হরমুজ নিয়ে ইরান-আমেরিকার যুদ্ধ: ঝুঁকিতে ফেলেছে বিশ্বের অন্যান্য নৌপথকেও
গত জুনের শেষের দিকে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পরপরই—ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া জাহাজ এবং ১১ হাজারেরও বেশি নাবিককে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য একটি বিশেষ অভিযানের ঘোষণা দেয়। গত ফেব্রুয়ারির শেষদিকে ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকে এই কৌশলগত আন্তর্জাতিক নৌপথটি কার্যত বন্ধ করে রেখেছিল তেহরান।
আইএমও জানিয়েছিল, এই উদ্ধার অভিযান ইরান, ওমান, অঞ্চলের অন্যান্য উপকূলীয় রাষ্ট্র, যুক্তরাষ্ট্র ও সামুদ্রিক বাণিজ্য শিল্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে পরিচালনা করা হবে।
অবরুদ্ধ জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালির উত্তর দিকে অবস্থিত ইরানের উপকূলীয় রুট ব্যবহার না করে, বরং ওমানের উপকূল ঘেঁষে প্রণালির দক্ষিণ দিক দিয়ে চলাচলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
এই উদ্ধার অভিযানের জন্য আলোচনায় অংশ নেওয়া সাবেক নাবিক এবং বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের মেরিটাইম অপারেশন কো-অর্ডিনেটর জন কানিয়াস বলেন, "ওই এলাকায় আটকে পড়া ৬০০-র বেশি জাহাজের মধ্যে ১০০টিরও বেশি জাহাজ… কোনোমতে বের হতে পেরেছিল।"
তবে জাহাজ চলাচলের গতিবিধি ট্র্যাককারী সংস্থা মেরিনট্রাফিক-এর তথ্য অনুযায়ী, ওমানের সবচেয়ে কাছের রুটটি ব্যবহার করার সময় 'এভার লাভলি' নামক সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী একটি জাহাজ হামলার শিকার হলে— মাত্র দু-এক দিন পরেই এই উদ্ধার অভিযান পুরোপুরি থমকে যায়। এর ফলে হরমুজ প্রণালি ধরে জাহাজ চলাচল আবারও স্থবির হয়ে পড়ে।
যদিও এই হামলার দায় কেউ স্বীকার করেনি, তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি-র তথ্য অনুযায়ী, দেশটির রেভল্যুশনারি গার্ড এই উদ্ধার অভিযানের তীব্র সমালোচনা করেছে। তাদের দাবি, ইরানের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা ছাড়াই এই অপারেশন পরিচালনা করা হয়েছিল, অথচ জাহাজগুলো কোন রুট দিয়ে চলাচল করবে—তা নির্ধারণ করার একমাত্র অধিকার কেবল ইরানেরই রয়েছে। কানিয়াস এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত হতাশাজনক বলে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, "এটি যেন সেই একই বৃত্তে বারবার ফিরে আসার মতো পরিস্থিতি, তাই না? যখন একটা পথ খোলার সম্ভাবনা তৈরি হয়, আবার পরক্ষণেই তা বন্ধ হয়ে যায়।"
চলমান এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধে যাতায়াত করত। কিন্তু এখন এই প্রণালীটি পুরোপুরি ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা নৌযান চলাচলের স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলছে এবং অন্যান্য বৈশ্বিক নৌপথের জন্যও একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করছে। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার চলমান এই লড়াই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখারও দ্বন্দ্ব।
বৈশ্বিক রাজনৈতিক ঝুঁকি বিষয়ক গবেষণা ও পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান 'ইউরেশিয়া গ্রুপ'-এর জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রিউ বলেন, তেহরান মনে করছে আমেরিকার সঙ্গে এই সংঘাতের ক্ষেত্রে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে এবং তারা এই প্রণালিতে একটি নতুন বাস্তবতা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, "[হরমুজে] যেকোনো জাহাজের আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে এখন তাদের (ইরানের) সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে এবং তাদের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। আর এই ব্যবস্থাকে ক্ষুণ্ন করতে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো প্রচেষ্টাকেই তারা প্রতিহত করছে।"
অথচ হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে স্বীকৃত, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির 'ন্যাশনাল সিকিউরিটি ল' প্রোগ্রামের পরিচালক এবং মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক আইনজীবী টড হান্টলি বলেন, এই প্রণালির ওপর মালিকানা দাবি করার চেষ্টা মুক্তভাবে নৌযান চলাচলের দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক ঐতিহ্যের পরিপন্থী।
তিনি বলেন, "আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের পর—মার্কিন নৌবাহিনীকে পুনর্গঠন করার মূল কারণই ছিল এটি নিশ্চিত করা যে... মার্কিন বাণিজ্যিক জাহাজ এবং অন্যান্য নৌযান যেন সমুদ্রের যেকোনো স্থানে অবাধে চলাচল করতে পারে।"
হান্টলি সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিলে—তা একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করতে পারে, কারণ অন্যান্য দেশও তখন তাদের সীমান্ত লাগোয়া গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর ওপর একই ধরনের একক অধিকার দাবি করতে পারে।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, "যেমন যুক্তরাজ্য বা মরক্কো জিব্রাল্টার প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ দাবি করতে পারে, কিংবা মালয়েশিয়া প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরের মধ্যকার প্রধান নৌপথ মালাক্কা প্রণালির ওপর একক নিয়ন্ত্রণ দাবি করে বসতে পারে। তখন এমন একটি ঝুঁকি তৈরি হবে যে অন্য দেশগুলোও নিয়ন্ত্রণ দাবি করবে এবং এরপর জাহাজ চলাচলের ওপর অতিরিক্ত সারচার্জ বা নানা বিধিনিষেধ আরোপ করবে।"
মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ 'উইন্ডওয়ার্ড'-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) অ্যামি ড্যানিয়েল বলেন, কোনো দেশের হাতে কৌশলগত নৌপথের একক নিয়ন্ত্রণ চলে গেলে তারা তা আঞ্চলিক বিরোধ মেটানোর কাজে কিংবা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
তিনি বলেন, "রাশিয়া তখন বলতে পারে, আমরা মার্কিন জাহাজগুলোকে নর্দার্ন প্যাসেজ বা আর্কটিক সাগর দিয়ে যেতে দেব না। অথবা চীন বলতে পারে যে, আমেরিকান কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হলে তারা তাইওয়ান প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন করতে পারবে না।"
লন্ডনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউস-এর ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রোগ্রামের ফেলো নিত্যা লাভ বলেন, নৌপথের ওপর এই ধরনের হুমকি ইতিহাসের প্রতিটি যুগেই ছিল। তবে তিনি উল্লেখ করেন যে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সংঘাত এড়ানোর জন্য সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক বা আইনি ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
তিনি বলেন, "তুরস্কের প্রণালিগুলো [বসফরাস ও দার্দানেলেস] 'মনট্রে কনভেনশন' নামক একটি চুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। যুদ্ধ বা সংঘাতের সময়েও ওই নৌপথগুলোকে সুরক্ষিত রাখার জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছিল চুক্তির শর্তগুলো।" তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে ধারাবাহিক বেশ কিছু চুক্তির মাধ্যমে মালয় উপদ্বীপ ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যবর্তী মালাক্কা প্রণালিকেও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করা হয়, কারণ সেখানেও নিরাপত্তা হুমকির আশঙ্কা ছিল।
তিনি বলেন, "হরমুজ প্রণালি হচ্ছে এমন অনেকগুলো নৌপথের মধ্যে একটি, যার সুরক্ষায় এই ধরনের পর্যাপ্ত কূটনৈতিক বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি।"
বৈশ্বিক নৌপথগুলো পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক নিয়ম ও চুক্তি রয়েছে। যেমন জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বিষয়ক কনভেনশন (আনক্লস)। তবে ইরান বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র—কোনো দেশই এই চুক্তিটি অনুমোদন করেনি। নিত্যা লাভ বলেন, ইরানের মতো দেশ কিংবা ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মতো অরাষ্ট্রীয় শক্তির কাছে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের গুরুত্ব খুবই সামান্য। উল্লেখ্য, এই হুথিরাই কয়েক বছর আগে লোহিত সাগরে ১৯০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে বিশ্ববাণিজ্যে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটিয়েছিল। তিনি মনে করেন, সাম্প্রতিক সময়ের সংঘাতগুলোর প্রেক্ষাপটে, আন্তর্জাতিক নৌপথগুলো কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায় তা নিয়ে এখন বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, "বিশ্ব এখন এই বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে যেখানে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, বাণিজ্য নীতি কিংবা সামুদ্রিক আইনগুলো যেভাবে [বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলকে] নিরাপত্তা দেওয়ার কথা ছিল, তা দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে।"
গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেই হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এমনকি সেখান থেকে টোলও আদায় করতে পারে। যদিও পরে তিনি দ্রুত এই বক্তব্য থেকে সরে আসেন। আর ট্রাম্পের এমন মন্তব্য, আন্তর্জাতিক নৌপথগুলোর স্বাধীনতার বিষয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগকে আরও উসকে দিয়েছে।
