পারমাণবিক কর্মসূচির চেয়ে কেন ইরানের কাছে বড় অগ্রাধিকার হয়ে উঠল হরমুজের ‘স্বর্ণাস্ত্র’
হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ এখন ইরানের কাছে একটি 'স্বর্ণাস্ত্র' বা অভূতপূর্ব সুযোগ হয়ে উঠেছে। এর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের জন্য দেশটি এমনকী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা বাড়াতেও প্রস্তুত। এমনকি কয়েক দশক ধরে নানামুখী আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে চালিয়া যাওয়া নিজেদের দীর্ঘদিনের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচির চেয়েও— এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ এখন তেহরানের কাছে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
ইরানের কৌশলগত নীতিতে এই বিষয়টি এখন এতটাই কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যে, তেহরানের অনুমোদন ছাড়া চলতি সপ্তাহে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার সময় কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা করা হয়েছে। এর জেরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ইরানের যে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে, তা গত মাসে স্বাক্ষরিত দুই পক্ষের মধ্যকার অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তিকে চরম হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। দীর্ঘ বছর ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক রুটটি বন্ধ করা বা সেখানে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা থেকে বিরত থাকা ইরানি নেতারা— এখন এটিকে পশ্চিমাদের সঙ্গে বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক বিরোধের ক্ষেত্রে তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী 'কার্ড' হিসেবে দেখছেন। তেহরানের মতে, এর আগে এই জলপথ অবরুদ্ধ করার কারণেই শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ্য করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির সদস্য ইব্রাহিম আজিজি লিখেছেন, "হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নতুন ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দিন; সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য এটিই একমাত্র পথ।"
হরমুজের ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার বিষয়ে তেহরানের অনড় অবস্থান, বিশ্বের বাকি অংশের সঙ্গে আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করলেও— ইরানের অভ্যন্তরীণ নীতিতে এই বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই বলে বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন দেশটির দুই জ্যেষ্ঠ সূত্র।
ইরানের শীর্ষ নীতি-নির্ধারণী মহলে এমন আলোচনা হয়েছিল যে, তেহরান তার ক্ষমতার অতিরিক্ত ঝুঁকি নিয়ে ফেলছে কি না। তবে তাদের সামগ্রিক ও চূড়ান্ত দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, কোনো যৌক্তিক দেশ নিজেদের হাতের এমন একটি শক্তিশালী লেভারেজ বা প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম কোনোভাবেই ছেড়ে দিতে পারে না বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, "হরমুজ ইস্যুটি ইরানের জন্য একটি স্বর্ণাস্ত্র, যা তারা (পশ্চিমারা) এখন কৌশলগতভাবে ইরানের কাছ থেকে কেড়ে নিতে চায়; কিন্তু এটা করা তাদের জন্য একেবারেই অসম্ভব।"
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সই করা অন্তর্বর্তী চুক্তিটি এই প্রণালী দিয়ে নৌযান চলাচল বাড়ানোর সাময়িক সুযোগ করে দিলেও, জলপথটির চূড়ান্ত ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চুক্তির শর্ত বা শব্দচয়নগুলো বেশ অস্পষ্টই রয়ে গেছে।
উভয় পক্ষের সই করা সমঝোতা স্মারকটিতে (এমওইউ) বলা হয়েছে, ইরান "বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলের জন্য তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে এবং এটি কেবল ৬০ দিনের জন্য কোনো প্রকার ফি বা শুল্ক ছাড়াই কার্যকর থাকবে।"
ইরানি আলোচকরা এই বাক্যটিকে জলপথটি পরিচালনার ক্ষেত্রে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের সার্বিক অধিকারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রকার পরোক্ষ স্বীকৃতি হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন; যদিও তা প্রথম দুই মাসের জন্য কোনো ফি বা টোল আদায় না করার শর্তে দেওয়া হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ইরানের এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মতে, চুক্তির ভাষার অর্থ কেবল এই যে—ইরান আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল সহজতর করতে বাধ্য থাকবে, কোনোভাবেই শক্তি প্রয়োগ করে কোনো বিধিনিষেধ বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারবে না।
পারমাণবিক ইস্যুর চেয়ে হরমুজ এখন বড় অগ্রাধিকার
ইরানের এই অনড় অবস্থানের অন্যতম প্রধান কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাদের গভীর অবিশ্বাসের জায়গা। ২০১৮ সালে ট্রাম্পের পরমাণু চুক্তি থেকে একতরফাভাবে বের হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত, গত গ্রীষ্মে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর— এই বছর আবারও আকস্মিকভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামা এবং কূটনৈতিক আলোচনা চলার মাঝেই কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়া যুদ্ধ শুরু করার কারণে এই পারস্পরিক আস্থার সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ইরান যদি এখন হরমুজ ইস্যুতে পিছু হটে বা নরম অবস্থান দেখায়, তবে ট্রাম্প পারমাণবিক ফাইল এবং ইরানের প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে তাঁর অযৌক্তিক দাবির তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দেবেন। তাঁর মতে, এমন পদক্ষেপের অর্থ হবে "শত্রুর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ, যা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।"
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা চলাকালে বহু বছর ধরে ইরান সতর্ক করে আসছিল, তারা যেকোনো সময় এই প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে। এমনকি ইরানি নেতারা একবার এই হুঁশিয়ারিও দেন যে, এটি করা "এক গ্লাস পানি খাওয়ার মতোই সহজ"। তবুও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে এটি করতে অনিচ্ছুক ছিলেন এবং এই পদক্ষেপকে তাদের একদম 'শেষ অস্ত্র' হিসেবে দেখতেন।
তাদের এই দীর্ঘদিনের দ্বিধার পেছনের মূল কারণ ছিল আন্তর্জাতিকভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ভয়। কারণ এমন কোনো কঠোর পদক্ষেপে উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি ভোক্তা রাষ্ট্রগুলো চরম ক্ষুব্ধ হতো, যা শেষ পর্যন্ত ইরানের নিজস্ব ভঙ্গুর অর্থনীতিকেই বড় ধরনের আঘাত করত।
কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আকস্মিক যৌথ হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং অন্যান্য শীর্ষ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের হত্যা করে, তখন ইরানি নীতি-নির্ধারকরা মনে করেন তাদের আর হারানোর কিছুই নেই। তারা নিজেদের নৌযান ছাড়া বাকি সব ধরনের আন্তর্জাতিক চলাচলের জন্য এই প্রণালীটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় বা বিঘ্ন ঘটায়।
বিশ্ববাজারে তেলের আকাশচুম্বী দামের ওপর এর বিধ্বংসী প্রভাব নিয়ে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বের পর, ওয়াশিংটন গত এপ্রিল মাসে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নিজস্ব কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করে।
অবশেষে হরমুজ অবরোধের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত খেসারত উভয় পক্ষের জন্যই এতটাই চড়া হয়ে ওঠে যে তারা একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে পৌঁছাতে সম্মত হয়। তবে একবার প্রণালীটি বন্ধ করে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করার পর, ইরান এখন বিশ্বাস করছে—এই জলপথ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাকে তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক রূপ দিতে হবে।
স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ ইউনিভার্সিটির আধুনিক ইতিহাসের অধ্যাপক আলী আনসারি বলেন, "উভয় পক্ষই তাদের তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সংকট নিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে ছিল। তবে একই সাথে দুই পক্ষই মনে করছে, এই লড়াইয়ে তারাই জয়ী হয়েছে। ফলে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে কেবল আরও কিছুটা চাপ প্রয়োগ করতে হবে, উভয়ের মধ্যে এমন একটি মনোভাব কাজ করছে।"
ইরান এখন পারমাণবিক বিষয়ের চেয়ে হরমুজ প্রণালীর ওপর অনেক বেশি মনোনিবেশ করছে। কারণ পারমাণবিক ইস্যুতে তেহরান মনে করে, ওয়াশিংটন ইতিমধ্যেই তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং বিদ্যমান উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদকে লঘু করার প্রযুক্তিগত অধিকারকে এক প্রকার মেনে নিয়েছে।
পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি গত প্রায় ২৫ বছর ধরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিরোধের সবচেয়ে বড় উৎস ছিল। মূলত এটিই দেশটির ওপর আন্তর্জাতিক মহলের বড় ধরনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ হয়েও ওঠে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি গুঁড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকারও ট্রাম্পের যুদ্ধ শুরুর প্রধান ঘোষিত লক্ষ্যের মধ্যে ছিল।
তবে যুদ্ধ অবসানের এই নতুন অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত মূল আলোচনাকে পরবর্তী পর্যায়ের বা আলোচনার জন্য এক পাশে সরিয়ে রাখা হয়।
ইরানের জ্যেষ্ঠ সূত্রগুলো রয়টার্সকে স্পষ্ট করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ না হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা বা নিয়ন্ত্রণ মেনে নিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তেহরান পারমাণবিক ইস্যুতে কোনো ধরনের নতুন আলোচনা শুরু করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
