হিউম্যানয়েড ও রোবট: বৈশ্বিক উৎপাদনের আধিপত্য ধরে রাখতে চীনের সহায়ক হতে পারে
মাত্র এক দশক আগেও খুব কম মানুষই হয়তো গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করেছিলেন যে একদিন চীন বৈশ্বিক অটোমোবাইল শিল্পে আধিপত্য করবে। কিন্তু আজ চীনকে এই খাতের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বজুড়ে বিক্রি হওয়া বৈদ্যুতিক যানের (ইভি) অর্ধেকেরও বেশি উৎপাদন করছে দেশটি।
এমনকী জার্মানি ও জাপানকে টপকে চীন এখন বিশ্বের বৃহত্তম গাড়ি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে।
অন্যান্য বেশ কিছু শিল্পখাতেও চীনের এই আধিপত্যের চিত্র স্পষ্ট। যেমন ব্যাটারি রপ্তানিতে চীনের বাজার অংশীদারত্ব ৪৭ শতাংশ, মোবাইল ফোনে ৪৩ শতাংশ এবং সেমিকন্ডাক্টর যন্ত্রাংশে ৩৬ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ধারণা করা হয় যে, বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ১৫টি রপ্তানি খাতের বৈশ্বিক বাজারের অতিরিক্ত ১৯ শতাংশ অংশীদারত্ব এককভাবে চীনের নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
চীনের এই রপ্তানি যন্ত্র থমকে যাওয়ার কোনো লক্ষণই দেখাচ্ছে না। মরগ্যান স্ট্যানলির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, বর্তমানে বৈশ্বিক রপ্তানিতে চীনের যে ১৫ শতাংশ অংশীদারত্ব রয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে তা বেড়ে ১৬.৫ শতাংশে পৌঁছাবে।
দেশটি প্রতিনিয়ত নতুন নতুন খাত চিহ্নিত করছে এবং সেগুলোকে লক্ষ্য বানিয়ে কাজ করছে। বিশেষ করে হিউম্যানয়েড (মানুষের মতো দেখতে রোবট) এবং সাধারণ রোবট শিল্পে ইভি খাতের মতো সাফল্যের পুনরাবৃত্তির প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
দেশটির রোবট রপ্তানির তথ্য ইতিমধ্যেই ইভি খাতের প্রাথমিক দিনগুলোর কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। গত মার্চ পর্যন্ত পূর্ববর্তী ১২ মাসে চীনের হিউম্যানয়েড ও রোবট রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে চীনের ইভি রপ্তানিও ঠিক এই পর্যায়েই ছিল। কিন্তু মাত্র ছয় বছরের মধ্যে সেই রপ্তানি বার্ষিক ৮ হাজার ৬০০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে এবং প্রতি বছর প্রায় ৭০ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছে।
২০১৭ সালে চীনের রপ্তানি পণ্যের তালিকায় ইভি-র অবস্থান যেখানে ছিল ১,৯৪৪তম, আজ তা দশম স্থানে উঠে এসেছে। মরগ্যান স্ট্যানলির এশিয়া অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ চেতন আহিয়ার মতে, হিউম্যানয়েড রোবটও ঠিক এই পথেই এগিয়ে যাবে।
হিউম্যানয়েডের সম্ভাবনা
বৈশ্বিক উৎপাদন খাতে চীনের এই আধিপত্য বজায় থাকার পেছনে মূলত পাঁচটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, তারা খুব দ্রুত ভবিষ্যতের প্রবণতা বা ট্রেন্ড বুঝতে পারে এবং উচ্চ-প্রবৃদ্ধির খাতগুলোকে লক্ষ্য করে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়।
২০২১ সালের শুরুতেই চীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন বা ইন্টেলিজেন্ট রোবটকে অগ্রাধিকার খাতের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিল। ২০২৩ সালের মধ্যে দেশটির শিল্প ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় হিউম্যানয়েডকে একটি কৌশলগত উদীয়মান খাত হিসেবে ঘোষণা করে। এর ফলে তারা শুরুতেই একটি বিশাল এবং আধিপত্যশীল নেতৃত্ব তৈরি করতে পেরেছে।
প্রযুক্তি গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ওমডিয়া-র হিসাব এবং ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে যত হিউম্যানয়েড রোবট স্থাপন করা হয়েছে, তার প্রায় ৯০ শতাংশই তৈরি করেছে চীনা নির্মাতারা।
দ্বিতীয়ত, চীনা কোম্পানিগুলো একটি সমন্বিত সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) এবং নিখুঁত ইকোসিস্টেমের মাধ্যমে কাজ পরিচালনা করে।
গত পাঁচ বছরে চীনে তৈরি রোবটের স্থানীয় যন্ত্রাংশের ব্যবহার প্রায় ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫০ শতাংশের বেশিতে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া রোবটের মূল হার্ডওয়্যারের জন্য অপরিহার্য কিছু নির্দিষ্ট বিরল মৃত্তিকা চুম্বকের (রেয়ার-আর্থ ম্যাগনেট) প্রায় ৯০ শতাংশই চীনেই উৎপাদিত হয়।
চূড়ান্ত পণ্য তৈরির পাশাপাশি এর মূল যন্ত্রাংশ উৎপাদনের সক্ষমতার দিক থেকেও চীন সবার চেয়ে এগিয়ে, যা তাদের সুদৃঢ় সরবরাহ শৃঙ্খলের গভীরতাকেই প্রমাণ করে। সম্প্রতি শেনজেন সফরে গিয়ে মরগ্যান স্ট্যানলির প্রতিনিধিরা সরাসরি এর প্রমাণ পেয়েছেন বলে জানান চেতন আহিয়া।
এই সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর হাত ধরে শিল্পখাতে ব্যবহৃত রোবট বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবট সেগমেন্টে চীন ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক বাজারের অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ অংশীদারত্ব নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
সম্মিলিত প্রচেষ্টা
তৃতীয়ত, চীনের আর্থিক ব্যবস্থা দেশটির কৌশলগত লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
স্থানীয় সরকার এবং ব্যাংকগুলো শুরু থেকেই এই উচ্চ-প্রবৃদ্ধির খাতগুলোতে প্রণোদনা ও তহবিল সরবরাহ করে। এর ফলে কোম্পানিগুলো ব্যবসার আকার বড় করার সময় প্রাথমিক আর্থিক ক্ষতি বা লোকসান সহজেই কাটিয়ে উঠতে পারে।
চতুর্থত, এই কোম্পানিগুলো গবেষণা ও উন্নয়নে (আরঅ্যান্ডডি) বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে।
২০২৫ সালে গবেষণা ও উন্নয়নে চীনের জাতীয় ব্যয়—মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২.৮ শতাংশ বা প্রায় ৫৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এই ব্যয়ের দিক থেকে চীনের অবস্থান কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেছনে, যারা তাদের জিডিপির ৩.৪ শতাংশ এখাতে ব্যয় করে।
দেশটির ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় রোবোটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (এআই) কৌশলগত উদীয়মান শিল্প হিসেবে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
পঞ্চমত, চীন তার শ্রমশক্তির জন্য পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করছে। চীনের উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করা গ্র্যাজুয়েটদের প্রায় ৪১ শতাংশই বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত (স্টেম) বিষয়ের, যা যুক্তরাষ্ট্রের (২০ শতাংশ) তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
এই সফল কৌশলটি এখন হিউম্যানয়েড এবং রোবোটিক্স খাতের দিকে তাক করা হয়েছে। তাই মরগ্যান স্ট্যানলির বিশ্বাস, এটি চীনের পরবর্তী রপ্তানি ডিভিডেন্ড বা বড় আয়ের উৎস হতে যাচ্ছে।
দেশটির রয়েছে বিশাল উৎপাদন ক্ষমতা, শক্তিশালী সরবরাহ শৃঙ্খল, দক্ষ প্রকৌশলী, নীতিগত সহায়তা এবং একটি বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার। এই শক্তিগুলো ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক বেশ কয়েকটি শিল্পখাতকে বদলে দিয়েছে। মরগ্যান স্ট্যানলির ধারণা, রোবট শিল্পের ক্ষেত্রেও তারা এখন একই কাজ করতে যাচ্ছে।
এশিয়ার ইন্ডাস্ট্রিয়াল সুপার-সাইকেল
একই সময়ে, এশিয়ায় একটি 'ইন্ডাস্ট্রিয়াল সুপার-সাইকেল' বা শিল্প বিপ্লবের নতুন জোয়ার শুরু হওয়া চীনের বাজারের অংশীদারত্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং এআই-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো, জ্বালানি রূপান্তর (এনার্জি ট্রানজিশন), প্রতিরক্ষা এবং শিল্প খাতে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এশিয়ার মূলধনী ব্যয়ে একটি কাঠামোগত উত্থান আমরা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বৈশ্বিক এবং এশীয় অঞ্চলের মূলধনী ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক উৎপাদনের পাওয়ারহাউস হিসেবে এশিয়া ও চীন দ্বিমুখী সুবিধা পাওয়ার অবস্থানে রয়েছে। কারণ এশিয়া এবং বিশ্ববাজার—উভয় দিক থেকেই মূলধনী পণ্যের এই কাঠামোগত ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর মতো উৎপাদন সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
চীন তার আধুনিক প্রবৃদ্ধির মডেলটি একটি মূল শক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলেছে—তা হলো অন্য যেকোনো অর্থনীতির চেয়ে তারা দ্রুততম সময়ে নতুন শিল্পখাত সম্প্রসারণ করতে পারে। আর এখন তারা পরবর্তী প্রজন্মের ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন খাতের উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
একই সাফল্যের গল্প কনজিউমার ইলেকট্রনিক্স, সোলার পণ্য, ব্যাটারি এবং ইভি-র ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, হিউম্যানয়েড এবং রোবোটিক্সের ক্ষেত্রেও এর পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
তবে চীনের এই সবচেয়ে বড় শক্তিটিই আবার একটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক (ম্যাক্রো) ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
যখন একসাথে অনেক প্রতিষ্ঠান একই খাতের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন উৎপাদন ক্ষমতা প্রয়োজনের চেয়ে দ্রুত বেড়ে যায়। এর ফলে পণ্যের দাম কমে যায়, লাভের মার্জিন সংকুচিত হয় এবং লভ্যাংশ বা রিটার্ন হ্রাস পায়।
অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা একটি মুদ্রাসংকোচন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে ব্যবসার চালিকাশক্তি করার পরিবর্তে কোম্পানিগুলো ক্রমাগত রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
যদিও নীতিপ্রণেতারা এই অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা এবং অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতার (ওভার ক্যাপাসিটি) চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে দিন দিন আরও সচেতন হচ্ছেন, তবুও ব্যবসার আকার বড় করার এই তীব্র প্রতিযোগিতার মাঝে কীভাবে টেকসই মুনাফা নিশ্চিত করা যায়, তা দেখার বিষয়। একই সঙ্গে অর্থনীতি যেন পদ্ধতিগতভাবে মুদ্রাসংকোচনের ঝুঁকিতে না পড়ে, তা-ও নিশ্চিত করতে হবে চীনকে।
