'ওই ভয়টাই ওকে মেরে ফেলেছে': এক প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারি যেভাবে ভারতে ছাত্র-আন্দোলনের জন্ম দিল
ভারতের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা 'নিট' পুনরায় দেওয়ার চিন্তায় ১৯ বছর বয়সী শেখ সানা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। চাপ সহ্য করতে না পেরে পরীক্ষার ঠিক আগের দিন একটি চিরকুটে 'আমি দুঃখিত' লিখে আত্মহননের পথ বেছে নেন তিনি।
সানা ছাড়াও আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা পুরো ভারতে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের কাছে জবাবদিহি চেয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিক্ষোভে নেমেছেন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে শনিবার ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন।
দুই মাস ধরে চলা এই বিক্ষোভ কেবল প্রশ্নফাঁসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ভারতের ৬৫ শতাংশ মানুষ ৩৫ বছরের নিচে হওয়ায় শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে তরুণ প্রজন্মের ব্যাপক হতাশা এই আন্দোলনের মূল উপজীব্য হয়ে উঠেছিল। মে মাসে দুই মিলিয়নের বেশি শিক্ষার্থী এই লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি সামনে আসার পর সরকার তদন্ত শুরু করে এবং পরীক্ষার ফলাফল বাতিল করে জুন মাসে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার নির্দেশ দেয়। এতে শিক্ষার্থীরা পুনরায় চরম মানসিক চাপের মুখে পড়েন।
দিল্লির যন্তর মন্তরে সানার বাবা শেখ জাফর হোসেন বলেন, 'ওই ভয়টাই ওকে মেরে ফেলেছে। পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার ভয়।' রাজস্থান, তেলেঙ্গানা ও গুজরাটের পুলিশ সানাসহ আরও দুই শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিবিআই) জানিয়েছে, বেসরকারি কোচিং সেন্টারের শিক্ষক ও দালালরা প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত। এ ঘটনায় এক চিকিৎসক ও বেশ কয়েকজন শিক্ষকসহ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী মোদি বৃহস্পতিবার এক ভিডিও বার্তায় বলেন, 'আমি জানি, প্রশ্নফাঁস সাধারণ কোনো বিষয় নয়। এটি লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকের জন্য চরম বেদনাদায়ক।' তিনি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে অপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
চলতি সপ্তাহে দিল্লিতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিক্ষোভ করেছেন। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে।
বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেন, গত এক দশকে ভারতে ১৫০ বারের বেশি প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী 'ককরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি) বলছে, পরীক্ষায় ব্যর্থতার জেরে ২১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে।
এদিকে পদত্যাগের ঘোষণায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, 'আমি দেশের তরুণদের স্বপ্ন, অনুভূতি ও প্রত্যাশাকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করি।'
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের যুবসমাজকে বড় শক্তি হিসেবে দাবি করা মোদি সরকারের জন্য এই আন্দোলন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক সব্যসাচী বসু রায় চৌধুরী বলেন, 'শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটির বিরুদ্ধে তরুণদের রাস্তায় নামা অনেক বড় তাৎপর্য বহন করে।'
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এও বলছেন যে, মোদির বিপুল জনপ্রিয়তায় ফাটল ধরানো মোটেও সহজ হবে না। গত ১২ বছর ক্ষমতায় থাকার সময়ে তিনি বেশ কয়েকটি বড় ধরনের গণ-আন্দোলন মোকাবিলা করেছেন, যার মধ্যে বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন এবং কৃষি সংস্কারের মতো সংবেদনশীল ইস্যুও ছিল। কিন্তু সেসব আন্দোলন তার দল বা নির্বাচনী ইমেজের দীর্ঘমেয়াদি কোনো ক্ষতি করতে পারেনি।
'ও আর লড়াই করতে পারছিল না'
ভারতের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়া সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার চাবিকাঠি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ৬ শতাংশ প্রার্থী এখানে ভর্তির সুযোগ পায়। সন্তানদের ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে অনেক পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে।
রাজস্থানের কৃষক রাজেশ কুমার জানিয়েছেন, ছেলের কোচিংয়ের খরচ জোগাতে তিনি ২৮ লাখ রুপির জমি বিক্রি করেছেন এবং ১১ লাখ রুপি ঋণ নিয়েছেন। ২২ বছর বয়সী ছেলে প্রদীপ কুমার মে মাসে ফলাফল বাতিলের কয়েকদিন পরই আত্মহত্যা করেন।
রাজেশ বলেন, 'আমরা চাষবাস করি, তেমন একটা লেখাপড়াও জানি না। কিন্তু আমার ছেলের সবসময়ের স্বপ্ন ছিল সে ডাক্তার হবে।' তিনি সাফ জানিয়েছিলেন, ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তিনি তার ছেলের চিতাভস্ম হিন্দু ধর্মীয় আচার অনুযায়ী গঙ্গায় বিসর্জন দেবেন না।
সিজেপি এবং প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস ইতিমধ্যেই আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারগুলোর জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তবে রয়টার্সের সাক্ষাৎকার নেওয়া অন্যান্য স্বজনদের মতো রাজেশও স্পষ্ট বলেছেন যে তিনি কোনো টাকা চান না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, 'আমি স্রেফ এই অন্যায়ের জবাবদিহিতা চাই।'
গুজরাটের ১৭ বছর বয়সী কাহান প্যাটেলের বাবা প্রশান্ত প্যাটেল জানান, তার ছেলেও পুনরায় পরীক্ষার চাপের কাছে হার মেনেছে। তিনি বলেন, 'ও আর লড়াই করতে পারছিল না, তাই সব শেষ করে দিল।'
অধিকারকর্মী নন্দিতা নারাইন বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং শিক্ষা খাতে বেসরকারি কোচিং বাণিজ্যের প্রভাবের বিষয়টি শিক্ষার্থীরা তুলে ধরেছে।
