ইসরায়েলে নেতানিয়াহুর ‘ট্রাম্প কার্ড’ কি জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে?
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতাকে ইসরায়েলে নিজের অপরিহার্যতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছেন। তিনি রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত—উভয়ভাবেই এই সম্পর্ক ব্যবহার করেন।
নেতানিয়াহু তার যৌবনের একটি বড় অংশ ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রে কাটিয়েছেন। এর ফলে তিনি আমেরিকান একসেন্টে (উচ্চারণে) সুন্দর কথা বলতে পারেন। মার্কিন রাজনীতি সম্পর্কেও তার বিশেষ ধারণা রয়েছে। এ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্টকে প্রভাবিত করেছেন। এভাবে ইসরায়েল এবং তার নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে ওয়াশিংটনের অবিচল সমর্থন আদায় করতে সফল হয়েছেন তিনি।
একসময় মনে হয়েছিল, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলের প্রতি সবচেয়ে বেশি অনুগত; বিশেষ করে তিনি যখন ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ যুদ্ধে অংশ নিতে রাজি হন। তিনিই প্রথম মার্কিন নেতা যিনি ইসরায়েলের সঙ্গে এই পদক্ষেপে সম্মত হয়েছিলেন।
তবে বর্তমানে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে। ইরানের বিরুদ্ধে সেই যুদ্ধ স্থবির হয়ে পড়েছে। ট্রাম্প এখন ইসরায়েলের মতামত ছাড়াই মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন চুক্তি করতে আগ্রহী হচ্ছেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রেও ইসরায়েলের সমালোচনা বাড়ছে। ফলে ইসরায়েলে এখন এক ধরনের ভিন্ন অনুভূতি তৈরি হচ্ছে। অনেকে মনে করছেন, নেতানিয়াহুর এই 'ট্রাম্প কার্ড' আগের মতো আর কাজ করছে না।
নেতানিয়াহুর জন্য সময়টি বেশ খারাপ। আগামী অক্টোবরের শেষের দিকে দেশে নির্বাচনের মুখোমুখি হবেন তিনি। একইসঙ্গে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলা বিচারাধীন। পাশাপাশি তিনি ওই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি অমীমাংসিত সংঘাতের চাপ সামলাচ্ছেন।
তাই মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর ওই বৈঠক ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটিই তার প্রথম মার্কিন সফর। এ সফরকে তিনি একটি নতুন শুরুর সুযোগ হিসেবে দেখছেন। পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সম্পর্ক স্মরণে রাখার জন্য ইসরায়েলিদের সামনে এটি একটি ফটো সেশনেরও ভালো সুযোগ।
দৃশ্যমান বাস্তবতা
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়ছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতানিয়াহুই মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এই মিশনের সফলতা সম্পর্কে আশ্বস্ত করেছিলেন। তিনি ট্রাম্পকে বুঝিয়েছিলেন যে, এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব।
এছাড়া গাজার পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংস কর্মকাণ্ডে নেতানিয়াহুর ইন্দন নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে উদ্বেগ বেড়েছে। এই বসতি স্থাপনকারীরা বেআইনিভাবে এক মার্কিন সিনেটরকে আটকে রেখেছিল। এরসঙ্গে আরও কিছু বিষয়ে টানাপোড়েন তৈরি হয়। যেমন—তুরস্কের কাছে মার্কিন এফ-৩৫ বিমান বিক্রির আলোচনা এবং সৌদি আরবের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিতে ওয়াশিংটনের সম্মতি। এসব পদক্ষেপে নেতানিয়াহু বেশ নাখোশ।
নিউইয়র্কে ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কনসাল জেনারেল অলন পিনকাস সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, "নেতানিয়াহুর এই ওয়াশিংটন সফরের মূল কারণ একেবারেই স্বার্থসিদ্ধ ও কৌশলগত। প্রয়াত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের শেষকৃত্যে যোগ দিতে তিনি সেখানে যাচ্ছেন। গ্রাহাম নাকি তার খুব ভালো বন্ধু ছিলেন।"
পিনকাস আরও বলেন, "খাতায়-কলমে একটি এজেন্ডা দেখানো হচ্ছে। হয়তো তারা ইরান, এফ-৩৫ এবং সৌদি আরবের পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা করবেন। তবে সফরের আসল উদ্দেশ্য দুটি। প্রথমত, ইসরায়েলের ভেতরের মিত্র ও সমালোচকদের দেখানো যে, ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক আছে। দ্বিতীয়ত, তিনি আশা করছেন ট্রাম্প আবারও তার দুর্নীতি মামলা প্রত্যাহারের বা ক্ষমার আহ্বান জানাবেন।"
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের নভেম্বরে নেতানিয়াহুর পক্ষে ট্রাম্প এমন একটি অনভিপ্রেত মন্তব্য করেছিলেন।
তবে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক থেকে নেতানিয়াহু ভালো ফল আশা করলেও পরিস্থিতি কঠিন। কারণ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে তার ভাবমূর্তি অনেকটাই বদলে গেছে।
আমেরিকান ডানপন্থীদের কাছ থেকে নেতানিয়াহু চরম সমালোচনার শিকার হচ্ছেন। পডকাস্টার ট্যাকার কার্লসন এবং সাবেক রিপাবলিকান প্রতিনিধি মারজোরি টেলর গ্রিন তার সমালোচনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও 'কিছু' ইসরায়েলির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জো রোগানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স ইঙ্গিত দেন, যুদ্ধ শেষ করার জন্য তিনি ইরানের সঙ্গে যে চুক্তি করছিলেন, ইসরায়েলি সরকারের কিছু লোক তা ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈঠকে প্রকাশ্যে তোষামোদি ভাব থাকলেও ট্রাম্পের ভেতরে এখন চরম অনিচ্ছা ও স্বার্থপরতা থাকবে। সোমবার (২৭ জুলাই) এয়ার ফোর্স ওয়ান বিমানে সাংবাদিকরা ট্রাম্পের কাছে একটি প্রশ্ন করেন। তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ বিক্রিতে নেতানিয়াহুর বাধা দেওয়া নিয়ে জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প বলেন, "আমরা কী বিক্রি করব, তা কেউ আমাদের ঠিক করে দিতে পারে না।"
কিং'স কলেজ লন্ডনের ওয়ার স্টাডিজ বিভাগের জ্যেষ্ঠ গবেষক অ্যারন ব্রেগম্যান বলেন, "নেতানিয়াহু এমন সময়ে ওয়াশিংটনে এসেছেন যখন ট্রাম্পের চারপাশের মানুষও তাকে নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। যুক্তরাষ্ট্রে তিনি এখন চক্ষুশুল হয়ে উঠেছেন।"
ব্রেগম্যান আরও বলেন, "তাকে যুক্তরাষ্ট্রে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে, যিনি ট্রাম্পকে একটি অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে টেনে এনেছেন। আর সেই যুদ্ধ এখন আমেরিকাকে মহাবিপদে ফেলেছে। এখন আর কেউ, এমনকি ট্রাম্পও তাকে ঘরের সবচেয়ে বুদ্ধিমান ব্যক্তি সাজতে দেবেন না। সেই দিন শেষ হয়ে গেছে।"
জনসমক্ষে এই সফর থেকে অসন্তোষের খুব বড় কোনো লক্ষণ হয়তো দেখা যাবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার একক ক্ষমতার যে দাবি নেতানিয়াহু করেন, তা আসন্ন নির্বাচনে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
১৯৯০-এর দশকে নেতানিয়াহুর সহকারী ও ইসরায়েলি জনমত জরিপকারী ছিলেন মিচেল বারাক। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, "যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নেতানিয়াহুর এক অনন্য সম্পর্ক ছিল। কিন্তু তিনি নিজেই সেই সেতু ভেঙে ফেলেছেন।"
বারাক জানান, এই সমালোচনা কেবল রিপাবলিকান পার্টির চরমপন্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রিপাবলিকান পার্টির মধ্য-ডানপন্থী ঐতিহ্যবাহী ইসরায়েলি মিত্ররাও এখন নেতানিয়াহুর ওপর অসন্তুষ্ট।
বারাক আরও বলেন, "তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ বিক্রি নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য আমরা দেখেছি। আবার ইরান যুদ্ধশুরুর সময় নেতানিয়াহুর প্রতি মার্কিন সমালোচনাও দেখা গেছে। তাই ট্রাম্প নেতানিয়াহুর হয়ে আর কতদিন দাঁড়াবেন, তা বলা কঠিন।"
"এমনও হতে পারে, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে একজন দুর্দান্ত যুদ্ধকালীন নেতা হিসেবে প্রশংসা করবেন। এরপর তিনি বলবেন, ইসরায়েলের এখন সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। তারপর তিনি অন্যান্য ইসরায়েলি রাজনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করে নতুন কোনো নেতাকে সমর্থন দিয়ে বসবেন," যোগ কয়েন তিনি।
