‘শুনতে পাচ্ছেন এখন?’: মোবাইল নেটওয়ার্ক সঙ্কটে যুক্তরাজ্য, গতিতে কাজাখস্তান-কম্বোডিয়ারও পেছনে
ব্রিটেনজুড়ে মোবাইলে সিগন্যালের খোঁজে কেউ পাহাড়ে উঠছেন, কেউ আবার দুই হাত উঁচু করে ফোন আকাশের দিকে ধরে রাখছেন। আবার কেউ ডাইনিং রুমে এদিক-ওদিক হাঁটছেন, কেউ রান্নাঘরের চেয়ারের ওপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে বলছেন, 'এখন কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন?'—এরপরই আরেকটি কণ্ঠ, 'একটু দাঁড়ান, এখানে সিগন্যালটা ভালো।'
বর্তমানে যুক্তরাজ্যের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক চিরচেনা দৃশ্য এটি। তারা মূলত দেশটির দিন দিন অবনতিশীল মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবস্থার নির্মম শিকার, যা বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী এই অর্থনীতিকে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো থেকে কয়েক বছর পিছিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
যুক্তরাজ্যে ফোনের নেটওয়ার্ক সিগন্যাল এখন এতটাই খারাপ যে, দেশটির ডাউনলোড স্পিড কাজাখস্তান, কম্বোডিয়া এবং রোমানিয়ার মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর চেয়েও ধীরগতির।
আর এই সমস্যাটি কেবল পুরু দেয়ালের বাড়ি কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামীণ জনপদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বৈশ্বিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অ্যাকসেনচারের মালিকানাধীন ডেটা কোম্পানি 'ওকলা'-র তথ্য অনুযায়ী, স্বয়ং রাজধানী লন্ডনের নেটওয়ার্ক পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে সেখানকার ডাউনলোড স্পিড যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের খারকিভ শহরের চেয়েও খারাপ!
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের প্রাচীন ও জরাজীর্ণ অবকাঠামোকে আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় কাউন্সিলের 'নিমবি' (নট ইন মাই ব্যাকইয়ার্ড—নিজের আঙিনায় নয়) নীতি ও আইনি জটিলতা। এই আমলাতান্ত্রিক জট পুরো দেশকে যেন 'লোডিং স্ক্রিন'-এর গোলকধাঁধায় আটকে রেখেছে।
নতুন মোবাইল টাওয়ার বসানো নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী আইনি লড়াইয়ের কারণে, দেশের ৯৬ শতাংশ এলাকা ৪জি নেটওয়ার্কের আওতায় থাকা সত্ত্বেও ক্রমবর্ধমান ডেটার চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে টেলিকম অপারেটরগুলো। ফলে জনাকীর্ণ স্থানে, বিশেষ করে চলন্ত ট্রেনে বা ব্যস্ততম এলাকায় ফোনে চার বার সিগন্যাল দেখানোর পরও গ্রাহকেরা ইন্টারনেট ব্যবহার করতে বা একটি সাধারণ ফোন কল করতেও পারছেন না।
গত মাসে সাবেক নিরাপত্তা মন্ত্রী টম টুগেনধাত—যিনি বিগত সরকারের অধীনে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন, তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, লন্ডনের মোবাইল সিগন্যাল এখন এক দশক আগের যুদ্ধবিধ্বস্ত কাবুলের চেয়েও খারাপ হয়ে গেছে এবং যুক্তরাজ্যের বিশাল অঞ্চলে ফোনগুলো এখন স্রেফ 'অকেজো' হয়ে পড়েছে।
এই নেটওয়ার্ক সংকট কাটাতে না পারলে দেশ একটি দীর্ঘস্থায়ী উৎপাদনশীলতার সংকটে পড়বে—এমন সতর্কবার্তার পর আইনি জটিলতা ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমাতে মন্ত্রীদের ওপর চাপ বাড়ছে।
ইই, ভার্জিন ওটু এবং ভোডাফোনথ্রি-এর প্রতিনিধিত্বকারী বাণিজ্য সংস্থা 'মোবাইল ইউকে' -এর পলিসি ডিরেক্টর গ্যারেথ এলিয়ট বলেন, যুক্তরাজ্য এখন এক 'গুরুত্বপূর্ণ' সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামকে এই পরিস্থিতি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধান করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, 'টেলিকম অপারেটরদের বিশাল বিনিয়োগ সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় যুক্তরাজ্যের মোবাইল সংযোগ অনেক পিছিয়ে রয়েছে এবং জরুরি ভিত্তিতে এর সমাধান করা প্রয়োজন। একটি উন্নত মোবাইল সংযোগ দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসার প্রবৃদ্ধি এবং উন্নত নাগরিক পরিষেবা নিশ্চিত করে। নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ১০০ দিনের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত এই বিষয়ে স্পষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া।'
অপারেটররা জানিয়েছেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের কারণে কাউন্সিলের পরিকল্পনা কর্মকর্তারা নতুন মোবাইল টাওয়ার নির্মাণের অনুমতি দিচ্ছেন না। এমনকি বর্তমান টাওয়ারগুলোর সামান্য অ্যান্টেনা পরিবর্তনের মতো ছোটখাটো আধুনিকায়নের জন্যও কাউন্সিলের অনুমতির প্রয়োজন হয়।
তাছাড়া নতুন বহুতল ভবন নির্মাণের ফলে সিগন্যাল বাধাগ্রস্ত হলে শহরের মোবাইল টাওয়ারগুলো প্রায়ই স্থানান্তরিত করতে হয়। সাময়িকভাবে অপারেটররা অস্থায়ী টাওয়ার বসাতে পারলেও, ফরাসি বা ব্রিটিশ আইন অনুযায়ী তা সর্বোচ্চ ১৮ মাসের জন্য রাখা যায়। অথচ একটি নতুন টাওয়ারের অনুমোদনের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতেই দুই বছরের বেশি সময় লেগে যায়। ফলে অনুমোদন পাওয়ার আগেই নেটওয়ার্কের একটি বড় অংশ হারিয়ে যায়।
যুক্তরাজ্যের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, জাতীয় অবকাঠামো উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে স্থানীয় কাউন্সিলের হাতে। লন্ডনের মতো বড় শহরে যেখানে ৩০টিরও বেশি স্থানীয় কাউন্সিল রয়েছে, সেখানে রাস্তার একপাশে নতুন টাওয়ারের অনুমোদন মিললেও অন্য পাশে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। অথচ বর্তমান ধারায় প্রতি বছর মোবাইল ডেটা ট্রাফিকের পরিমাণ প্রায় এক-পঞ্চমাংশ করে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, শহরাঞ্চলের বাইরে সর্বোচ্চ ৩০ মিটার উচ্চতার টাওয়ার তৈরি করা যায়—যা যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদিত উচ্চতার অর্ধেক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কাউন্সিলের সঙ্গে অপারেটরদের বিরোধের এক অন্তহীন চক্র তৈরি করছে।
সরকার টাওয়ারের উচ্চতা সংক্রান্ত কিছু নিয়ম শিথিল করেছে এবং আরও পরিবর্তনের জন্য আলোচনা করছে। কিন্তু 'বাফারিং ব্রিটেন' ক্যাম্পেইন গ্রুপের জ্যাক রওলেট বলেন, যতক্ষণ না স্থানীয় কাউন্সিলের এই 'নিমবি' মানসিকতা দূর করা যাবে, ততক্ষণ দেশকে অদূর ভবিষ্যতে 'লোডিং স্ক্রিন'-এই আটকে থাকতে হবে।
তিনি বলেন, 'আমাদের আইনি ব্যবস্থা মোবাইল নেটওয়ার্ককে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে এবং আজ আমাদের আজারবাইজান, কাজাখস্তান ও থাইল্যান্ডের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর চেয়েও পেছনে ফেলে দিয়েছে। রাজনীতিবিদরা এই সমস্যার সমাধান না করা পর্যন্ত গ্রাহকদের ড্রপ কল, ভিডিও বাফারিং এবং ইমেইল না পাঠানোর মতো ভোগান্তির মাসুল গুণতেই হবে।'
ক্যাম্পেইন গ্রুপটি টেলিকম নিয়ন্ত্রক সংস্থা 'অফকম'-এর পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, দেশের সিংহভাগ অঞ্চল ৪জি নেটওয়ার্কের আওতায় থাকায় কাউন্সিলগুলো নতুন টাওয়ারের আবেদন প্রত্যাখ্যান করার একটি মোক্ষম অজুহাত পেয়ে যায়।
অন্যান্যরা বলছেন, ২০১৭ সালে প্রবর্তিত কার্যকর ভাড়া নীতি বা সীমাবদ্ধতার কারণে জমির মালিকেরা তাদের জমিতে টাওয়ার বসাতে দিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন, যা অপারেটরদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে আরও কঠিন করে তুলেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে অবকাঠামো খাতে টেলিকম শিল্পের বিনিয়োগ ছিল মাত্র ১৮০ কোটি পাউন্ড, যা ২০২০ সালে ছিল ২৩০ কোটি পাউন্ড।
তবে সরকারের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, মন্ত্রীদের প্রধান লক্ষ্য হলো পুরো যুক্তরাজ্যজুড়ে মোবাইল কভারেজ বাড়ানো। তিনি বলেন, 'শেয়ার্ড রুরাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্তত একটি অপারেটরের ৪জি কভারেজ এখন যুক্তরাজ্যের ৯৬ শতাংশের বেশি ভূখণ্ডে পৌঁছেছে। আমরা নেটওয়ার্কের কর্মক্ষমতা বাড়াতে এবং আইনি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে অফকমের সঙ্গে কাজ করছি।'
অফকমের অবকাঠামো ও সংযোগ বিভাগের প্রধান নাটালি ব্ল্যাক বলেন, 'মানুষ এমন সংযোগ আশা করে যার ওপর তারা ভরসা রাখতে পারে—আর এটি নিশ্চিত করতে একটি যৌথ জাতীয় প্রচেষ্টার প্রয়োজন। আমরা আমাদের ভূমিকা পালন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমরা শিল্প, সরকার ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করব যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং নাগরিক জীবনকে আরও সহজ করা যায়।'
