১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করল ফ্রান্স
ফ্রান্সের পার্লামেন্ট ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারিসংক্রান্ত একটি বিল অনুমোদন করেছে। এর ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রথম দেশ হিসেবে টিকটকের মতো অ্যাপগুলোতে শিশুদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করল।
প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ তার মেয়াদের শেষ সময়ে এই নিষেধাজ্ঞাকে একটি প্রধান সংস্কারমূলক উদ্যোগ হিসেবে সমর্থন করেছেন এবং আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে এটি কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা একটি ভিডিওতে মাখোঁ একে 'একটি বড় অগ্রগতি' হিসেবে প্রশংসা করে বলেন, "আমাদের শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে ফ্রান্স ইউরোপকে পথ দেখাচ্ছে।'
মঙ্গলবার আইনটির পক্ষে ভোট দেওয়ায় তিনি পার্লামেন্ট সদস্যদের ধন্যবাদ জানান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'এক্স'-এ তিনি আরও লেখেন, 'এখন সাংবিধানিক পরিষদকে এ বিষয়ে রায় দিতে হবে। এরপর এই পদক্ষেপ বাস্তবে কার্যকর করার এবং আমাদের শিশুদের অনলাইনে সুরক্ষা দেওয়ার সময় আসবে।'
মঙ্গলবার দিনের শুরুতে উচ্চকক্ষে অনুমোদনের পর জাতীয় পরিষদের সদস্যরা ২৭৯ ভোটে আইনটি পাস করেন। এর বিপক্ষে ভোট পড়ে ৮১টি।
শিশুদের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকায় বিশ্বের ক্রমবর্ধমান সংখ্যক দেশ এসব মাধ্যমে শিশুদের প্রবেশাধিকার সীমিত করার পদক্ষেপ নিচ্ছে।
আইনটি দুই ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রথম ধাপে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ বছরের কম বয়সীরা নতুন কোনো অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবে না। আইন অনুযায়ী, দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে তাদের বিদ্যমান অ্যাকাউন্টগুলোর ক্ষেত্রেও এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে।
ভোটের আগে ডিজিটালবিষয়ক মন্ত্রী আনে ল্য আনা বলেন, এই সময়সূচি বাস্তবসম্মত, 'কারণ বয়স যাচাইয়ের প্রযুক্তি ইতোমধ্যেই রয়েছে এবং আরও কিছু প্রযুক্তি উন্নয়নের কাজ চলছে। আর এই নিয়ম কার্যকর করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলোর।'
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, 'চার মাসের মধ্যে ফ্রান্সে আমাদের সবাইকে নিজেদের বয়স প্রমাণ করতে হবে। কেউ যদি ১৫ বছরের কম বয়সী হয়, তাহলে তার অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হবে।'
মন্ত্রী আরও আশ্বস্ত করেন যে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখা হবে।
সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই ব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে আইনটির আরেকটি বিধান—উচ্চবিদ্যালয়ে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধকরণ—নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকেই কার্যকর করা হবে।
গত বছর ফ্রান্সের জনস্বাস্থ্য তদারকি সংস্থা জানিয়েছিল, টিকটক, স্ন্যাপচ্যাট ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো কিশোর-কিশোরীদের, বিশেষ করে মেয়েদের জন্য ক্ষতিকর। তবে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির একমাত্র কারণ এগুলো নয়।
আইনপ্রণেতারা সবাই নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত ছিলেন। তবে কীভাবে সেই নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হবে, তা নিয়ে পার্লামেন্টের দুই কক্ষের মধ্যে মতভেদ ছিল।
ফরাসি সিনেট এমন একটি দুই-স্তরবিশিষ্ট ব্যবস্থা চেয়েছিল, যেখানে শিশুদের বিকাশের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত প্ল্যাটফর্মগুলোকে আলাদাভাবে কালো তালিকাভুক্ত করা হবে এবং অন্য কিছু প্ল্যাটফর্ম অভিভাবকের সম্মতিতে ব্যবহার করা যাবে।
কিন্তু বয়স যাচাইয়ের পদ্ধতি, দ্রুত বাস্তবায়নের পরিকল্পনা, নিয়ম ফাঁকি দেওয়ার সম্ভাবনা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে বামপন্থীদের একটি অংশের সমালোচনা সত্ত্বেও নিম্নকক্ষের সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাবই শেষ পর্যন্ত বহাল থাকে।
তবে অনলাইন বিশ্বকোষ ও শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্মের মতো কিছু ওয়েবসাইটকে এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে। এছাড়া শিশু বা তাদের অভিভাবকদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তির বিধানও আইনে রাখা হয়নি।
জাতীয় পরিষদের সদস্য লোর মিলার বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, 'আমার মতে, বড় বড় প্ল্যাটফর্মগুলো মূলত এই ব্যবস্থা কার্যকর করার জন্য প্রস্তুত।'
মধ্যপন্থী সিনেটর ক্যাথরিন মরাঁ-দেসাইয়ি বলেন, কালো তালিকাভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করতে আরও বেশি সময় লাগত। কারণ এর জন্য মানদণ্ড নির্ধারণে ইউরোপীয় কমিশনের সঙ্গে নতুন করে পরামর্শ করতে হতো। পাশাপাশি ইউরোপীয় আইনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ারও 'সামান্য ঝুঁকি' ছিল।
ফ্রান্স, গ্রিস ও স্পেনসহ কয়েকটি সদস্যরাষ্ট্রের উদ্যোগের পর ইউরোপীয় কমিশনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
গত সপ্তাহে ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন ডার লাইয়েন বলেন, শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশাধিকার 'ধাপে ধাপে এবং ক্রমান্বয়ে' দেওয়া উচিত।
ইউরোপীয় কমিশন বয়স যাচাইয়ের জন্য একটি অ্যাপও উন্মোচন করেছে। ফ্রান্সসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যরাষ্ট্রগুলো গত কয়েক মাস ধরে সেটির পরীক্ষা চালাচ্ছে।
গত বছর মাখোঁর সরকার পেনশন সংস্কার স্থগিত করার পর, আগামী বছর ক্ষমতা ছাড়ার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার এই আইনই তার শেষ বড় অভ্যন্তরীণ সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ফ্রান্সের এই পদক্ষেপের দিকে ইউরোপের অন্যান্য দেশ গভীরভাবে নজর রাখবে। কারণ বিশ্বের মাত্র ২০টি দেশ এ ধরনের ব্যবস্থা প্রস্তাব করেছে বা চালু করেছে।
গত ডিসেম্বর অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে টিকটক, ইউটিউব, স্ন্যাপচ্যাটসহ অন্যান্য বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ১৬ বছরের কম বয়সীদের অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলতে বাধ্য করে। অন্যথায় এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় অঙ্কের জরিমানার বিধান রাখা হয়।
