ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত অন্তত ৩৫, বাহরাইন-কুয়েতে মার্কিন স্থাপনায় হামলার দাবি তেহরানের
ইরানে নতুন করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার রাতভর দেশটির দক্ষিণ উপকূল ঘেঁষে কৌশলগত বিভিন্ন স্থানে এসব হামলা চালানো হয়।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজের জন্য হুমকি হিসেবে ব্যবহৃত ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এছাড়া ইরানের বন্দরগুলোর ওপর পুনর্বহাল করা নৌ অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করা একটি জাহাজেও হামলা চালানো হয়েছে।
হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে বড় দ্বীপ কেশমে একাধিক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। বিস্ফোরণ হয়েছে বন্দর আব্বাস নগরীতে। হরমুজ প্রণালির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী সিরিকেও হামলা হয়েছে। ইরানের দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলের সিস্তান প্রদেশের বন্দরনগরী চাবাহার, কোনারাক এবং রাস্ক থেকেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের চলমান হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৫ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
এদিকে ইরান দাবি করেছে, তারা বাহরাইন ও কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। দেশটির সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা জর্ডানের আজরাক বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা, একটি স্থায়ী রাডার স্থাপনা এবং জ্বালানি ডিপোতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
ফারস বার্তা সংস্থার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইরানের সেনাবাহিনী জানায়, এই হামলা তাদের 'সায়েকেহ' অভিযানের নবম ধাপ। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ওপর চালানো হামলার জবাবে এ অভিযান চালানো হয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সমন্বিত হামলা চালিয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, 'নাসর-২' অভিযানের অষ্টম ধাপে তারা ঘাঁটির একটি সি-র্যাম আগাম সতর্কীকরণ রাডার এবং মার্কিন সেনাদের একটি সমাবেশস্থল লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
বিবৃতিতে আরও অভিযোগ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে কুয়েতের ভূখণ্ড ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে কুয়েতের জনগণের প্রতি দেশটি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দাবি তোলার আহ্বানও জানায় আইআরজিসি।
এছাড়া, দক্ষিণ–পশ্চিমের আন্দিমেস্ক শহরের আকাশে 'শত্রুপক্ষের' এমকিউ–৯ ড্রোন শনাক্ত ও ধ্বংস করার দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। দেশটির তাসনিম সংবাদ সংস্থা এ তথ্য জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘাতের পঞ্চম দিনে যুদ্ধ অবসানে হওয়া প্রাথমিক সমঝোতা (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) আরও চাপের মুখে পড়েছে। ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, 'এই সমঝোতা থেকে যদি ইরানের কোনো লাভ না হয়, তাহলে এটি মেনে চলার কোনো কারণ নেই।'
এর আগে মঙ্গলবার রাতেই ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, আগামী সপ্তাহে ইরান আলোচনায় না ফিরলে দেশটির সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালানো হতে পারে।
বুধবার সাংবাদিকরা তাকে জিজ্ঞাসা করেন, হামলার আগে কোনো সময়সীমা দেবেন কি না। জবাবে তিনি বলেন, 'আমি সময়সীমা দিতে পছন্দ করি না। তবে তারা মোটামুটি জানে কী ঘটতে যাচ্ছে... তাদের ঠিকভাবে চলতে হবে।'
পরে এক প্রতিরক্ষা সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, 'ইরান এখন মোটেও সুখে নেই। তারা খুব করেই সমঝোতা করতে চায়। আমরা যা করছি, তা তাদের ভালো লাগছে না। এখন দেখা যাক, আমরা তাদের সঙ্গে সমঝোতা করব, নাকি বিষয়টি পুরোপুরি শেষ করে দেব।'
অন্যদিকে গালিবাফ বলেন, হরমুজ প্রণালিতে 'ইরানের নিজস্ব ব্যবস্থা' বজায় রাখাই দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে 'অস্তিত্বের লড়াইয়ে' ইরানের প্রতিরোধ কৌশলের অংশই হলো যুদ্ধের পাশাপাশি আলোচনা চালিয়ে যাওয়া।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ইরানের বন্দরগুলোতে পুনরায় নৌ অবরোধ আরোপের পর দুটি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে। এই অবরোধের ফলে ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় জাহাজের প্রবেশ ও প্রস্থান বন্ধ রয়েছে।
দুই দেশ গত মাসে কয়েক মাসের সংঘাতের অবসান ঘটাতে যে সমঝোতা স্মারক সই করেছিল, তার অংশ হিসেবে আগে এই অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছিল। তবে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বিরোধ এখন দুই দেশের মধ্যে অন্যতম প্রধান বিরোধের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
মার্কিন অবরোধ পুনর্বহালের জবাবে আইআরজিসি সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট 'অন্যান্য তেল ও গ্যাস রপ্তানি পথ' বন্ধ হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তবে কোন কোন রুট এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে, সে বিষয়ে কোনোকিছুই বিস্তারিত জানানো হয়নি।
