বিশ্বের বৃহত্তম হ্রদ কাস্পিয়ানে আছড়ে পড়ছে ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধের ঢেউ, নেপথ্যে কী?
বিশ্বের বৃহত্তম হ্রদ হিসেবে পরিচিত কাস্পিয়ান সাগর এখন ইরান ও তার শত্রুপক্ষদের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সংঘাতের নতুন এক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কাস্পিয়ান ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে গভীর হওয়া বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্কের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
গত সপ্তাহের শেষে ইউক্রেন জানিয়েছে, তাদের ড্রোন কাস্পিয়ান সাগরে দুটি রুশ জাহাজে আঘাত হেনেছে, যেগুলোতে সামরিক সরঞ্জাম ছিল। ইউক্রেনের দাবি, জাহাজ দুটি ইরান থেকে সামরিক রসদ নিয়ে রাশিয়ার একটি বন্দরের দিকে যাচ্ছিল।
শনিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, 'আমাদের লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল ইরান থেকে সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে যুক্ত জাহাজ এবং একটি যুদ্ধজাহাজ।' পরবর্তীতে ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থা সেটিকে একটি রুশ ক্ষেপণাস্ত্রবাহী জাহাজ হিসেবে শনাক্ত করে।
তবে ইরান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে পাল্টা জানিয়েছে, তাদের একটি লোহাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। এতে একজন ইরানি নাবিক নিহত এবং আরও তিনজন আহত হয়েছেন। জাহাজটির নাম প্রকাশ না করলেও তেহরান জানিয়েছে, এটি রাশিয়ার আস্ট্রাখান বন্দর থেকে ইরানের আনজালি বন্দরে আসছিল। আনজালি অঞ্চলের গভর্নর হাদি হাক-শেনাস এই রুটটিকে 'দুটি বন্দরের মধ্যে বাণিজ্যিক বিনিময়ের একটি নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য করিডোর' হিসেবে বর্ণনা করেন।
সোমবার উত্তেজনা আরও বেড়ে যায় যখন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, 'ইউক্রেনের এই বিপজ্জনক হঠকারিতার জবাব অবশ্যই দেওয়া হবে।' এরই মধ্যে এই ঘটনার প্রতিবাদে তেহরানে নিযুক্ত ইউক্রেনের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করেছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
কাস্পিয়ান সাগরের ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব
কাস্পিয়ান সাগরকে ঘিরে রয়েছে ইরান ও রাশিয়াসহ মোট পাঁচটি দেশ। পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ থাকায় কাস্পিয়ান সাগর এখন ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক বাণিজ্য পথে পরিণত হয়েছে।
ভিয়েনা-ভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান 'ইউরেশিয়ান নেক্সাস পার্টনারস'-এর ব্যবস্থাপনা অংশীদার বিজান খাজেপুর সিএনএন-কে বলেন, 'কাস্পিয়ান সাগর ইরানকে রাশিয়া, ককেশাস অঞ্চল, মধ্য এশিয়া এবং রেললাইনের মাধ্যমে চীন ও পরোক্ষভাবে পূর্ব ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য বিস্তারে সহায়তা করে। এটি ইরানের দক্ষিণের জলপথের বিকল্প নয়, বরং একটি কৌশলগত পরিপূরক।'
রাশিয়ার শস্য এবং ইস্পাত এই কাস্পিয়ান সাগর দিয়েই পরিবাহিত হয়। রাশিয়ার জন্য এটি মধ্য এশিয়া এবং ইরানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রধান পথ। পাশাপাশি ইরানের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি এবং তেল অনুসন্ধানে রাশিয়ার ভূমিকার ক্ষেত্রেও এই পথটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাজেপুর আরও যোগ করেন, 'আমেরিকার সাম্প্রতিক অবরোধ কাস্পিয়ান রুটটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যেহেতু এটি স্থলবেষ্টিত এবং পশ্চিমা নৌবাহিনীর নাগালের বাইরে, তাই এটি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখেও কম ঝুঁকিপূর্ণ।'
ইরান ও রাশিয়ার সামরিক যোগসূত্র
কাস্পিয়ান সাগর বর্তমানে মস্কো ও তেহরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক সম্পর্কের প্রধান করিডোর হয়ে উঠেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর দিকেই রাশিয়া কাস্পিয়ান সাগর দিয়ে ইরানের তৈরি 'শাহেদ' ড্রোন পেয়েছিল। এমনকি ইরান থেকে রাশিয়ায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানোর ক্ষেত্রেও এই পথটি ব্যবহৃত হচ্ছে বলে সন্দেহ করা হয়।
২০২৪ সালে সিএনএন-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, কাস্পিয়ান সাগরে রাশিয়ার একটি বন্দরে ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী রুশ জাহাজ দেখা গেছে। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ মনে করে, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ইরান থেকে স্বল্প পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরিবহনে 'পোর্ট ওলিয়া-৩' নামক একটি জাহাজ ব্যবহার করেছে। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন বলেছিলেন, ওয়াশিংটন বিশ্বাস করে রাশিয়া ইরানের কাছ থেকে 'ফাতাহ-৩৬০' ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পেয়েছে এবং খুব শিগগিরই তা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে। তবে সে সময় ইরান রাশিয়াকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছিল।
ইউক্রেনের লক্ষ্য কী?
কাস্পিয়ান সাগরে জাহাজ এবং জ্বালানি অবকাঠামোতে ইউক্রেনের এই ড্রোন হামলা মূলত তাদের দীর্ঘ পাল্লার সক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ। এর মাধ্যমে ইউক্রেন রাশিয়ার যুদ্ধ সক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখা শিল্প ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায়। এটি একই সঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি যে—উত্তর কোরিয়ার মতো ইরানও রাশিয়ার অস্ত্র সরবরাহের অন্যতম প্রধান উৎস।
তবে সবকিছুর ওপরে, ইউক্রেনীয়দের এই পদক্ষেপের টাইমিং বা সময়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। চলতি সপ্তাহে জেলেনস্কি ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন। কাস্পিয়ান সাগরে হামলার পাশাপাশি জেলেনস্কি দাবি করেছেন, ইউক্রেনীয় গোয়েন্দাদের তথ্য অনুযায়ী—মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্থাপনায় হামলা চালানোর জন্য রাশিয়া ইরানকে স্যাটেলাইট তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে। এর মাধ্যমে জেলেনস্কি ওয়াশিংটনকে একটি পরিষ্কার বার্তা দিতে চাইছেন: ইউক্রেন ও আমেরিকা—উভয়ই একই শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ছে।
