বিনামূল্যে বিশ্বের বৃহত্তম ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়েছে ভারত, এবার যুক্ত হচ্ছে ফি
বেশিরভাগ ভারতীয়র কাছে ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস (ইউপিআই) দিয়ে টাকা পরিশোধ করা এখন এতটাই স্বাভাবিক যে বিষয়টি প্রায় রুটিনে পরিণত হয়েছে। কিউআর কোড স্ক্যান করে কয়েকটি বাটনে চাপ দিলেই মুহূর্তের মধ্যে টাকা চলে যায়। কার্ড মেশিন বা নগদ টাকার প্রয়োজন হয় না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যবহারকারীর চোখে এর জন্য কোনো আলাদা খরচও নেই।
তবে সেই পরিস্থিতি এবার বদলাতে পারে। ব্যাংক ও পেমেন্ট কোম্পানিগুলোকে ইউপিআই লেনদেনে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ফি নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার পথ তৈরি করেছে ভারত। এর ফলে প্রায় এক দশক ধরে বিনা খরচে চালু থাকা ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসতে পারে।
ভারত সরকার এখনো ফি-এর হার বা কোন কোন লেনদেনে এটি প্রযোজ্য হবে, সেটি চূড়ান্ত করেনি। তবে আলোচনায় থাকা প্রস্তাব অনুযায়ী, বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তুলনামূলক বড় অঙ্কের ইউপিআই লেনদেনে ০.৩ থেকে ০.৫ শতাংশ পর্যন্ত 'মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট' বা এমডিআর আরোপ করা হতে পারে। এটি এমন একটি ফি, যা ইউপিআই লেনদেন প্রক্রিয়াকরণকারী ব্যাংক ও পেমেন্ট কোম্পানিকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে দিতে হয়।
সরকার বলছে, গ্রাহকদের ইউপিআই পেমেন্ট এবং ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির মধ্যে অর্থ স্থানান্তর আগের মতোই বিনা মূল্যে থাকবে। ব্যবসায়ীদের ওপর ফি আরোপ করা হলেও নির্দিষ্ট সীমার বেশি কিছু লেনদেনেই নামমাত্র হারে এটি নেওয়া হবে। ফলে অধিকাংশ ইউপিআই লেনদেনই বিনা মূল্যে থাকবে।
তবে ইউপিআই ব্যবহারে খরচ যুক্ত হলে এর জনপ্রিয়তা ও বিস্তৃত ব্যবহার কমে যাবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ, এর সঙ্গে জড়িত অর্থনৈতিক স্বার্থের পরিমাণ বিশাল। ২০১৬ সালে চালুর পর ইউপিআই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রিয়েল-টাইম পেমেন্ট নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শুধু জুলাই মাসেই ভারতে ইউপিআইয়ের মাধ্যমে ২ হাজার ৩৬০ কোটি লেনদেন হয়েছে। এসব লেনদেনের মোট মূল্য ছিল ২৯.৮৭ ট্রিলিয়ন রুপি, যা প্রায় ৩১৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। ইউপিআইয়ের বেশির ভাগ লেনদেন হয় ফিনটেক অ্যাপ ফোনপে ও গুগল পের মাধ্যমে।
সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে ইউপিআইয়ে মোট লেনদেন হয়েছে প্রায় ২৪ হাজার ১৬০ কোটি। ইউপিআই চালুর পর প্রথম পূর্ণ অর্থবছরের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার গুণ বেশি। বর্তমানে ৫৫ কোটির বেশি মানুষ ইউপিআই ব্যবহার করছেন। ভারতের বাইরেও ১১টি দেশে কোনো না কোনোভাবে ইউপিআই দিয়ে পেমেন্টের সুযোগ চালু হয়েছে।
ইউপিআই শুধু বড় একটি পেমেন্ট ব্যবস্থা নয়, এর কাঠামোটিও বেশ আলাদা। কোনো একটি অ্যাপ বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে পুরো ব্যবস্থা গড়ে না তুলে ভারত এমন একটি অভিন্ন ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরি করেছে, যেখানে একাধিক প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতা করতে পারে।
যেমন, গুগল পে ও ফোনপে গ্রাহক আকর্ষণে তীব্র প্রতিযোগিতা করলেও তাদের ব্যবহারকারীরা একই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে লেনদেন করতে পারেন। ইউপিআই পরিচালনা করে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল পেমেন্টস করপোরেশন অব ইন্ডিয়া (এনপিসিআই)। আর ব্যাংক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের জন্য বিভিন্ন সেবা পরিচালনা করে।
তবে ইউপিআইয়ের সাফল্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ (যদিও তুলনামূলক কম আলোচিত) অংশীদার হলো ব্যবসায়ীরা।
সবজি বিক্রেতা, ট্যাক্সিচালক বা ছোট দোকানদারকে ইউপিআই পেমেন্ট নিতে আলাদা কার্ড মেশিন কিনতে হয় না। একটি ছাপানো কিউআর কোডই যথেষ্ট। আর ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) নেওয়া হতো না বলে গ্রাহকের কাছ থেকে ইউপিআই পেমেন্ট নিতে তাদের তেমন কোনো আর্থিক বাধাও ছিল না।
অর্থনীতিবিদ অভিনব মাদারাম ও শ্যারন বুটোর নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ইউপিআইয়ের সাফল্যের জন্য শুধু ব্যবসায়ীদের মধ্যে এর ব্যবহার বাড়েনি; বরং ব্যবসায়ীদের ইউপিআই গ্রহণ করাই এর প্রসারে বড় ভূমিকা রেখেছে।
মাদারাম বলেন, 'আমাদের গবেষণা বলছে, ব্যবসায়ীদের মধ্যে ইউপিআই গ্রহণ শুধু এর প্রসারের ফল নয়, বরং ইউপিআইয়ের বিস্তারের অন্যতম প্রধান কারণ।' যেসব জেলায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে ইউপিআই ব্যবহারের হার বেশি ছিল, সেসব এলাকায় ইউপিআই ব্যবহারকারীর সংখ্যাও তুলনামূলক বেশি বেড়েছে।
তবে ইউপিআই ব্যবহারে ফি চালু হলে এর প্রভাব নির্ভর করবে কোন ব্যবসায়ী ও কোন ধরনের লেনদেনে এই ফি আরোপ করা হচ্ছে তার ওপর। মাদারামের মতে, শুধু বড় ব্যবসায়ী বা বেশি অঙ্কের লেনদেনে ফি বসানো হলে সামগ্রিক ব্যবহারে বড় প্রভাব নাও পড়তে পারে। কিন্তু ছোট ও অনানুষ্ঠানিক ব্যবসায়ীদের ওপর ফি আরোপ করা হলে, বিশেষ করে যেসব এলাকায় এখনো ইউপিআই গ্রহণের নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে, সেখানে এর বিস্তার ধীর হয়ে যেতে পারে।
বর্তমানে আলোচনায় থাকা একটি প্রস্তাবে ২ হাজার রুপির বেশি মূল্যের লেনদেনে বড় ব্যবসায়ীদের ওপর ফি আরোপের কথা বলা হচ্ছে। এতে ছোট ব্যবসা ও কম অঙ্কের লেনদেন ফি থেকে বাইরে থাকবে। ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান জেফরিসের হিসাবে, ২ হাজার রুপির বেশি লেনদেন মোট ব্যবসায়িক ইউপিআই লেনদেনের মাত্র প্রায় ৪ শতাংশ। তবে এসব লেনদেনের মোট আর্থিক মূল্যের প্রায় ৬৭ শতাংশ।
এ ধরনের ফি চালু হলে ব্যাংক ও পেমেন্ট কোম্পানিগুলোর জন্য বছরে প্রায় ১০০ কোটি ডলার পর্যন্ত নতুন রাজস্ব আসতে পারে বলে একটি হিসাব রয়েছে। একই সঙ্গে পাড়ার মুদি দোকান বা ছোট ব্যবসায়ীদের দৈনন্দিন কম অঙ্কের লেনদেনে এর প্রভাব খুব বেশি পড়বে না।
এর মাধ্যমে ইউপিআইয়ের একটি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠা সমস্যারও সমাধান হতে পারে। ব্যবহারকারীদের কাছে ইউপিআই বিনামূল্যের মনে হলেও, এর পরিচালনা ও লেনদেনের পেছনে আসলে খরচ রয়েছে।
ইউপিআই ব্যবস্থার পেছনে সার্ভার পরিচালনা, লেনদেন নিষ্পত্তি, জালিয়াতি শনাক্ত করা এবং সাইবার হামলা থেকে পুরো ব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখার মতো নানা খরচ রয়েছে। এতদিন সরকার এসব খরচের একটি অংশ ব্যাংক ও পেমেন্ট কোম্পানিগুলোকে দিয়ে আসছে। ফলে ইউপিআইকে অনেকটা জনসাধারণের অবকাঠামোর মতোই পরিচালনা করা হয়েছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা সম্প্রতি বলেছেন, 'এই খরচ কাউকে না কাউকে বহন করতে হবে।'
তবে ব্যবসায়ীদের ওপর ফি আরোপের বিষয়টি যত ছোট ব্যবসার দিকে যাবে, এর অর্থনৈতিক প্রভাব তত জটিল হবে। মাদারামের গবেষণায় ব্যবসায়ীরা মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) বা লেনদেন ফি নিয়ে ঠিক কতটা সংবেদনশীল, তার নির্দিষ্ট হিসাব দেওয়া হয়নি। তবে এতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ছোট অঙ্কের ফি মানেই এর প্রভাবও ছোট হবে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
মাদারাম বলেন, 'পাতলা মুনাফায় চলা ছোট ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে সামান্য ফিও তাদের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত ও প্রণোদনায় পরিবর্তন আনতে পারে।' তার মতে, ফি কীভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে, তার ওপর এর প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করবে। বড় কোনো খুচরা বিক্রেতার ওপর ফি আরোপের প্রভাব আর ছোট দোকান বা অনানুষ্ঠানিক ব্যবসায়ীর ওপর ফি আরোপের প্রভাব এক নয়।
এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইউপিআইয়ের অসাধারণ বিস্তার শুধু ভারতীয়দের হাতে স্মার্টফোন পৌঁছে যাওয়ার গল্প নয়। এর পেছনে লাখ লাখ ব্যবসার ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের সক্ষমতা এবং সেই পেমেন্ট গ্রহণে তাদের আর্থিক প্রণোদনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মাদারাম বলেন, 'ফি যদি শুধু বড় ব্যবসায়ী বা বেশি মূল্যের লেনদেনে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ব্যাপকভাবে ইউপিআই গ্রহণের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকবে।'
তিনি বলেন, 'বড় উদ্বেগের বিষয় হবে যদি শেষ পর্যন্ত কম উন্নত জেলাগুলোর ছোট ও অনানুষ্ঠানিক ব্যবসায়ীদের ওপরও ফি আরোপ করা হয়। কারণ এসব এলাকায় এখনো ব্যবসায়ীদের মধ্যে ইউপিআই গ্রহণের নেটওয়ার্ক সীমিত এবং ব্যবহারও পুরোপুরি পরিণত হয়নি।'
ভারতের সামনে এখন তাই একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ। ইউপিআইকে আর্থিকভাবে টেকসই করতে হবে; তবে এর ব্যাপক জনপ্রিয়তার পেছনে যে সুবিধাগুলো কাজ করেছে, সেগুলোও নষ্ট করা যাবে না।
এটি অসম্ভব কোনো কাজ নয়। ব্রাজিলের 'পিক্স'-ও একই ধরনের একটি সফল তাৎক্ষণিক পেমেন্ট ব্যবস্থা। ব্যক্তিগত ব্যবহারকারীদের জন্য এটি বিনামূল্যে হলেও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কম হারে ফি নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এর পরও এটি বিশ্বের দ্রুততম বাড়তে থাকা রিয়েল-টাইম পেমেন্ট ব্যবস্থাগুলোর একটি। ১৪ কোটির বেশি মানুষ এবং ১ কোটি ৪০ লাখ প্রতিষ্ঠান এটি ব্যবহার করে। প্রতি মাসে এতে ৪০০ কোটির বেশি লেনদেন হয়, যার প্রতিটির গড় মূল্য প্রায় ৮৮ ডলার।
মাদারাম বলেন, 'মূল প্রশ্ন শুধু এটি নয় যে প্রতিটি ব্যবসায়িক লেনদেনে ইউপিআই বিনামূল্যে থাকবে কি না। বরং প্রশ্ন হলো, ফি নির্ধারণের কাঠামো এমন কি না, যা এখনো ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় যুক্ত হচ্ছে এমন ছোট ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা দেবে।'
ভারতের ইউপিআই ব্যবস্থার পরবর্তী পরীক্ষায় এটিই হয়তো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রথম পর্যায়ে লক্ষ্য ছিল ইউপিআইয়ের নেটওয়ার্ক তৈরি করা। দ্বিতীয় পর্যায়ে এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে কোটি কোটি মানুষ ও লাখ লাখ ব্যবসায়ী। এখন শুরু হচ্ছে তৃতীয় পর্যায়। এই ব্যবস্থাকে কম কার্যকর না করে এর পরিচালন ব্যয় কীভাবে মেটানো যায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
অর্থনীতিবিদ রেণুকা সানে মনে করেন, সঠিক মূল্য নির্ধারণের কাঠামো ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় শেষ পর্যন্ত 'বাণিজ্যিক ভারসাম্য' ফিরিয়ে আনতে পারে। এতে ঝুঁকির যথাযথ মূল্য নির্ধারণ, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর অর্থায়ন এবং আরও স্থিতিশীল পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
তবে বড় কোনো খুচরা ব্যবসায়ীর ওপর সামান্য ফি আরোপ করা হলে ভারতীয়রা হঠাৎ ইউপিআই ব্যবহার ছেড়ে দেবেন, এমন আশঙ্কা তুলনামূলক কম। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউপিআইয়ের নেটওয়ার্ক এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে সামান্য ফি এতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে না।
তবে অন্য ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। ২০২৪ সালে জরিপ সংস্থা লোকালসার্কেলসের এক জরিপে দেখা যায়, ইউপিআই ব্যবহারকারীদের ৭৫ শতাংশ বলেছেন, লেনদেনে ফি চালু হলে তারা ইউপিআই ব্যবহার বন্ধ করে দেবেন। মাত্র ২২ শতাংশ বলেছেন, তারা ফি দিতে রাজি থাকবেন।
ঝুঁকিটা আরও সূক্ষ্ম। ব্যবসায়ীদের ওপর ফি আরোপের ফলে যদি তাদের কেউ ইউপিআই পেমেন্ট গ্রহণে আগ্রহ হারান, কিংবা শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে ছোট ব্যবসায়ীরা এই ব্যবস্থায় যুক্ত হতে নিরুৎসাহিত হন, তাহলে ইউপিআইয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, সহজ ও ঝামেলাহীন লেনদেনের সুবিধা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
