চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি বসাতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া
নাসা আগস্টের শেষ দিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমন একটি পারমাণবিক চুল্লি তৈরির প্রস্তুতি নিতে বলেছে, যা মহাকাশযানে করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পরও টিকে থাকতে পারবে এবং চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে কোনো রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই কাজ করতে পারবে। বিষয়টি শুনতে কল্পবিজ্ঞানের মতো মনে হতে পারে, কিন্তু সংস্থাটি এটি ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত রাখতে চায়।
এই তাড়াহুড়োর একটি কারণ রয়েছে। চীন ও রাশিয়ার একটি গোপনীয় অংশীদারত্বের অংশ হিসেবে রাশিয়া ২০৩৬ সালের মধ্যে চাঁদে একটি পারমাণবিক চুল্লি চালু করার লক্ষ্য নিয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের ছাড়িয়ে যেতে নাসাও ইতোমধ্যে তার সময়সূচি এগিয়ে এনেছে।
এই প্রতিযোগিতা মহাকাশ অনুসন্ধানের ভবিষ্যৎ নিয়েই। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন চাঁদে প্রথম স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপন করতে চায়, হিমায়িত পানির মতো সম্পদের সন্ধান করতে চায় এবং সৌরজগতের আরও গভীরে অভিযান পাঠাতে চায়। চাঁদের সম্পদে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করা এই পরিকল্পনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই পরাশক্তিই মনে করে, একটি পারমাণবিক চুল্লি এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রীয় উপাদান।
দেশ দুটির পরিকল্পনা হলো, চাঁদে পৌঁছানোর পরই তাদের পারমাণবিক চুল্লি চালু করা। তবে কিছু শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী সতর্ক করে বলেছেন, মহাকাশ অনুসন্ধানের এমন এক সময়ে সরকারগুলো খুব দ্রুত এগোচ্ছে, যখন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য বিপর্যয় ঘটেছে। গত ছয় বছরে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার একাধিক রকেট ব্যর্থ হয়ে বিস্ফোরিত হয়েছে এবং একটি রুশ অবতরণযান চাঁদে বিধ্বস্ত হয়েছে। মহাকাশের আবর্জনাও নিয়মিত পৃথিবীতে পতিত হচ্ছে।
ব্যর্থতার কারণে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনা ধারাবাহিক বিপর্যয় ঘটতে পারে। পতিত চুল্লির ধ্বংসাবশেষ থেকে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়তে পারে, যেমনটি ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে কানাডায় ঘটেছিল। চাঁদের পৃষ্ঠে কোনো বিস্ফোরণ বা চুল্লি গলে যাওয়ার ঘটনা ঘটলে পুরো অঞ্চলকে মানুষের প্রবেশের জন্য নিষিদ্ধ এলাকা বানানোর ঝুঁকি তৈরি হবে।
ইউনিয়ন অফ কনসার্নড সায়েন্টিস্টস-এর পারমাণবিক শক্তি সুরক্ষার পরিচালক এডউইন লাইম্যান বলে, 'মহাকাশে সবসময়ই প্রতিযোগিতা চলবে এবং এর সঙ্গে পারমাণবিক শক্তি যুক্ত হলে পরিস্থিতি সম্ভাব্যভাবে আরও বিপজ্জনক দিকে যেতে পারে।'
প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য, ক্রয়সংক্রান্ত নথি ও একাডেমিক গবেষণা পর্যালোচনা এবং শিল্পখাতের অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিদের, সরকারি কর্মকর্তা ও সমালোচকদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে এই পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে, তার এখন পর্যন্ত সবচেয়ে পরিষ্কার চিত্র পাওয়া গেছে।
নথিগুলো চীনা-রুশ মহাকাশ অংশীদারত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করে। এই জোটের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির ভি. পুতিন।
পারমাণবিক শক্তি ব্যবস্থার কাজটিই চীন তার চাঁদ প্রকল্পে রাশিয়ার হাতে তুলে দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে রাশিয়ার চেয়ে বেশি অভিজ্ঞতা কোনো দেশের নেই। শীতল যুদ্ধের সময় ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে মূলত সেই সময়ের উপগ্রহে করে রাশিয়া ৩০টির বেশি পারমাণবিক চুল্লি কক্ষপথে পাঠিয়েছে। বেসামরিক পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রেও দেশটি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় পর্যায়ে রয়েছে। মহাকাশ অভিযানে ব্যবহারের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ বলে বিবেচিত পারমাণবিক জ্বালানির সবচেয়ে বড় সরবরাহও রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে। এই জ্বালানি—অত্যধিক মাত্রায় সমৃদ্ধ নয় এমন ইউরেনিয়াম—যুক্তরাষ্ট্রে স্বল্প পরিমাণে রয়েছে।
রাশিয়ার বার্তা সংস্থা তাসকে কুরচাতভ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট মিখাইল কোভালচুক বলেন, 'মহাকাশে পারমাণবিক শক্তির ক্ষেত্রে রাশিয়ার কার্যত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।'
কুরচাতভ, একটি গবেষণা সংস্থা, একটি চন্দ্র চুল্লি ডিজাইনে সাহায্য করছে।
নাসা এই দৌড়ে পিছিয়ে আছে। সংস্থাটি ১৯৬৫ সালে একটি পারমাণবিক চুল্লি মহাকাশে পাঠিয়েছিল, কিন্তু মহাকাশযানের একটি পৃথক ত্রুটির পর সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র মহাকাশের পারমাণবিক কর্মসূচিতে ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করলেও আর কোনো পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করতে পারেনি।
চন্দ্রচুল্লির এই প্রতিযোগিতা শুধু মহাকাশ অনুসন্ধানের বিষয়, এটি ক্ষমতা প্রদর্শনেরও একটি মঞ্চ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মহাকাশে শ্রেষ্ঠত্বকে তার 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতির অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। শি ও পুতিনও একই ধরনের ঘোষণা দিয়েছেন।
দেশগুলোর মতে, চাঁদে পারমাণবিক শক্তি অপরিহার্য
চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপনের জন্য নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ প্রয়োজন। পারমাণবিক চুল্লি সূর্যের আলোর প্রয়োজন ছাড়াই কাজ করতে পারে এবং এগুলো ছোট আকারের করা সম্ভব। নাসা ও কুরচাতভ ইনস্টিটিউটের মতে, সঠিক নকশা করা হলে এগুলোর জন্য মানুষের খুব সামান্য হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হবে।
প্রথম কয়েক বছর যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কেবল এতটুকু বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে, যাতে যন্ত্রপাতি উষ্ণ রাখা যায় এবং চাঁদের পৃষ্ঠে চলাচলকারী যানগুলোতে শক্তি সরবরাহ করা যায়। এ কাজে তারা সৌরবিদ্যুৎ ও তেজস্ক্রিয় সমস্থানিকভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছে।
এই ব্যবস্থাগুলো তেজস্ক্রিয় সমস্থানিকের স্বাভাবিক ক্ষয়ের ফলে উৎপন্ন তাপকে বিদ্যুতে রূপান্তর করে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন ইতোমধ্যেই মহাকাশে এই ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে।
কিন্তু চন্দ্রঘাঁটি বড় হলে এসব ব্যবস্থা যতটা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, তার চেয়ে অনেক বেশি বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে। দুই সপ্তাহ ধরে চলা ঠান্ডা চন্দ্ররাতে সৌর প্যানেল কাজ করবে না। চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে যেকোনো বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে ১৩০ থেকে মাইনাস ৩৩৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত তাপমাত্রার ওঠানামা সহ্য করতে হবে।
রাশিয়ার সরকার নিয়ন্ত্রিত সংস্থাগুলোকে চীন-নেতৃত্বাধীন চন্দ্রঘাঁটিগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ২০৩৬ সালের মধ্যে 'সেলেনা' নামের একটি চন্দ্রচুল্লি সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সেলেনা সর্বোচ্চ ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে এবং মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই এক দশক কাজ করতে পারবে। এর নকশায় আর্কটিক অঞ্চলে কাজ করার জন্য তৈরি আগের একটি চুল্লির কিছু বৈশিষ্ট্য থাকবে।
রুশ-চীনা চুল্লি চাঁদে কার্যত একটি নিষিদ্ধ এলাকা তৈরি করে ফেলতে পারে—এই আশঙ্কায় নাসা তার সময়সূচি এগিয়ে এনেছে। নাসার 'লুনার রিঅ্যাক্টর ১' থেকে ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রত্যাশা করা হচ্ছে, যা মোটামুটি ১৬টি মার্কিন বাড়ির বিদ্যুৎ ব্যবহারের সমান। কোনো মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই এটি পাঁচ বছর কাজ করবে।
প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে নাসা ২০২৮ সালের ডিসেম্বর মাসে একটি মহাকাশযানকে মঙ্গলগ্রহে পাঠাতে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছে। এর আগে কখনো এমনটি করা হয়নি।
একই সময়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর কক্ষপথে এবং চাঁদে স্থাপনের জন্য নিজেদের পারমাণবিক চুল্লি তৈরির পরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস।
লক্ষ্যমাত্রার সময় বারবার পিছিয়েছে এবং খুব কম বিশেষজ্ঞই মনে করেন যে দেশগুলো তাদের নির্ধারিত সময়সীমা পূরণ করতে পারবে। ভারী ও সম্ভাব্য তেজস্ক্রিয় বস্তু অসমতল চন্দ্রপৃষ্ঠে নামিয়ে দেওয়ার মতো পরীক্ষিত অবতরণযান এখনো কারও নেই। কম মাধ্যাকর্ষণের পরিবেশে কেউ কখনো পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনও করেনি।
চন্দ্রঘাঁটিগুলো এখনো তৈরি হয়নি এবং সেগুলোর কতটা বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে, সেটিও অনুমানের বিষয়। এ কারণেই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুল্লির পুরো নকশা বা এর কিছু অংশ পরিবর্তিত হতে পারে।
"এই মুহূর্তে কিছুই নিশ্চিত নয়," বলেন হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির পারমাণবিক বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক জুলিয়েন দ্য ত্রুইয়ো দ্য লঁভারসাঁ।
ঝুঁকি কম নয়
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া বলেছে, তাদের চুল্লিগুলো চাঁদে পৌঁছানোর আগে অকার্যকর থাকবে—বিজ্ঞানীদের ভাষায় যাকে 'অবিকিরিত' অবস্থায় থাকা বলা হয়। এতে ঝুঁকি কমবে। পারমাণবিক প্রকৌশলীরা বলছেন, 'ঠান্ডা' ইউরেনিয়াম জ্বালানি পৃথিবীতে পড়ে গেলেও এতে তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি খুব কম।
তবু সমস্যা ঘটতে পারে, বিশেষ করে রকেট উৎক্ষেপণের সময় নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মতো জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে।
"এটাই সেই মুহূর্ত, যখন ঝুঁকি অনেক বেশি," বলেন মহাকাশে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের বিষয়ে জাতিসংঘের একটি কর্মদলের নেতৃত্ব দেওয়া লিওপোল্ড সামারার। "আমরা অনেক উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হতে দেখেছি। তাই কী কী ভুল হতে পারে, সে বিষয়ে আমাদের অনেক তথ্য রয়েছে।"
উদাহরণ হিসেবে একটি চুল্লি সমুদ্রে পড়ে যাওয়ার ঘটনা বিবেচনা করা যাক। পানি নিউট্রনকে ধীর করে দেয়, ফলে নিউট্রনগুলোর পরমাণুর কেন্দ্র বিভাজনের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এতে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে, কারণ চুল্লি সংকটাবস্থায় পৌঁছে পরমাণু বিভাজনের একটি ধারাবাহিক বিক্রিয়া শুরু করতে পারে, যার ফলে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে। ঝুঁকিটি বাস্তব, কারণ বেশির ভাগ উৎক্ষেপণকেন্দ্র কোনো না কোনো জলাশয়ের কাছে অবস্থিত।
পারমাণবিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১৯ সালে রাশিয়ায় এমন কিছু সম্ভবত ঘটেছিল। সে সময় একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যর্থ হয়ে শ্বেত সাগরে পড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মতে, সেটি উদ্ধারের চেষ্টা করার সময় একটি পারমাণবিক বিক্রিয়া ঘটে। এতে অন্তত পাঁচজন কর্মী নিহত হন। তবে রাশিয়া এসব দাবি অস্বীকার করে বলেছিল, ক্ষেপণাস্ত্রটি কোনো পারমাণবিক চুল্লির মাধ্যমে চালিত ছিল না।
নাসার প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যে এমন একটি নকশার কথা বলা হয়েছে, যা এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে সক্ষম হবে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পারমাণবিক শক্তি প্রতিষ্ঠান রোসাটম মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং বলেছে, তাদের মহাকাশ কর্মসূচি গোপনীয়। বিজ্ঞানের দায়িত্বে থাকা কুরচাতভ ইনস্টিটিউট এবং রুশ মহাকাশ কর্মসূচির দায়িত্বে থাকা রসকসমসও প্রশ্নের জবাব দেয়নি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং চায়না ম্যানড স্পেস এজেন্সিও প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
আরেকটি ঝুঁকি হলো, কোনো ত্রুটির কারণে কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর চুল্লিটি আবার পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারে। ১৯৭৮ সালে রাশিয়ার পারমাণবিক শক্তিচালিত একটি উপগ্রহ নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসে এবং কানাডার উত্তরাঞ্চলের প্রায় ৪৮ হাজার বর্গমাইল এলাকায় তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে দেয়। প্রায় এক বছর ধরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চালানোর পরও উপগ্রহটির শক্তির উৎসের মাত্র ০.১ শতাংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রে যেকোনো মহাকাশ পারমাণবিক চুল্লি সাতটি সরকারি সংস্থার বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পর্যালোচনা করার কথা রয়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনার সম্ভাবনা পুরোপুরি দূর করা অসম্ভব।
"দুর্ঘটনার সংজ্ঞাই হলো, কোনো কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী না হওয়া," বলেন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের সহযোগী অধ্যাপক আর. স্কট কেম্প।
ড. কেম্প বলেন, চাঁদে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা আরও বেশি।
পৃথিবীতে পারমাণবিক চুল্লিগুলোকে সুরক্ষা কাঠামোর ভেতরে রাখা হয়। কিন্তু চাঁদে এমন কাঠামো তৈরি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন হবে। নাসা বলেছে, তাদের চুল্লি সুরক্ষিত থাকবে, যদিও কীভাবে তা করা হবে, তা পরিষ্কার নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নভোচারী ও যন্ত্রপাতিকে তেজস্ক্রিয়তা থেকে সুরক্ষিত রাখতে চন্দ্রচুল্লিগুলোর চারপাশে সম্ভবত মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ এলাকা তৈরি করা হবে।
ড. কেম্প বলেন, পর্যাপ্ত সুরক্ষা কাঠামো না থাকায় ছোটখাটো দুর্ঘটনাও অনেক বেশি তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে দিতে পারে। চাঁদে বাতাস নেই, কিন্তু মাধ্যাকর্ষণ কম হওয়ায় কোনো বিস্ফোরণের পর ধ্বংসাবশেষ অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে।
পৃথিবীতে কোনো চুল্লির কার্যকাল শেষ হলে সেটি নিষ্ক্রিয় করার কাজ একটি জটিল ও সতর্কতামূলক প্রক্রিয়া, যা শেষ করতে কয়েক বছর সময় লাগে। চাঁদের ক্ষেত্রে নাসা ও রাশিয়ার সংস্থাগুলো বলেছে, তারা কেবল তেজস্ক্রিয় পদার্থ সেখানে রেখে আসবে।
"প্রতিযোগিতায় তারা এমন একটি কঠিন সমস্যার দায়িত্ব নিতে চায় না, যার কোনো সমাধান কারও কাছে নেই," বলেন হংকংয়ের পারমাণবিক বিজ্ঞানী ড. দ্য ত্রুইয়ো।
জ্বালানির চ্যালেঞ্জ
নাসা তার সব প্রযুক্তিগত ও ক্রয়সংক্রান্ত নথিতে বলেছে, তারা এমন একটি পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহার করবে, যা অত্যধিক মাত্রায় সমৃদ্ধ নয় এবং উন্নত চুল্লির জন্য সবচেয়ে নিরাপদ বলে বিবেচিত।
তবে কিছু বিশেষজ্ঞ বলছেন, ভূরাজনীতি এবং কঠোর সময়সীমা বিষয়টিকে জটিল করে তুলতে পারে।
২০১৮ সালে নাসা সর্বশেষ যে মহাকাশ পারমাণবিক চুল্লি পরীক্ষা করেছিল, তাতে অত্যধিক মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করা হয়েছিল। অন্য জ্বালানির তুলনায় এটি ওজনে হালকা এবং মহাকাশে পাঠাতে খরচও কম। কিন্তু প্রথম ট্রাম্প প্রশাসন এই জ্বালানির ব্যবহার নিরুৎসাহিত করেছিল, কারণ এটি শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা হতে পারে।
এখন নাসা 'উচ্চমাত্রায় বিশ্লেষিত নিম্নমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম' নামে পরিচিত একটি জ্বালানি ব্যবহার করতে চায়, যা সংক্ষেপে হেলু নামে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রে এই জ্বালানি স্বল্প সরবরাহে রয়েছে। রাশিয়া এর সবচেয়ে বড় উৎপাদক হলেও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ২০২৪ সাল থেকে রাশিয়া থেকে ইউরেনিয়াম আমদানি নিষিদ্ধ করেছে।
নাসার নথিতে দেখা যায়, তারা আশা করছে, জ্বালানি বিভাগ মহাকাশের পারমাণবিক চুল্লির জন্য নিম্নমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বরাদ্দ করবে। কিন্তু সরকার নিজেই পর্যাপ্ত পরিমাণ জ্বালানি উৎপাদন করতে সমস্যায় পড়েছে।
রুশ-চীনা জোট কী ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করবে, তা প্রকাশ করেনি। রাশিয়ার পুরোনো মহাকাশ পারমাণবিক চুল্লিগুলোতে অত্যধিক মাত্রায় সমৃদ্ধ জ্বালানি ব্যবহার করা হয়েছিল।
"এটিকে একটি অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য অস্ত্রে পরিণত করতে একটি যন্ত্রপাতির কারখানা এবং সামান্য বিস্ফোরকই যথেষ্ট," বলেন ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি বিল ফস্টার। তিনি একজন পদার্থবিদ এবং মহাকাশের পারমাণবিক চুল্লিতে অত্যধিক মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহারে সফলভাবে বাধা দিয়েছিলেন।
নাসার চন্দ্রচুল্লির চুক্তির সম্ভাব্য দরদাতাদের অন্তত একটি প্রতিষ্ঠান—স্পেস নিউক্লিয়ার পাওয়ার করপোরেশন—অত্যধিক মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে একটি চুল্লি তৈরি করছে। প্রতিষ্ঠানটির এক প্রতিষ্ঠাতা আসন্ন প্রকল্পগুলোর "প্রতিযোগিতামূলক প্রকৃতির" কথা উল্লেখ করে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
মার্কিন মহাকাশ কর্মসূচি ক্ষুদ্রাকৃতির চুল্লি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় ধরনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। এসব চুল্লি সর্বোচ্চ ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। ব্যয়বহুল এই চুল্লিগুলো তথ্যকেন্দ্রের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের জন্য খুব ছোট হলেও মহাকাশ ও সামরিক ক্ষেত্রে এগুলোর একটি বিশেষ বাজার তৈরি হয়েছে।
গত মাসে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর অ্যান্টারেস নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে মহাকাশে ব্যবহারের জন্য একটি ক্ষুদ্রাকৃতির চুল্লি তৈরি ও পরীক্ষার দায়িত্ব দিয়েছে। জ্বালানি বিভাগের পরিচালিত একটি কর্মসূচির আওতায় এই গ্রীষ্মে সফলভাবে চুল্লি পরীক্ষা করা পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অ্যান্টারেসও ছিল। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তারা চাঁদের চুল্লির জন্য নাসা ও প্রতিরক্ষা দপ্তরের চুক্তির দরপত্রে অংশ নেবে।
ক্ষুদ্রাকৃতির চুল্লি ভবিষ্যতে চাঁদে ব্যবহার করা হতে পারে, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনোটি পরীক্ষিত ও ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত নয়। মৌলিক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রশ্ন—কীভাবে তাপ অপসারণ করা হবে, কীভাবে চুল্লিকে সুরক্ষিত রাখা হবে এবং কীভাবে এর কাঠামোগত অখণ্ডতা বজায় রাখা হবে—মহাকাশের চুল্লির ক্ষেত্রে এখনো পুরোপুরি সমাধান করা হয়নি। কারণ এসব চুল্লিকে ছোট ও হালকা হতে হবে।
"চাঁদে একটি চুল্লি স্থাপন করা সম্পূর্ণ সম্ভব," বলেন উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের পারমাণবিক প্রকৌশল ও প্রকৌশল পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রধান ক্যাটি হাফ। তবে তিনি বলেন, যত বেশি বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে, চুল্লি তৈরি করা তত বেশি কঠিন হবে।
প্রথমে চাঁদে পৌঁছানোর জন্য দেশগুলোর মধ্যে যতই প্রতিযোগিতা থাকুক না কেন, ড. হাফ বলেন, প্রতিযোগিতার চেয়ে একসঙ্গে কাজ করেই সরকারগুলো বেশি সাফল্য অর্জন করেছে।
তিনি বলেন, 'আমি মহাকাশে আরও বেশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দেখতে চাই। সেখানেই যৌথভাবে পরিচালিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা আমাদের অসন্তোষে ভরা আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে ছাড়িয়ে গেছে।'
