সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচয় ফাঁস ঠেকাতে নেমট্যাগ খুলে রেখে যন্তর মন্তরের বিক্ষোভ দমন করল দিল্লি পুলিশ
সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচয় ফাঁস এড়াতে দিল্লির যন্তর মন্তরে নেমট্যাগ খুলে রেখে বিক্ষোভ দমনের কাজ করেছেন দিল্লি পুলিশের সদস্যরা। শুক্রবার ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ প্রক্রিয়ায় (এসআইআর) অনিয়মের অভিযোগে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভে এ চিত্র দেখা যায়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় পুলিশ সদস্যদের যেন চিহ্নিত করে সমালোচনা করা না হয়, সেজন্য পুলিশ সদস্যরা 'সচেতন পদক্ষেপ' হিসেবেই নেমট্যাগ পরেননি।
পুলিশের আরও দাবি, গত ২০ জুলাই ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) পদযাত্রায় সহিংসতার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ওই সময় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী জড়ো হলে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে মারধর করতে দেখা যায়।
গত শুক্রবার সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের প্রথম দিনে অনেক বিক্ষোভকারী পুলিশ সদস্যদের নেমট্যাগ না পরার কারণ জানতে চেয়ে ঘটনাটির ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া এসব ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন পুলিশ সদস্য বলছেন, ভিড় ও হট্টগোলের মধ্যে তাদের নেমট্যাগ পড়ে গেছে। কেউ কেউ বলেন, তারা নেমট্যাগ লাগাতে ভুলে গেছেন। আবার কয়েকজন দাবি করেন, ভিড়ের মধ্যে যেন হারিয়ে না যায়, তাই তারা নেমট্যাগ খুলে রেখেছেন। তবে অনেক পুলিশ সদস্যই এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দিতে রাজি হননি।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কর্মকর্তারা জানান, নেমট্যাগ না পরার এই সচেতন সিদ্ধান্ত মূলত গত ২০ জুলাইয়ের বিক্ষোভের অভিজ্ঞতা থেকেই নেওয়া হয়েছে। ওই ঘটনার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করে আক্রমণ করা হয়েছিল বলে দাবি তাদের।
জুলাইয়ে সিজেপির বিক্ষোভ দমনের বিষয়ে একটি পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে সরাসরি যুক্ত থাকা শীর্ষ কর্মকর্তারা ঊর্ধ্বতনদের বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের ও তাদের পরিবারকে চিহ্নিত করে সমালোচনা করা হয়েছে।
ওই পর্যালোচনা বৈঠকের আলোচনা সম্পর্কে অবগত এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, 'অনেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বন্ধুবান্ধব বা সামাজিক পরিসরে তাদের পরিবারকে হয়রানিমূলক কথাবার্তা শুনতে হয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তা এমনও জানিয়েছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় মিমের মাধ্যমে এবং কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের দ্বারাও তাদের পরিবারকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে।'
এরপর ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের আশ্বস্ত করা হয়, দায়িত্ব পালনের সময় নেমট্যাগ খুলে রাখলে কারও বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
ওই কর্মকর্তা বলেন, 'আইপিএস [ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস] কর্মকর্তাদের সাধারণত সাধারণ মানুষ সহজেই চিনে ফেলে। তাই এবার যন্তর মন্তরে তবে অনেক জুনিয়র সদস্যকে নেমট্যাগ ছাড়াই মাঠে দায়িত্ব পালনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।'
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং জম্মু ও কাশ্মীরে নিরাপত্তা বাহিনীর ক্ষেত্রে নেমট্যাগ না পরার এই কৌশল আগে থেকেই প্রচলিত রয়েছে। এছাড়া বিদ্রোহী দমন অভিযানের ছবিতে বিশেষ বাহিনীর সদস্যদের মুখ অস্পষ্ট করে রাখা হয়।
তবে দিল্লিতে এভাবে নেমট্যাগ সরিয়ে ফেলা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ জুলাইয়ে বিক্ষোভ দমনের সময় পুলিশের বিরুদ্ধে মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও মারধরের অভিযোগ উঠেছিল।
জুলাইয়ের বিক্ষোভে নিজেদের পুলিশ দাবি করে সাধারণ পোশাকে থাকা অনেক ব্যক্তিকেও বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা করতে দেখা গিয়েছিল। সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররাও এমন কিছু ব্যক্তিকে শনাক্ত করেছিলেন, যারা আদতে দিল্লি পুলিশের সদস্যই ছিলেন না।
যন্তর মন্তরে সিজেপির বিক্ষোভ চলাকালে ৩৮ বছর বয়সি এক ব্যক্তিকে মারধরের অভিযোগে স্বতন্ত্র ভরদ্বাজ নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আরেকজন পুলিশ কর্মকর্তা দাবি করেন, 'ইনফ্লুয়েন্সারদের একটি অংশ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে লাইভ সেশন করছিল কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় "মিম" তৈরির জন্য ভিডিও রেকর্ড করছিল। তারা নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করে আক্রমণের লক্ষ্য বানাচ্ছে। অনেকে আবার মিম তৈরির উদ্দেশ্যে মাঠে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের সাক্ষাৎকারও নিচ্ছে। এই কারণেই সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিদের পরিচয়পত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে।'
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরুর আগে পুলিশ সদস্যদের জন্য দাঙ্গাবিরোধী মহড়া ও বিশেষ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছিল। এর আগে জুলাইয়ে ছাত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের কারণে দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী সিএপিএফ তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিল।
ওই সময় ক্যামেরায় দেখা গিয়েছিল, পুলিশ ও সিএপিএফের অনেক সদস্য বিক্ষোভকারীদের চড় মারছেন, মারধর করছেন, উদ্দেশ্যমূলকভাবে ল্যাং মেরে ফেলে দিচ্ছেন।
