ইরানের হামলায় কয়েক ডজন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন, তথ্য প্রকাশ করেনি পেন্টাগন
শুক্রবার জর্ডানে ইরানের হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হন, নিখোঁজ হন আরও একজন। ওই হামলার আগের সপ্তাহেই জর্ডানে মার্কিন বাহিনীর ওপর আরও তিনটি পৃথক হামলা চালিয়েছিল ইরান।
সামরিক অভিযানের স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে নাম না প্রকাশের শর্তে কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওই হামলাগুলোতে কয়েক ডজন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশ কয়েকটি হেলিকপ্টার।
কিন্তু পেন্টাগন আগের ওই হামলাগুলোর তথ্য জানায়নি। হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির কোনো তথ্যই প্রকাশ করেনি। তবে সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র জানিয়েছেন, ৭ জুলাইয়ের পর থেকে ইরানের হামলায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর হতাহতের সংখ্যা প্রায় ১০০ ছুঁয়েছে।
একদিকে পেন্টাগন বলছে অপারেশনাল নিরাপত্তার কথা, অন্যদিকে রয়েছে যুদ্ধ পরিস্থিতি সম্পর্কে জনগণকে তথ্য জানানোর বিষয়ে সরকারের দায়বদ্ধতা। এই দুইয়ের মধ্যকার টানাপোড়েনই তুলে ধরছে এই ঘটনা।
গত সপ্তাহে ইরানের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে বিমান হামলার পর মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে বলেছিল, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে ইরানের হামলার জবাব হিসেবেই এই পাল্টা আক্রমণ। কিন্তু জর্ডানসহ ওই অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরানের হামলার কথা তারা একবারও উল্লেখ করেনি।
একজন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা বলেন, আহত সেনাদের ব্যাপারে তথ্য প্রকাশ করতে সেন্টকম বাধ্য নয়; বিশেষ করে যখন তারা দ্রুতই আবার ডিউটিতে ফিরে যান।
আরেক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা বলেন—পেন্টাগন কেন এমন তথ্য ফাঁস করবে, যা ইরানকে জর্ডান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য ঘাঁটিতে তাদের প্রাণঘাতী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু নিখুঁত করতে সাহায্য করবে? ওই ঘাঁটিগুলোতে কয়েক হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছেন।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, একই কারণে সেন্টকম এখন ইরানে প্রতিদিন ঠিক কতগুলো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে, সেই ঘোষণাও বন্ধ করে দিয়েছে।
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল অবশ্য দাবি করেছেন, যুদ্ধে মার্কিন হতাহতের কোনো তথ্য সেনাবাহিনী গোপন বা বিকৃত করেনি। সোমবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, 'তথ্য গোপনের এই দাবিগুলো মনগড়া। যুদ্ধে তিনজন সেনা নিহত হওয়ার পর মার্কিন জনগণকে আরও বেশি উদ্বিগ্ন করার উদ্দেশ্যেই এই মিথ্যা ছড়ানো হচ্ছে।'
তিনি পেন্টাগনের ডিফেন্স ক্যাজুয়াল্টি অ্যানালাইসিস সিস্টেমের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, মার্কিন সেনাদের নিহত ও আহত হওয়ার সবশেষ তথ্য দিয়ে এটি 'নিয়মিত আপডেট' করা হয়।
সবার জন্য উন্মুক্ত এই সাইটে সামগ্রিক পরিসংখ্যান দেওয়া থাকে ঠিকই, কিন্তু গত সপ্তাহে জর্ডানে ঘটা ব্যাপক হতাহতের মতো সুনির্দিষ্ট কোনো হামলার তথ্য সেখানে উল্লেখ থাকে না।
শন পার্নেল বলেন, ৭ জুলাইয়ের পর থেকে প্রায় ১০০ জন হতাহতের 'বেশিরভাগই' মৃদু কনকাশন বা মাথায় হালকা আঘাতের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে ৯৬ শতাংশ সেনাই আবার ডিউটিতে ফিরে গেছেন।
ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর বেশ কয়েক দিন কেটে গেছে। প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলা এই যুদ্ধের পরবর্তী মার্কিন সামরিক কৌশল নিয়ে খুব সামান্য তথ্যই দিয়েছে পেন্টাগন। যুদ্ধ নিয়ে তাদের সর্বশেষ বড় ব্রিফিং হয়েছিল মে মাসের শুরুর দিকে।
গত কয়েক মাসে ট্রাম্প প্রশাসন বেশ কিছু বিষয় গোপন করে গেছে। ইরান যুদ্ধ কীভাবে আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যয়বহুল অস্ত্রভান্ডারে টান ধরিয়েছে, সে তথ্য তারা প্রকাশ করেনি। এমনকি ইরান যে তাদের মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা শুধু ধরে রাখেনি, বরং তা নতুন করে অনেকটাই গড়ে তুলেছে—সে বিষয়টিও এড়িয়ে গেছে তারা।
যুদ্ধে মার্কিন হতাহতের বিষয়টিও সমানভাবে স্পর্শকাতর। শুক্রবার জর্ডানে দুই সেনা এবং উত্তর ইরাকে আরও এক সেনার মৃত্যু হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে এ নিয়ে মোট ১৭ জন মার্কিন সামরিক সদস্য প্রাণ হারালেন।
পেন্টাগনের ক্যাজুয়াল্টি রিপোর্টিং প্রটোকল অনুসাড়ে, নিহত সেনাদের নিকটাত্মীয়কে খবর দেওয়ার পর অন্তত ২৪ ঘণ্টা পার হলে তবেই তাদের পরিচয় জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়। আর যুদ্ধে আহত সেনাদের নাম সাধারণত প্রকাশই করা হয় না।
শনিবার এক বিবৃতিতে সেন্টকম জানায়, শুক্রবারের হামলায় আহত চার মার্কিন সেনাকে জর্ডানের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং পরে তাদের ছেড়েও দেওয়া হয়েছে। ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সামান্য আহত আরও কয়েকজন মার্কিন সেনা ইতোমধ্যেই ডিউটিতে ফিরেছেন। তবে সেই সংখ্যাটা ঠিক কত, তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি।
গত সপ্তাহে জর্ডানে আগের তিন হামলায় আহত সেনাদের কথাও ওই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়নি।
নিউজনেশন-এর সঙ্গে এক সংক্ষিপ্ত ফোনালাপে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ওই সেনারা 'দেশের সেবায়' প্রাণ দিয়েছেন।
পেন্টাগনের হতাহতের হিসাব রাখার সাইট অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৪২৭ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। সাইটটির হিসাব অনুসারে, শত্রু আক্রমণ ও অন্যান্য ঘটনায় নিহত সেনার সংখ্যা ১৪। পেন্টাগন যে নতুন প্রাণহানির ঘোষণা দিয়েছে, তা ওই অনলাইনের মৃত্যু তালিকায় এখনও যোগ বা আপডেট করা হয়নি।
আগের প্রশাসনগুলোর আমলে পেন্টাগন সাধারণত আহত সেনাদের পরিবারের কাছে খবর না পৌঁছানো পর্যন্ত এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশে দেরি করত। তবে বাইডেন প্রশাসনের সময়কালে সিরিয়া ও ইরাকের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলায় কতজন সেনা আহত হতেন, পেন্টাগন সাধারণত তা নিয়মিত রিপোর্ট করত।
