পুরুষ চরিত্রে নিখুঁত অভিনয়, উপমহাদেশের প্রথম অভিনেত্রীর প্রেমে পড়ছিলেন এক নারী
দাদাসাহেব ফালকে ভারতের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র 'রাজা হরিশচন্দ্র' নির্মাণ করেছিলেন সম্পূর্ণ পুরুষ অভিনয়শিল্পী দিয়ে, যেখানে নারী চরিত্রগুলোতেও পুরুষরাই অভিনয় করেছিলেন।
তবে তার দ্বিতীয় চলচ্চিত্র 'মোহিনী ভস্মাসুর'-এর কাজ যখন শুরু করেন, তখন তিনি নারী চরিত্রগুলোতে নারীদের দিয়ে অভিনয় করাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। সে অনুসন্ধানের পথ ধরেই তিনি শিল্পী দুর্গাবাই কামাত এবং তার কন্যা কমলাবাই গোখলেকে খুঁজে পান, যারা যথাক্রমে পার্বতী ও মোহিনী চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
তবে সিনেমায় প্রবেশের আগেই কমলাবাই নাট্যজগতে নিজের খ্যাতি তৈরি করেছিলেন। তিনি ছিলেন সে সময়ের অন্যতম শিল্পী। যে যুগে মঞ্চে নারীদের চরিত্রে পুরুষরা অভিনয় করতেন, কমলাবাই সেখানে হেঁটেছেন ঠিক বিপরীত পথে—তিনি একাধিক নাটকে পুরুষ চরিত্রে অভিনয় করেছেন এবং তার নাটকের দল নিয়ে দেশজুড়ে ঘুরে বেরিয়েছেন।
পুরুষ চরিত্রে তার অভিনয় এতটাই প্রাণবন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য ছিল যে, একটি প্রদর্শনী চলাকালে এক বিবাহিত নারী ভেবেছিলেন কমলাবাই আসলে একজন পুরুষ এবং তিনি কমলাবাইয়ের প্রেমে পড়ে যান। সেই নারী ঘর ছেড়ে কমলাবাইয়ের পিছু পিছু ধারওয়ার পর্যন্ত চলে যান।
১৯৯১ সালে চলচ্চিত্র নির্মাতা রীনা মোহনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই অদ্ভুত ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কমলাবাই বলেছিলেন, 'রাজাপুরের এক মেয়ে ভাবতো আমি একজন পুরুষ। আমি 'মানঅপমান' নাটকে 'ধৈর্যধর' নামের একটি পুরুষ চরিত্রে অভিনয় করছিলাম। সে আমার প্রেমে পড়ে যায়। সে নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে আমার পিছু পিছু ধারওয়ার পর্যন্ত চলে এসেছিল।'
অবশেষে কমলাবাইকে এক অদ্ভুত পথ বেছে নিতে হয়েছিল সেই নারীকে এটা বিশ্বাস করানোর জন্য যে, তিনি আসলে একজন নারী।
কমলাবাই বলেন, 'যেদিন সে আমার সাথে দেখা করতে এলো, আমি আমার এবং তার মাথা থেকে পাগড়ি খুলে নিলাম। সে আমার সাথে দেখা করতে পুরুষ সেজে এসেছিল। তিনি ছিলেন একজন বিবাহিত নারী, কিন্তু তিনি ঘর ছেড়ে পালিয়ে এসেছিলেন। আমি তাকে একটি ঘরে নিয়ে গেলাম, যেখানে আমরা দুজনেই নিজেদের পোশাক খুললাম। তখন সে সত্যটা বুঝতে পারল, তা না হলে হয়তো সে পাগলই হয়ে যেত।'
নিজের মায়ের মতোই কমলাবাইও কখনো অভিনেত্রী হওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগোননি। মূলত পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতাই এই দুই নারীকে মঞ্চে এবং পরবর্তীতে সিনেমায় নিয়ে আসে। দুর্গাবাই একটি নির্যাতনমূলক সংসার ত্যাগ করে তার মেয়েকে নিয়ে বোম্বেতে চলে এসেছিলেন। মায়ের সেই সংগ্রামময় দিনগুলোর কথা স্মরণ করে কমলাবাই বলেছিলেন, 'আমার বাবা ছিলেন একজন খারাপ মানুষ। তিনি প্রায়ই আমার মাকে মেরে আধমরা করে ফেলতেন। বেঁচে থাকার তাগিদে আমার মা পতিতাবৃত্তিকে বেছে না নিয়ে শিল্প ও সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরেছিলেন।'
এ কঠিন যাত্রাই শেষ পর্যন্ত দুর্গাবাইকে থিয়েটারে নিয়েছে। ফালকের সাথে তার এক আকস্মিক পরিচয়ের মাধ্যমে সে ইতিহাসের যাত্রা শুরু হয়। ফালকে যখন দুর্গাবাই ও কমলাবাইকে খুঁজে পান, তখন ভারতীয় সিনেমা কেবল শুরু হচ্ছিল। দুর্গাবাই কামাত ভারতীয় পর্দায় আবির্ভূত প্রথম নারী হয়ে ওঠেন, অন্যদিকে কমলাবাই ভারতের প্রথম নারী শিশুশিল্পী হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করেন।
তবে তাদের যাত্রা সেখানেই থেমে থাকেনি। কমলাবাই ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয় চালিয়ে গেছেন। পরবর্তীতে তার ছেলে চন্দ্রকান্ত গোখলে এবং নাতি বিক্রম গোখলে ও মোহন গোখলে অভিনয়ের সাথে পরিবারের এই দীর্ঘ পথচলাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
