প্রথম আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের মাধ্যমে বোয়িং-এয়ারবাসকে জবাব দিল চীন; কোমাক কি পারবে দ্বৈত আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে?
চীনের তৈরি সি৯১৯ যাত্রীবাহী বিমানটি বুধবার তার প্রথম নির্ধারিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ফ্লাইটে যাত্রা করেছে। বোয়িং এবং এয়ারবাসের বিকল্প তৈরির প্রচেষ্টায় এটি বেইজিংয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, এয়ার চায়না পরিচালিত বিমানটি স্থানীয় সময় দুপুর ৩টার কিছু পর বেইজিং ক্যাপিটাল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটরের উদ্দেশে উড্ডয়ন করে। প্রায় দুই ঘণ্টা ১৫ মিনিট পর এটি উলানবাটরে অবতরণ করে। চীনের তৈরি ন্যারো-বডির বিমানটির জন্য এটিই চীনের সীমানার বাইরে প্রথম বাণিজ্যিক যাত্রীসেবা।
এয়ার চায়না জানিয়েছে, বেইজিং-উলানবাটর রুটে বিমানটির প্রতিদিন চলাচল করবে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বোয়িং এবং ইউরোপের এয়ারবাসের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকা বৈশ্বিক যাত্রীবাহী বিমানের বাজারে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন 'কমার্শিয়াল এয়ারক্রাফট করপোরেশন অব চায়না' বা কোমাককে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে সি৯১৯ এখনো বিদেশি যন্ত্রাংশের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এ ছাড়া, এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের প্রধান এভিয়েশন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রয়োজনীয় অনুমোদনও পায়নি। ফলে বহু আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রাহক পাওয়ার ক্ষেত্রে বিমানটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা এখনো সীমিত।
জার্মানিভিত্তিক মারকেটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজ-এর বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস মিশার সিএনবিসি-কে বলেন, 'কোমাক-এর তৈরি সি৯১৯ ন্যারো-বডির যাত্রীবাহী বিমানের উৎপাদন এখনো ব্যাপকভাবে বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরশীল।'
তিনি বিমানটির ইঞ্জিনের বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের জিই অ্যারোস্পেস এবং ফ্রান্সের সাফ্রান এয়ারক্রাফট ইঞ্জিনস-এর যৌথ উদ্যোগ সিএফএম ইন্টারন্যাশনাল দ্বারা তৈরি।
মিশার আরও বলেন, 'চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারের ১০ শতাংশ দখলের লক্ষ্যে দেশে তৈরি বড় যাত্রীবাহী বিমানের ক্ষেত্রে কোমাক "মেড ইন চায়না ২০২৫" কর্মসূচির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও ব্যর্থ হয়েছে।'
তা সত্ত্বেও, কোমাক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিমানটিকে ক্রমেই ব্যাপকভাবে প্রদর্শন করছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে দুবাই এয়ারশো-তে সি৯১৯ এবং তুলনামূলক ছোট বিমান সি৯০৯-এর প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটে, যেখানে কোমাক বৈশ্বিক বিমান শিল্পের সাথে নিজেদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার আগ্রহ ব্যক্ত করে।
সি৯১৯ হলো একটি একক-আইল সংবলিত ন্যারো-বডি বিমান যা সর্বোচ্চ ১৭৪ জন যাত্রী পরিবহন করতে পারে। বোয়িং-এর ৭৩৭ ম্যাক্স এবং এয়ারবাস-এর এ৩২০নিও-এর বাজারকে লক্ষ্য করেই এটি ডিজাইন করা হয়েছে।
কোমাক কি পারবে বোয়িং ও এয়ারবাসকে চ্যালেঞ্জ করতে?
চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এভিয়েশন বাজার, যা কোমাক-কে নিজ দেশে একটি উল্লেখযোগ্য গ্রাহকভিত্তি এনে দিয়েছে। তবুও দেশটির অভ্যন্তরীণ এয়ারলাইনগুলো এখনো বোয়িং এবং এয়ারবাসের তৈরি বিমানের ওপরই নির্ভরশীল।
গত মে মাসে চীন ২০০টি বোয়িং বিমানসহ ইঞ্জিন ও খুচরা যন্ত্রাংশের অর্ডার করেছে বলে জানা যায়। এ থেকে বোঝা যায়, বেইজিং কোমাক-কে সমর্থন দেওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বাণিজ্যিক বিমানের ওপর দেশটির নির্ভরশীলতা এখনো দেখা যাচ্ছে।
মিশার জানান, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ কোমাক সর্বমোট ৩২টি সি৯১৯ বিমান সরবরাহ করেছে, যেখানে শুধু ২০২৫ সালেই এয়ারবাস চীনে প্রায় ১০০টি ন্যারো-বডি বিমান সরবরাহ করেছিল। তিনি যোগ করেন, এই বছরের প্রথমার্ধে কোমাক আরও আটটি সি৯১৯ সরবরাহ করেছে।
মিশারের মতে, ২০২৯ সালের মধ্যে বছরে ২০০টি বিমান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা থেকে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানটি এখনো অনেক দূরে রয়েছে। তবে উৎপাদন বাড়ানো চ্যালেঞ্জের একটি অংশ মাত্র।
ভালো করতে হলে কোমাককে বিমান সংস্থাগুলোকে আশ্বস্ত করতে হবে যে, বিমানগুলো সার্ভিসে থাকা অবস্থায় তারা প্রয়োজনীয় সেবা ও সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত এভিয়েশন বিশ্লেষক রব মরিস সিএনবিসি-কে বলেন, 'এয়ারবাস এবং বোয়িংয়ের সাথে প্রকৃত প্রতিযোগিতায় নামার জন্য 'কোমাকের উন্নয়ন ও উৎপাদনের গতি খুবই ধীর।'
তিনি বলেন, 'যদিও সি৯১৯ চীনে এয়ারবাস এবং বোয়িংয়ের বিক্রিতে প্রভাব ফেলতে পারে, তবে এর ধীরগতির বাস্তবায়নের কারণে সময় লাগবে। আমার মনে হয় এর পেছনে বড় কারণ হলো যাত্রী এবং এয়ারলাইনগুলোর গ্রহণযোগ্যতা।'
তিনি আরও বলেন, 'শুধু বিমান তৈরি ও সরবরাহ করাই যথেষ্ট নয়, প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই ২৪ ঘণ্টা সারা বছর নিরবচ্ছিন্ন সেবামূলক সহায়তা প্রদান করতে হবে, যাতে সি৯১৯-এর ফ্লাইট সময়মতো ছাড়ার নির্ভরযোগ্যতা সুপরিচিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত এ৩২০ এবং ৭৩৭-এর সমকক্ষ হয়। এটি সময়সাপেক্ষ বিষয় এবং দীর্ঘমেয়াদে সফলভাবে পরিচালনার মাধ্যমেই কেবল তা প্রমাণ করা সম্ভব।'
বিমান তৈরি করা অত্যন্ত জটিল একটি প্রক্রিয়া এবং এটি সরবরাহ ব্যবস্থার যেকোনো বিঘ্নের কারণে সহজেই থমকে যেতে পারে। কারণ অপেক্ষাকৃত ছোট কোনো একটি যন্ত্রাংশের ঘাটতিও একটি তৈরি হওয়া বিমান সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
এয়ারোডাইনামিক অ্যাডভাইজরি-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিচার্ড আবৌলাফিয়া চলতি বছরের শুরুর দিকে সিএনবিসি-কে বলেছিলেন, 'একটি বিমান তৈরি করতে ঠিক কতগুলো যন্ত্রাংশ লাগে? এর উত্তর হলো—সবগুলো। এমন যদি হয় যে কেবল স্ক্রু কম আছে, তবে আপনি বিমানটি তৈরি শেষ করতে পারবেন না।'
মিশার উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় নামার আগে কোমাককে তাদের সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও সুদৃঢ় করতে হবে, উৎপাদন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে এবং উৎপাদনের একটি বড় স্কেল অর্জন করতে হবে। তিনি যোগ করেন, এমনকি সেটি করতে পারলেও, যাত্রীবাহী বিমানের মতো একটি অত্যন্ত জটিল পণ্যের ক্ষেত্রে পুরোপুরি স্বাবলম্বী হওয়া বেশ কঠিন হবে।
তবে এসব বাধা সত্ত্বেও, সি৯১৯ চীনের মহাকাশ প্রযুক্তির জন্য একটি বিরাট বড় সাফল্য।
তিনি বলেন, 'একটি সম্পূর্ণ যাত্রীবাহী বিমান তৈরি করতে যন্ত্রাংশ, বিভিন্ন সিস্টেম এবং সফটওয়্যারের এই বিশাল বিন্যাসকে একসাথে সংহত করার দক্ষতা এমন একটি সাফল্য, যা বিশ্বজুড়ে কেবল এয়ারবাস এবং বোয়িংয়ের মতো হাতে গোনা কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানই অর্জন করতে পেরেছে।'
