনএন মন্তব্য জানতে চাইলে জেএফএ জানায়, তারা 'এখন বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে'।
দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের তদন্তে বলা হয়েছে: এটি প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ছিল। বেশিরভাগ সময় মূল কাজ একজন কর্মী করলেও পুরো বিষয়টি ঘটেছিল সংস্থার সায় নিয়েই। অডিট টিম কেএফএর ক্রেডিট কার্ডের হিসাবপত্র বিশ্লেষণের পাশাপাশি কর্মীদের সাক্ষাৎকারও নিয়েছে। সেখানে কর্মীরা বলেন, ম্যাসেজ পার্লারে খরচ করা অর্থের মধ্যে যৌনসেবার পেমেন্টও ছিল। তবে তাদের দাবি, বিদেশি রেফারিদের অনুরোধের কারণেই এই ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
ক্রেডিট কার্ডের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে প্রসিকিউটরের কার্যালয় সিদ্ধান্ত নেয়, মামলা চালানোর মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই। এরপর আর বিষয়টি নিয়ে এগোয়নি।
সিএনএন যোগাযোগ করলে ক্রীড়া মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করে, ঘটনাটি তারা পুনরায় তদন্তের জন্য পাঠিয়েছে এবং কেএফএকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
জেটিবিসির প্রতিবেদনে কেএফএ বলেছে, ২০১৩ সালে তারা 'ক্লিন কার্ড সিস্টেম' চালু করেছে। ফলে ম্যাসেজ পার্লার বা ক্যারাওকে বারের মতো জায়গাগুলোতে আর কর্পোরেট কার্ড ব্যবহারের সুযোগ নেই।
সংস্থাটি জেটিবিসিকে আরও বলেছে, রেফারিদের সহযোগিতার জন্য নিজেদের কর্মীদের বদলে এখন আলাদা লিয়াজোঁ অফিসার নিয়োগ করা হয়। যাতায়াত, থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি উপহার হিসেবে রেফারিদের শুধু রেড জিনসেং-এর মতো কিছু স্মারক দেওয়া হয়।
সিএনএন এ বিষয়ে কেএফএর মন্তব্যের জন্যও যোগাযোগ করেছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এমনিতেই তীব্র জনরোষের মুখে রয়েছে কেএফএ। ২০২৬ বিশ্বকাপে দলের হতাশাজনক পারফর্ম্যান্স ও সাবেক কোচকে নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে সংস্থাটির দিকে একের পর এক অভিযোগের আঙুল উঠছে।
গ্রুপ পর্ব থেকেই দল বিদায় নেওয়ার পর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিং ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দেন। পদত্যাগ করেন জাতীয় দলের কোচও।
