ইরানকে ‘ঠান্ডা মাথায়’ সামলাচ্ছি, ওদের ওপর অর্থনৈতিক চাপের ফল পেতে সময় দিচ্ছি: ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রোববার বলেছেন, ইরানকে নিয়ে ওয়াশিংটন এখন 'ঠাণ্ডা মাথায়' বা অত্যন্ত সীমিতভাবে এগোচ্ছে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির সঙ্গে শুধু 'আংশিকভাবে আলোচনা' করছে, কারণ দেশটি চরম অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে।
চ্যানেল ১২ ও অ্যাক্সিওসের বরাক রাভিদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে দেওয়া ট্রাম্পের এই মন্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তিনি ইরানের ওপর সামরিক হামলার পরিকল্পনা থেকে সরে এসে দেশটির ওপর ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপকে কাজ করতে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
শনিবার ইরান হরমুজ প্রণালির অবরোধ তুলে নেওয়ার জন্য কঠোর নতুন কিছু শর্ত ঘোষণা করার পর ট্রাম্পের এসব মন্তব্য আসে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার আগ পর্যন্ত বিশ্বের বাণিজ্যিক তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো।
রোববার প্রকাশিত পৃথক একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হলে ট্রাম্প যুদ্ধের বিজয় ঘোষণা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, এমনকি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের নিশ্চয়তা দিতে কোনো চুক্তি না হলেও।
এদিকে তেহরান তাদের দাবিতে আরও অনড় অবস্থান নিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি কোনো আলোচনা হওয়ার কথাও অস্বীকার করেছে।
রাভিদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের নতুন দাবির কারণে গত সপ্তাহে ইরান, ওমান ও যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি চুক্তি ঘোষণা করবে—মধ্যস্থতাকারীদের এমন আশা ভেস্তে গেছে।
গত সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প নিজেই ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। তবে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে দাবি করে পরে তিনি সেই অবস্থান থেকে সরে আসেন।
তারপরও রাভিদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইরানকে কোনো হুমকি দেননি কিংবা চুক্তি আটকে রাখার জন্য দেশটির বিরুদ্ধে ক্ষোভও প্রকাশ করেননি। ওই চুক্তি হলে হরমুজ প্রণালির সামুদ্রিক যান চলাচলের ওপর ইরান নজিরবিহীন নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যেত।
রাভিদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় 'আমরা বিষয়টি খুবই নিচু পর্যায়ে রাখছি'।
তিনি বলেন, 'আমরা তাদের সঙ্গে শুধু আংশিকভাবে আলোচনা করছি। আমরা শুধু ইরানের ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি এবং তাদের কাছে কোনো অর্থ না থাকার বিষয়টি দেখছি।'
তিনি আরও বলেন, 'সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। সবসময়ই ঠিক হয়ে যায়। এটা অনেকটা দাবা খেলার মতো।'
রাভিদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের শাসকগোষ্ঠী আর্থিকভাবে 'খুব খারাপ অবস্থায়' রয়েছে এবং দেশটির সেনাদের বেতন দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত অর্থও নেই।
ট্রাম্প আরও বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজ চলাচলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির অর্থনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে।
অন্যদিকে, ট্রাম্প উল্লেখ করেছেন যে, যুদ্ধের শুরুতে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি বেড়ে গেলেও পরে তা প্রায় ৭৫ ডলারে নেমে এসেছে, ফলে যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের ওপর তৈরি হওয়া চাপ কিছুটা কমেছে।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলেছেন, গত সপ্তাহ থেকেই ট্রাম্প যুদ্ধের উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন।
একজন কর্মকর্তা বলেছেন, যুদ্ধবিরতির কারণে ইরানকে এখন তার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
এর আগে অন্যান্য প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ইরানের ভেতরে এ বিষয়ে মতবিরোধ রয়েছে।
একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, যারা অর্থনৈতিক ধস এড়াতে একটি চুক্তির পক্ষে।
অন্য পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কমান্ডার আহমাদ ওয়াহিদি, যারা যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার বিরোধিতা করছেন।
উভয় পক্ষই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সমর্থন পাওয়ার দাবি করছে।
যুদ্ধের শুরুতে তাঁর বাবা ও পূর্বসূরি আলি খামেনি যে হামলায় নিহত হন, সেই হামলায় মোজতবা খামেনি আহত হয়েছেন বলে খবর প্রকাশের পর থেকে তাঁকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি।
রোববার মোজতবা খামেনির কার্যালয় দাবি করেছে, তিনি সম্প্রতি পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
কার্যালয়টি জানিয়েছে, মোজতবা খামেনি তার নেতৃত্বে পেজেশকিয়ানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তৃতীয় বছর শুরুর সময়ে তার সঙ্গে বৈঠক করেন এবং দুজন দেশের বিভিন্ন বিষয় ও সমস্যার পাশাপাশি 'বর্তমান সামরিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা' নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেন।
পেজেশকিয়ান ২০২৪ সালের জুলাইয়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এর আগে মে মাসের শুরুতে পেজেশকিয়ান বলেছিলেন, তিনি খামেনির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তবে তিনি ওই বৈঠকের নির্দিষ্ট তারিখ জানাননি এবং সে সময় সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় থেকেও কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি।
বুধবার পেজেশকিয়ান বলেছিলেন, বর্তমান সময়ে খামেনির সঙ্গে যোগাযোগ করা 'খুবই কঠিন'।
সর্বোচ্চ নেতার স্বাস্থ্য নিয়ে নানা জল্পনার মধ্যেই তিনি এ কথা বলেছিলেন।
বাবার মৃত্যুর পর সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর থেকেই মোজতবা খামেনি আত্মগোপনে রয়েছেন।
তাঁকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হতে পারে—এমন আশঙ্কা এড়াতে তিনি ধীরগতির একাধিক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে সরকারের অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
খামেনির কোনো ভিডিও বা রেকর্ড করা বক্তব্য প্রকাশিত হয়নি।
তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তাঁর নামে লিখিত বিবৃতি প্রকাশ করেছে।
রোববার ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম সংবাদ সংস্থা ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর এক জেনারেলকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, খামেনিকে জনগণের মধ্যে এবং বিভিন্ন বৈঠকে দেখা যাচ্ছে—এমন ছবি 'ভবিষ্যতে' প্রকাশ করা হবে।
তবে ওই জেনারেল এসব ছবি কখন প্রকাশ করা হবে, সে বিষয়ে কোনো সময়সীমা জানাননি।
