স্মার্টওয়াচেই ধরা পড়বে ৫০০ মিটার গভীরের সাবমেরিন! চীন উদ্ভাবন করল অতিক্ষুদ্র সেন্সর
কল্পনা করুন—শান্ত সমুদ্রে ভাসমান ট্রলারের একজন জেলে তাঁর জাল গুটিয়ে আনছেন, ঠিক তখনই তাঁর স্মার্টওয়াচটি সংকেত দিয়ে কেঁপে উঠল: "চৌম্বকীয় অস্বাভাবিকতা শনাক্ত হয়েছে; পানির প্রায় ৫০০ মিটার গভীর দিয়ে একটি সাবমেরিন যাচ্ছে।"
শুনতে কল্পকাহিনি মনে হলেও, এমন দৃশ্য বাস্তবে রূপ দেওয়ার দিকে এক চূড়ান্ত অগ্রগতি অর্জন করেছেন চীনের বিজ্ঞানীরা।
চায়নিজ একাডেমি অব সায়েন্সেস (সিএএস)-এর আওতাধীন, হেফেই ইনস্টিটিউটস অব ফিজিক্যাল সায়েন্স এবং নিংবো ইনস্টিটিউট অব মেটেরিয়ালস টেকনোলজি অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একদল গবেষক 'হল-ইফেক্ট' (Hall-effect) ভিত্তিক এমন এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ম্যাগনেটিক সেন্সর তৈরি করেছেন, যা তাত্ত্বিকভাবে সমুদ্রের অর্ধ কিলোমিটার (১,৬৪০ ফুট) গভীরে থাকা ইস্পাতের তৈরি সাবমেরিনের অস্পষ্ট চৌম্বকীয় ছায়াও শনাক্ত করতে সক্ষম। আর এর পুরো প্রযুক্তিটি আঁটানো সম্ভব ধূলিকণার চেয়ে বড় নয়—এমন একটি ক্ষুদ্র চিপের মধ্যে।
পদার্থবিদ্যার গবেষণা সাময়িকী ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্স-এ ১৭ জুলাই প্রকাশিত তাদের গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়েছে, নতুন এই উদ্ভাবন সেন্সরের ক্ষেত্রে দশকের পর দশক ধরে চলে আসা 'সংবেদনশীলতা বাড়লে শব্দ বা নয়েজ বৃদ্ধি পাওয়ার' কঠিন সমীকরণ ভেঙে দিয়েছে। ফলে সাধারণ সেন্সরগুলো দিয়ে এখন অতিক্ষুদ্র ও শান্ত সংকেতগুলোও স্পষ্টভাবে ধরে ফেলা সম্ভব হবে।
তবে দৈনন্দিন ব্যবহৃত স্মার্ট গ্যাজেটগুলোতে 'হল-ইফেক্ট' সেন্সর ইতোমধ্যেই রয়েছে। স্মার্টওয়াচ, স্মার্টফোন, গাড়ির চাকার গতি নির্ণায়ক যন্ত্র থেকে শুরু করে হাসপাতালের স্ক্যানারে ইতিমধ্যেই এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেন্সরটির আশপাশে কোনো চৌম্বক ক্ষেত্রের উপস্থিতি তৈরি হলে—এটি এক ধরনের ক্ষুদ্র ভোল্টেজ উৎপন্ন করে কাজ করে। এগুলো সহজলভ্য, সাশ্রয়ী, দ্রুতগামী ও আকৃতিতে ছোট হওয়ায় পরিধানযোগ্য গ্যাজেটে (ওয়্যারেবলস) ব্যবহারের জন্য আদর্শ।
নতুন আবিষ্কৃত ম্যাগনেটিক সেন্সর এতে যুক্ত করা হলে– এটির পানির গভীরে থাকা ডুবোজাহাজকেও শনাক্ত করতে পারবে।
এতদিন সেন্সরগুলোকে যত বেশি সংবেদনশীল ও ছোট করা হতো, তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে এতে 'নয়েজ' বা অপ্রয়োজনীয় শব্দ সংকেত তত বেশি বেড়ে যেত। বিষয়টি অনেকটা রেডিওর ভলিউম বাড়ালে মূল শব্দের পাশাপাশি যান্ত্রিক গুঞ্জন বেড়ে যাওয়ার মতো।
চৌম্বকীয় পদার্থের ভেতরে অসংখ্য ইলেকট্রন নিজ অক্ষে ঘুরে এক ধরনের বিন্যাস তৈরি করে, যাকে বলা হয় 'স্পিন টেক্সচার'। এই বিন্যাসগুলো স্থির থাকে না—এগুলো তরঙ্গায়িত হয়, দোলে এবং মাঝে মাঝে এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় হঠাৎ পরিবর্তিত হয়। অণুবীক্ষণিক পর্যায়ের এই ক্ষুদ্র গতিই সামগ্রিক সেন্সরে নয়েজ বা বিশৃঙ্খলা তৈরি করে।
গবেষকরা দেখেন যে, সেন্সরে নয়েজের মাত্রা সরাসরি নির্ভর করে স্পিন টেক্সচার কত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে তার ওপর। ধীরগতির নড়াচড়া বেশি নয়েজ তৈরি করে এবং দ্রুতগতির নড়াচড়া নয়েজ কমায়—এ দুটির মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক কাজ করে।
এই বৈজ্ঞানিক সূত্রকে কাজে লাগিয়ে গবেষকরা অতি দ্রুতগতির স্পিন টেক্সচার গতিশীলতাসহ একটি কৃত্রিম ফেরোম্যাগনেটিক কাঠামো তৈরি করেছেন। চিপের ভেতরে চৌম্বকীয় স্তরের পুরোত্ব নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করে এবং অ্যানিলিং (Annealing) হিট-ট্রিটমেন্ট প্রক্রিয়াকে সূক্ষ্মভাবে সমন্বয় করে তারা উপাদানটির সংবেদনশীলতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছেন।
নতুন এই বিশেষ উপাদানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি 'অ্যানোমালাস হল ম্যাগনেটিক সেন্সর'-এর কার্যকরী শনাক্তকরণ ক্ষেত্রফল মাত্র ২০ বাই ২০ মাইক্রোমিটার।
বর্তমানে ব্যবহৃত ভারী প্রোটন ম্যাগনেটোমিটার প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ করে, অন্যদিকে সুপারকন্ডাক্টিং কোয়ান্টাম ইন্টারফেয়ারেন্স ডিভাইস (স্কুইড)-এর মতো সংবেদনশীল যন্ত্র চালানোর জন্য প্রয়োজন হয় ব্যয়বহুল তরল কুলিং ব্যবস্থা। সেই তুলনায় হল-ইফেক্ট সেন্সর অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও সহজে ব্যবহারযোগ্য।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী গবেষকরা জানান, এই কৌশল অন্যান্য চৌম্বকীয় উপাদানের ক্ষেত্রেও সফলভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব। সেগুলোর অভ্যন্তরীণ স্পিন বা ঘূর্ণনের গতিশীলতা আরও বেশি দ্রুত হলে সেন্সরের নয়েজের পরিমাণ বহুমাত্রায় বা কয়েক গুণ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
এখন প্রশ্ন ওঠে—এই সেন্সর কি সরাসরি সাবমেরিন শনাক্ত করতে ব্যবহার করা যাবে? তাত্ত্বিকভাবে উত্তর 'হ্যাঁ' হলেও, বাস্তবে সামরিক প্রয়োগে এখনও নানা জটিল চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
সামরিক ক্ষেত্রে সাবমেরিন খোঁজার কাজে 'ম্যাগনেটিক অ্যানোমালি ডিটেকশন' (এমএডি) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। ইস্পাতের কাঠামোর সাবমেরিন যখন পৃথিবীর প্রাকৃতিক চৌম্বক ক্ষেত্রের ভেতর দিয়ে চলাচল করে, তখন তা চলন্ত চুম্বকের মতো কাজ করে স্থানীয় চৌম্বক ক্ষেত্রকে বিঘ্নিত করে। সেন্সরের মূল কাজ হলো সাবমেরিনের সেই ক্ষণস্থায়ী চৌম্বকীয় অসামঞ্জস্য ধরে ফেলা।
বর্তমানে আবিষ্কৃত সেন্সরটির সংবেদনশীলতা খুব কাছ থেকে সাবমেরিন শনাক্ত করতে পারলেও, দূরপাল্লার ট্র্যাকিং বা সাবমেরিন বিরোধী যুদ্ধজাহাজের (অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার) মতো সামরিক লক্ষ্য অর্জনে এটি এখনো যথেষ্ট নয়। তবে সামরিক ব্যবহারের চেয়েও চিকিৎসা ও শিল্প খাতে এ প্রযুক্তির রয়েছে বিশাল সম্ভাবনা।
মানুষের হৃদস্পন্দনের ফলে শরীরে সূক্ষ্ম চৌম্বকীয় সংকেত তৈরি হয় এবং মস্তিষ্কের স্নায়বিক কর্মকাণ্ডেরও নিজস্ব চৌম্বক ক্ষেত্র রয়েছে। এই সংকেতগুলো মূলত পিকোটেসলা থেকে ন্যানোটেসলা পরিসীমার মধ্যে থাকে—যা নতুন উদ্ভাবিত এই সেন্সরের কার্যক্ষমতার নিখুঁত সীমার ভেতরেই পড়ে।
মাত্র ২০ মাইক্রোমিটার আকারের এই অতিক্ষুদ্র প্রযুক্তিটি সমন্বিত করে মস্তিষ্ক গবেষণার নতুন সরঞ্জাম তৈরি এবং হৃদরোগের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্তকরণ সহজতর হবে।
চীনা একাডেমি অব সায়েন্সেস (সিএএস) জানিয়েছে, "অটোমোবাইল শিল্প, ইলেকট্রনিক্স নির্মাণ এবং মেটেরিয়াল সায়েন্সের ক্ষেত্রে পদার্থের অনুবিক্ষণীয় গঠন খতিয়ে দেখতে স্ক্যানিং প্রোব মাইক্রোস্কোপিতে এই উচ্চ-সংবেদনশীল ও নয়েজমুক্ত সেন্সর দারুণ কার্যকর ভূমিকা রাখবে।"
