পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় কয়েক হাজার পারমাণবিক সেন্ট্রিফিউজ সরিয়ে নিয়েছে ইরান—দাবি ইসরায়েলের
ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করছে, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের গভীরে খনন করা গোপন সুড়ঙ্গে হাজার হাজার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সেন্ট্রিফিউজ সরিয়ে ফেলেছে ইরান। ইসরায়েলি ও মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এ দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই গোয়েন্দা তথ্য ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করেছে ইসরায়েল। তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের পরপরই এই সেন্ট্রিফিউজগুলো পিকঅ্যাক্স স্থাপনায় সরিয়ে নেওয়া হয়। ওই যুদ্ধের সময় ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একজন ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময় চালানো বিমান হামলাগুলোতে পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়ন-সংক্রান্ত কার্যক্রমের ওপর যথেষ্ট জোর দেওয়া হয়নি। জার্নালকে ওই কর্মকর্তা বলেন, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনসহ আরও অনেক জায়গায় 'আমাদের এখনও প্রচুর কাজ বাকি'।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইসরায়েলের যুদ্ধ-লক্ষ্য ক্রমশ যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু চাইছেন ইরানের বিরুদ্ধে আবারও ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রাজি করাতে। মূল লক্ষ্য, তেহরানের অস্ত্র কর্মসূচি ও পুনর্গঠন প্রচেষ্টাকে আরও পিছিয়ে দেওয়া।
এদিকে গত ১০ দিনে ইরানে হামলার মাত্রা আরও তীব্র করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প বলেছেন, নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনা থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে হামলা চালাতে প্রস্তুত ওয়াশিংটন।
১৩ জুলাই ট্রাম্প পিকঅ্যাক্সকে 'একটি চমৎকার ও মোক্ষম আঘাতের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু' হিসেবে আখ্যা দেন। এই প্রথমবা প্রকাশ্যে স্থাপনাটিকে সম্ভাব্য টার্গেট হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি।
ইরানের এই ভূগর্ভস্থ কমপ্লেক্সটি মাউন্ট কোলাং নামে পরিচিত। বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এর ওপর নজর রাখছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নিরেট পাথরের নিচে প্রায় ৩০০ থেকে ৪৫০ ফুট গভীরে বিস্তৃত এই স্থাপনা। এর ভেতরে এতটাই বিশাল জায়গা রয়েছে, যেখানে অনায়াসে পারমাণবিক কর্মসূচির বেশ কয়েকটি ইউনিট বসানো সম্ভব।
ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির তথ্যমতে, গত ১৫ মাস ধরে ওই স্থাপনায় বিরতিহীনভাবে নির্মাণকাজ চলছে। ট্রাকের যাতায়াত, সুড়ঙ্গ মজবুত করা ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরির কাজ অবিরাম এগিয়ে চলেছে।
ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ডেভিড অলব্রাইট মন্তব্য করেছেন, 'পিকঅ্যাক্সের সুড়ঙ্গগুলোতে ইরান যে সেন্ট্রিফিউজগুলো সরিয়ে নিয়েছে, তা বাস্তবসম্মত।'
মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের শঙ্কা, ইরান হয়তো এই ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গগুলোকে পারমাণবিক সরঞ্জাম মজুত বা তৈরির কাজে ব্যবহার করতে পারে। অথবা ফিসাইল উপাদান (ফিশনযোগ্য পদার্থ) তৈরির জন্য একটি ছোট আকারের সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রও গড়ে তুলতে পারে সেখানে।
তবে পিকঅ্যাক্সে সেন্ট্রিফিউজের উপস্থিতি মানেই যে ইরান সেখানে সমৃদ্ধকরণ প্ল্যান্ট তৈরি করছে, বিষয়টি নিশ্চিত নয়। হতে পারে, ২০২৫ সালের জুনের হামলার পর নিজেদের অবশিষ্ট সেন্ট্রিফিউজগুলোকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে এই সুরক্ষিত জায়গায় সরিয়ে এনেছে তেহরান।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইয়ে) জানিয়েছে, ইরান ওই স্থাপনায় পরিদর্শকদের প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। এমনকি সেখানে তাদের কার্যক্রম বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও কোনো তথ্য সরবরাহ করেনি।
আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি গত মার্চে বলেছিলেন, ওই স্থানে 'পারমাণবিক কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা' রয়েছে বলে ২০২১ সালেই ঘোষণা দিয়েছিল ইরান।
