ইরানের হামলার পর পর্যটক ফিরিয়ে আনতে ৮০০ ডলারের প্রণোদনা কর্মসূচি চালু করল দুবাই
মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে দুবাইয়ের পর্যটন খাতের চিত্র আমূল বদলে গেছে। চলতি বছরের শুরুতে ২০২৫ সালে রেকর্ড ১ কোটি ৯৫ লাখ ৯০ হাজার আন্তর্জাতিক পর্যটক আগমনের সাফল্য উদযাপন করছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই নগরী।
তবে সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে অভিযানের পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। মার্চে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়ার পর দুবাইয়ে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। হোটেলগুলোতে পর্যটকদের অবস্থানের হার ৮০ শতাংশ থেকে নেমে আগামী কয়েক মাসে মাত্র ১০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এবার পর্যটক ফিরিয়ে আনতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে দুবাই কর্তৃপক্ষ।
প্রণোদনা কর্মসূচি
চলতি মাসে চালু হওয়া 'এ দুবাই ইনভাইট' কর্মসূচির আওতায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাগরিক ও বাসিন্দারা তাদের আত্মীয় বা বন্ধুদের দুবাই ভ্রমণে উৎসাহিত করলে সর্বোচ্চ ৩ হাজার দিরহাম (প্রায় ৮১৬ মার্কিন ডলার) মূল্যের পুরস্কার সুবিধা পাবেন।
বৈধ 'এমিরেটস আইডি' থাকা ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সীরা সর্বোচ্চ তিনজন অতিথির নাম প্রস্তাব করতে পারবেন। অতিথিদের ভ্রমণ শুরু করতে হবে এখন থেকে আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে।
'ভিজিট দুবাই'-এর তথ্য অনুযায়ী, মনোনীত ব্যক্তিদের অবশ্যই সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাইরে বসবাসকারী হতে হবে এবং বৈধ পর্যটক ভিসা নিয়ে আকাশপথ, সমুদ্রপথ বা সড়কপথে দুবাইয়ে প্রবেশ করতে হবে। কর্মসূচির আওতায় হোটেলে থাকার সুযোগ ও বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় ছাড়সহ নানা সুবিধা দেওয়া হবে।
দুবাইয়ের অর্থনীতি ও পর্যটন বিভাগের বিশেষ প্রকল্প ও মধ্যপ্রাচ্য-উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের সহকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট নূর আল গেজিরি বলেন, 'ভ্রমণের সিদ্ধান্তে এখন ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও বিশ্বাসযোগ্যতার গুরুত্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি। এই উদ্যোগ দুবাইয়ের বাসিন্দাদের মাধ্যমে তাদের পরিবার ও বন্ধুদের শহরটিকে নতুনভাবে জানার সুযোগ করে দেবে।'
২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দুবাইয়ে আসা ইউটিউবার লরেন ও'কনেল বলেন, 'এটি খুবই ইতিবাচক উদ্যোগ। বহুদিন ধরে দুবাইয়ে আসতে চাওয়া আমার পরিবারের সদস্যদের আমি আমন্ত্রণ জানিয়েছি। এতে এখানে বসবাসকারীরা বন্ধু ও স্বজনদের দুবাই ভ্রমণে আরও উৎসাহিত করার কারণ পাচ্ছেন।'
পর্যটক ফেরাতে এটি দুবাইয়ের সর্বশেষ উদ্যোগ। এর আগে বিলাসবহুল হোটেলের রাতপ্রতি কর স্থগিত এবং হোটেল ও রেস্তোরাঁর বিলের ওপর আরোপিত ৭ শতাংশ পৌর ফি প্রত্যাহার করা হয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর দুবাইয়ের পর্যটন ভাবমূর্তি পুনর্গঠনে কাজ করছে কর্তৃপক্ষ।
'সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন'
বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা গেলেও শহরের কয়েকটি পরিচিত স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচতারকা ফেয়ারমন্ট দ্য পাম রিসোর্ট এবং জুমেইরা বুর্জ আল আরব হোটেল। বুর্জ আল আরব বর্তমানে ১৮ মাসব্যাপী সংস্কারকাজের জন্য বন্ধ রয়েছে।
মার্চে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছিল। একই সময়ে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ও এমিরেটসসহ কয়েকটি বিমান সংস্থা সাময়িকভাবে ফ্লাইট স্থগিত করে।
বিশ্লেষকদের মতে, অবকাঠামোগত ক্ষতি মেরামত করা সম্ভব হলেও সংঘাতের কারণে যে ভাবমূর্তির ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হতে পারে।
ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের আরব উপদ্বীপ ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বিশেষজ্ঞ সিনজিয়া বিয়ানকো বলেন, 'অশান্ত অঞ্চলের মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়স্থল—দুবাইয়ের এই পরিচয়ই ছিল তার সবচেয়ে বড় শক্তি। এই ভাবমূর্তিতে আঘাত লাগা দুবাইয়ের জন্য সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন।'
এখনও বিভিন্ন দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভ্রমণের বিষয়ে সতর্কতা জারি রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রও নাগরিকদের দেশটিতে ভ্রমণের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিচ্ছে।
গেটস হসপিটালিটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী নাঈম মাদাদ বলেন, 'এই পরিস্থিতি মানুষের মধ্যে দ্বিধা তৈরি করেছে, তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতি আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়নি। আন্তর্জাতিক পর্যটকেরা অনেক সময় পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক অঞ্চল হিসেবে দেখেন। ফলে একটি দেশের সংঘাত অন্য দেশের পর্যটনেও প্রভাব ফেলে।'
তিনি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিমানবন্দর, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও পর্যটনকেন্দ্র স্বাভাবিকভাবে চালু রয়েছে। তবে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অবকাঠামো নয়, মানুষের মানসিকতা।
